বদভ্যাসকে ‘না’

বদভ্যাস শব্দটি আপাত অর্থে শুনতে অনেকটা হালকা মনে হলেও দৈনন্দিন জীবনে এটি খুব ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বদভ্যাসের ক্ষেত্রে তরুণরা তো বরাবরই এক ধাপ এগিয়ে। নিজের অজান্তেই তরুণরা কিছু মারাত্মক বদভ্যাসের দাস হয়ে যায়। যা ডেকে আনতে পারে মৃত্যুকেও! এ প্রসঙ্গে সতর্কবার্তা নিয়ে সাজানো এই আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন আশীষ সেনগুপ্ত ব্যস্ততা আর যান্ত্রিকতার কাঁধে হাত রেখে পথ চলতে হয় তরুণদের। নগরের ফুটপাত, ক্যাম্পাস কিংবা বাস যেখানে যায় সেখানেই তাকে শিকার হতে হয় যন্ত্রণার। এত সব গঞ্জনা-বঞ্চনার সঙ্গে যদি যোগ হয় আপনার এক দঙ্গল বদভ্যাস; তখন কেমন বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড হতে পারে কখনও কী ভেবেছেন। যান্ত্রিক আপনি সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে প্রতিনিয়ত এই বদভ্যাসগুলোর পথ সুগম করে বিপদকে আপন করে নিচ্ছেন। ফলে, চেনা পথেই মুখ থুবড়ে পড়ছেন বারবার। চলুন দেখা যাক, কী ধরনের বদভ্যাস জেনে কিংবা নিজের অজান্তেই লালন করেন আপনি— রাস্তা পেরোনোর সময় কানে ইয়ার ফোন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয় আপনার। ফলে সকালের ক্লাসটা প্রায়ই ধরতে পারেন না। এ নিয়ে বাসায় এবং ক্লাসে বকাও শুনতে হয় মাঝেমধ্যে। তবু মাথাব্যথা নেই আপনার। বরং বেশ হেলেদুলে ক্লাসে যান কানে ইয়ার ফোন গুঁজে। ফুটপাতে হেঁটে হেঁটে গান শোনেন। শুধু তাই নয়; রাস্তা পারাপারে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে আপনি ইয়ার ফোন কানে গুঁজে রাস্তা পার হন ট্রাফিক সিগন্যালের তোয়াক্কা না করে। একটু ভেবে দেখেছেন কী ঝুঁকিটাই না নিচ্ছেন আপনি এই রাস্তা পারাপারে! চলন্ত গাড়িতে ওঠানামা ব্যস্ততা থাকতেই পারে, তাই বলে হুটহাট চলন্ত গাড়িতে উঠে পড়বেন? গাড়ি না থামতেই লাফিয়ে নামবেন? মনে রাখবেন, গাড়ি চলে পিচঢালা পথে। তার গায়ে আছড়ে পড়লে সে আপনাকে যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই দিতে পারবে না। আর আপনার পেছন থেকে আসা ধাবমান আরেকটা গাড়ি আপনার শরীরটাকে তো তোয়াক্কাই করবে না। তাই নিজের গন্তব্যে যেতে কয়েকটা সেকেন্ড অপেক্ষা করে যদি বিপদ এড়ানো যায়; তাতে লাভ বৈ লোকসান হবে না আপনার । হেলমেট না পরেই ছুটছে বাইক গতি আপনাকে তাড়া দেয়। দেবেই তো! গতিকে হার মানানোর মোক্ষম সময় তো এটাই। আপনার তাগড়া মনোবলের কাছে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে দুর্বলতায় ভর করে চলা গতি? আপনার ডানায় ভর করে এগিয়ে যাবে গতি—এটাই স্বাভাবিক। এই গতিকে হার মানাতে আপনি বাইক ছুটালেন হেলমেট ছাড়া। জানি, গতি মাথা নত করবে আপনার কাছে। কিন্তু বিপদ? সে তো আপনার গতিটাকে কাবু করার জন্যই গর্ত খুঁড়ে বসে থাকে। তাই এই ঝুঁকি থেকে নিজেকে সামাল দিতে হেলমেটটা পরে গতির সঙ্গে হারিয়ে দিন না বিপদটাকে! কথায় কথায় মিথ্যা বলা কথায় কথায় মিথ্যা বলাটা একটি সহজ বদভ্যাস কিন্তু নিখুঁতভাবে দেখলে বুঝা যাবে এরচেয়ে বড় বদভ্যাস আর একটিও নেই। সত্য মানুষকে মুক্তি দেয় আর মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। মিথ্যার আশ্রয়ে সাময়িক লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু সূর্যের আলো যেমন গোপন থাকে না, তেমনি শেষ পর্যন্ত মিথ্যাও গোপন থাকে না। একদিন না একদিন প্রকাশ পেয়েই যায়। তখন লোকের সম্মুখে আগের তুলনায় আরও অধিক অপদস্থ হতে হয়। মানুষের কাছে নিজের সম্মান বলতে আর কিছুই থাকে না। সবজান্তা ভাব আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা নিজেদের সবজান্তা মনে করেন। তারা মনে করেন, আমি সব জানি। তাদের ভাবটা এমন, যেন তাদের থেকে বেশি কেউ জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ মানুষ আর হতেই পারে না। আর সব থেকে অসুবিধা হয়, যখন এই সব মানুষের সঙ্গে এক সাথে কাজ করতে হয়। কারণ, আপনি যে কাজটাই করুন না কেন, এই ধরনের সবজান্তা মানুষের কাছে সেই কাজের কোনো মূল্যই থাকে না। এক অদ্ভুত রকমের আত্মতুষ্টিতে ভোগেন এই