পরামর্শ

প্রতারণার ফাঁদে পা দেবেন না

ঢাকায় প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ আসেন কাজের খোঁজে। পড়াশোনা করতে আসেন অনেক ছাত্র-ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি কিংবা চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা?—এমন দ্বন্দ্বে পড়ে অনেকেই চাকরি খুঁজতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। একটি ঘটনা পড়লেই জানতে পারবেন। চাকরির খোঁজে ঢাকায় এসেছেন সাজ্জাদ। উঠেছেন ফার্মগেটে বন্ধুদের মেসে। বিএ পাস করেছেন তিন বছয় হয়। এখন বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানো দরকার। তাই চাকরির খোঁজে ঢাকায় আসা। গাবতলীতে নেমে ভাবছেন, ঢাকা শহরের এই বুকে তার ঠাঁই হবে তো? চাকরি হবে তো তার? আবির, জাভেদ, সবুজ ওরা বলেছিল, ‘ঢাকায় চাকরি পাওয়া অনেক কঠিন রে দোস্ত। অভিজ্ঞতা চায়, কম্পিউটার জানতে হবে, এটা-সেটা আরো কত কি! তোর কি কিছু জানা আছে?’ সাজ্জাদ বলল, ‘নারে...।’ ‘ঠিক আছে তুই আয় একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’ কথামতো সে ঢাকায় এসেছে। ঢাকায় নেমেই গাবতলীতে দেখে বেশকিছু লিফলেট দেয়ালে দেয়ালে, ইলেকট্রিসিটির থাম্বায় টাঙানো। তাতে লেখা ‘জরুরি নিয়োগ’, ‘আজই নিয়োগ’—এ রকম অসংখ্য বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন দেখামাত্র আশার আলো দেখা দেয় তার মনের কোণে। বেতনও দেখা যাচ্ছে সম্মানজনক। অভিজ্ঞতার বালাই নেই। অভিজ্ঞতা ছাড়াই চাকরি; তাও আবার এত ভালো বেতনে। খুশিতে মন ভরে যায় সাজ্জাদের। বিজ্ঞাপনে লেখা আছে—সরাসরি আজই যোগাযোগ করুন... ঠিকানায় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে। সাজ্জাদ চিন্তা করে, বন্ধুদের কাছে এখন যাবে, না-কি সরাসরি চাকরির খোঁজে যাবে। আগে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে বোঝানো দরকার চাকরিটা আসলে তারই বেশি দরকার। গাবতলীর একটি হোটেলে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে পত্রিকা স্টলে একটি দৈনিক কিনে পড়তে থাকে। এরই মাঝে একটি রিকশায় করে মিরপুর ১ নম্বরে একটি চাকরিদাতার ঠিকানা খুঁজে বের করে। প্রথমে অফিসের চেহারা দেখে ভড়কে যায় সাজ্জাদ। কেননা বিজ্ঞাপনে যেভাবে লেখা আছে ৪০ জন সুপারভাইজার ২০ জন..., ১০ জন... এত লোক নেওয়ার জন্য যে পরিমাণ মানুষের ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা—এতে তো বসার সিট হবে না। এতগুলো লোকের বসার জায়গা কই? ছোট্ট দোকান ঘর; খুপরির মতো। এখানে কে নেবে তার ইন্টারভিউ। কেমনভাবেই বা তাকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। গেট খোলার পর দোকানদার এলেন। তার দোকানে কিছু হোমিও ওষুধের শিশি। কিছুক্ষণের ভেতর একজন স্মার্ট স্যুটেড-বুটেড ভদ্রলোক এলেন। বসলেন দোকানের একটি চেয়ারে। জিজ্ঞেস করলেন কেউ এসেছেন কি না। সাজ্জাদকে দেখিয়ে দিতেই সালাম বিনিময় এবং একে একে বাড়ির