ধরনের মানুষেরা। এই সবজান্তা ভাবের কারণে কর্মক্ষেত্রে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। কিংবা বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় নাও থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন এই সবজান্তা ভাবটাকে দূর করা। বই ফেরত না দেওয়া এমন তো প্রায়ই হয়ে থাকে, কোনো বন্ধুর বাসায় গিয়ে একটা বই খুব ভালো লাগল, বইটা হয়তো আপনার পড়ার ইচ্ছা ছিল, কিনবেন ভেবেও কোনো কারণে কেনা হয়ে ওঠেনি। আর তাই হাতের কাছে পেয়ে বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে নিলেন বইটা। খুবই ভালো কথা। এর মধ্যে আর অন্যায়ের কী আছে! কিন্তু এর পরেই দেখা দেয় সমস্যা। ভুলে বই ফেরত দেওয়ার কথা বলছি না। এমন অনেকেই আছেন যারা বন্ধুদের কাছে থেকে বই নিয়ে ফেরত দেন না। আর এর কারণ হিসেবে অনেকে বলে থাকেন, হয়তো বইটা তার ভালো লাগে না, তাই ফেরত দিইনি। বই পড়া শেষ হয়ে গেলে সময় মতো ফেরত দেওয়া কিন্তু আপনারই দায়িত্ব। কারণ, বই পড়তে নিয়ে ফেরত না দেওয়া পরোক্ষ চুরিরই সামিল। অল্প আলোতে বই পড়া বই পড়া যাদের অভ্যাস তারা যেকোনো সময়ে, যেকোনো জায়গাতে বই পড়তে পারেন। বই পড়াটা আসলে এটা নেশার মতো। সে স্কুলের বই হোক, অথবা নিজের পছন্দমতো কোনো বই হোক, পড়তে তার কোনো সমস্যা হয় না। তখন বই সঙ্গে নেওয়া না হলে মনে হয় কি যেন একটা নেই। সব জায়গাতেই তার ইচ্ছে করে বই পড়তে। দেখা যায়, অনেক সময়ে অন্যের সমস্যার কথা চিন্তা করে রাতের বেলা লাইট নিভিয়ে বেডসাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়েন। আর তখনই সমস্যাটার সৃষ্টি হয়। অনেকে ভাবতে পারেন, বই পড়াতে কেন সমস্যা হবে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ সমস্যাটা বই পড়া নিয়ে না। কম আলোয় বই পড়া নিয়ে। বই পড়তে পড়তে অনেক সময়ে সময়ের খেয়াল থাকে না। তেমনি অনেকক্ষণ এভাবে কম আলোয় বই পড়তে থাকলে চোখের ব্যথা শুরু হয়। এগুলোর মাধ্যমে আসলে শরীর আমাদের জানান দেয় যে, ভবিষ্যতে গুরুতর সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত গসেপি গসিপ করাটা খুব একটা ক্ষতিকর মনে না হলেও এর অনেকগুলো খারাপ দিক কিন্তু আছে। সরাসরিভাবে শারীরিক কোনো ক্ষতি না হলেও মানসিক ক্ষতি এবং সম্মান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কখনোই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কোনো ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত জীবনে কী করবেন, না করবেন তা পুরোটাই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, এ নিয়ে অযথা গসিপ করলে সবার কাছে আপনি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবেন। কেউ আপনাকে বিশ্বাস করবে না বা আপনার সামনে তারা মন খুলে কথাও বলতে পারবে না। কারণ, তাদের মনে হতে পারে, পরবর্তীকালে হয়তো সেই সব কথা আপনার গসিপের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। অজান্তে নখ খাওয়া খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, নখ খাওয়ার অথবা দাঁত দিয়ে নখ কাটা কিংবা নখের পাশের চামড়া কাটার অভ্যাস অনেকেরই আছে। তবে এটাকে অভ্যাস বললে খুব কমই বলা হয়। আসলে দাঁত দিয়ে নখ কাটা খুবই খারাপ একটি অভ্যাস। এটি যত তাড়াতাড়ি পাল্টে ফেলা যায় তত ভালো। শুধু ছোট নয়, বড়দের মাঝেও এই নখ খাওয়ার বদভ্যাসটি দেখা যায়। ভালো শ্রোতা না হওয়া ভালো বক্তা অনেকেই হতে পারেন কিন্তু ভালো শ্রোতা হওয়াটাও খুবই জরুরি। আর সব ভালো বক্তাই যে ভালো শ্রোতা হবেন এমন ধারণাটাও কিন্তু বেশির ভাগ সময় মেলে না। নিজেই কথা বলে যান অথবা কারণে অকারণে যে কোনো কথার মাঝখানে হঠাত্ করে অধৈর্য হয়ে সে জায়গা থেকে উঠে চলে যাওয়া বা কোনো একটি জায়গা স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ওরা অন্যের মনোযোগ কাড়তে চায়। খারাপ শ্রোতা হওয়ার অনেক অসুবিধা আছে। তখন কী করবেন? মিলিয়ে দেখুন উপরের বদভ্যাসগুলোর কোনো না কোনো একটির সাথে হয়তো আপনি জড়িত। তাই নিজের এই বদভ্যাসগুলোকে সারাতে এখনই আপনার সতর্ক হওয়া উচিত। মডেল সারা