অবস্থা, পড়াশোনা সব জিজ্ঞেস করলেন। এও জিজ্ঞেস করলেন—কেন তার চাকরিটা প্রয়োজন। সবকিছু শোনার পর বললেন, ইচ্ছে করলে আপনি কাল থেকেই কাজে জয়েন করতে পারেন। আপনার কাজ হচ্ছে মিরপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অফিসে অফিসে গিয়ে ইন্স্যুরেন্স করানো, শুরুতেই বেতন ৬ হাজার টাকা, টিএ ও ডিএ বিল পাবেন। কাজ ভালো করলেই পদোন্নতির সুযোগ। সাজ্জাদের মাথায় ঢুকছে না, কেন সবাই বলে ঢাকায় চাকরির অভাব। সে তো কারো সাহায্য ছাড়াই পেয়ে গেল একটি চাকরি। এরপর ভদ্রলোক সাজ্জাদকে বললেন, আপনার নিয়োগ বাবদ ২ হাজার টাকা। আইডেন্টিটি কার্ড বাবদ ২শ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ বাবদ মোট ৩ হাজার টাকা দেন। আগামীকাল এখানে এসে অ্যাপয়েনমেন্ট লেটারে সই করেই কাজে লেগে যাবেন। সাজ্জাদের কাছে মোট আড়াই হাজার টাকা সম্বল ছিল। সে খুশিতে আটখানা হয়ে বলল, স্যার আমার কাছে তো অত টাকা নেই। আমি দুই হাজার টাকা দিতে পারব। যদি এতেই চাকরিটা ব্যবস্থা করে দেন। ভদ্রলোক জানালেন, তিন হাজার টাকার নিচে চাকরি কাউকে আমরা দিই না। আপনাকে আমার সহজ-সরল মনে হয়েছে; ঠিক আছে দুই হাজার টাকাই দেন, বাকি টাকা না হয় প্রথম মাসের বেতন থেকে দেবেন। সাজ্জাদ টাকাটা দিয়ে খুশিতে তার বন্ধুর মেসে গিয়ে বলে দোস্ত, তোদের এত করে বললাম চাকরির কথা, তোরা বলিস চাকরি নাকি সহজ না। কাল থেকে সেখানে জয়েন করছি। বন্ধুরা শুনে তো অবাক। এটা কেমন করে সম্ভব? কৌতূহল নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে কীভাবে চাকরি পেল। তার সব কথা শুনে বলে, আরে বোকা তোকে ঠকিয়ে দুই হাজার টাকা নিয়েছে। সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করে, কেমন করে? আাামাকে তো ওরা চাকরি দেবে বলল, বন্ধুরা বলল, চাকরি পেতে টাকা লাগে না। তোর কাছে টাকা নিয়েছে, দেখবি তাদের আর দেখা পাবি না। সে হতাশ হয়ে যায়, বলে আমি কি চাকরি পাব না। বন্ধুরা জানায়, চল তো কাল গিয়ে দেখি কী অবস্থা। পরদিন কয়েকজন বন্ধু মিলে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখে দোকানে তালা লাগানো। আশপাশে জিজ্ঞেস করলে জানায়, ওরা তো অনেকের টাকা মেরে চলে গেছে। সাজ্জাদের মতো অনেক তরুণ ঢাকা শহরে এসে এমন প্রতারণার শিকার হয়। সর্বস্ব খুইয়ে অনেকে বাড়িতেও ফিরে যায়। শহরের ব্যস্ততম এলাকার মোড়ে মোড়ে, রাস্তার দুধারে, ল্যাম্পপোস্টে আঁটানো থাকে অসংখ্য জরুরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। যারা প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তরুণদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় টাকা-পয়সা। তাই যারা চাকরির খোঁজে ঢাকায় আসেন, তাদের কাছে পরামর্শ হলো—ঢাকায় নতুন এসে চাকরি খুঁজলে, সে প্রতিষ্ঠানের সুনাম সম্পর্কে জেনে নিন। প্রয়োজনে যারা এ বিষয়ে জানেন, তাদের কাছ থেকে জেনে নিন। প্রতিষ্ঠান ভালো হলে তবেই চাকরির জন্য অগ্রসর হবেন।