খাদ্য

চড়া চালের দাম প্রতি ভাবনা

সত্যিকারভাবেই ভরা ধানের মৌসুম এখন। দেশের উত্তর অঞ্চলের ধান গোলায় ওঠার পরেই দক্ষিণাঞ্চলের আমন ধান কাটার সময়। আর ধান মাড়াই, সিদ্ধ ও শুকানোসহ চাল প্রক্রিয়াজাত করতে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের মাঘ মাস লেগে যাবে স্বাভাবিকভাবেই। উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে দুই এলাকাই গেল মৌসুমে ধানের ফসল আসলেই ভালো। কৃষক ফসল উত্পাদনে আশানুরূপ ফল পেয়ে ভালোই খুশি। পাশাপাশি সরকারও বিগত ধানের মৌসুমে প্রাপ্ত ধান-চালের দামে চাষিরা তেমন লাভ পায়নি বলে সৃষ্ট আর্থিক কষ্ট-ক্লেশ দূর করার জন্য গ্রহণ করেছেন প্রয়োজনীয় পদপেক্ষ। সরকারের পক্ষ থেকে ধান-চাল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। চাষিকুল বাস্তবিক অর্থেই খুশি। এই যখন অবস্থা তখন হঠাত্ দেশের সকল মানুষকে অবাক করে দিল আকস্মিক যুক্তিহীনভাবে চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি। কেজিপ্রতি চালের দাম ৫-১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খুচরা চালের বাজারে কি হলো এমন ? কারণটা কি? সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। প্রশ্নটা আসাই তো স্বাভাবিক। কারণ, চাল এমন একটা পণ্য যা প্রতিটি পরিবারকে প্রভাবিত করে। আর নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের পরিবারগুলোর আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যায় চাল কিনতে। যেমন একজন রিকশাওয়ালা যদি রোজ ২০০ টাকা আয় করে আর পরিবারটি যদি হয় ৫-৬ জন সদস্যের তাহলে প্রতিদিন চাল কিনতে তার ন্যূনতম খরচ হবে ১০০ টাকা। সেক্ষেত্রে কেজিপ্রতি তার ১০ টাকা করে বাড়ছে চাল ক্রয়ে, যাতে তার দৈনন্দিন ব্যয়বৃদ্ধি পায় কম-বেশি শতকরা ৩০ ভাগ। এ ধরনের বিদ্যমান অবস্থার কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে চালের খুচরা বিক্রেতারা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবেই বলেছেন যে, মিল মালিকরা ধান গুদামজাত করে চালের সরবরাহ কমিয়ে হঠাত্ চালের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা সৃষ্টি করেছেন। সাধারণভাবেই অর্থনীতির গবেষকদের কাছে এবং বাজার বিশ্লেষকদের কাছে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিমত যুক্তিসংগত। কারণ, উত্পাদন অবস্থা ভালো থাকা সত্ত্বেও ভরা মৌসুমে হঠাত্ করে চালের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুদামজাতকরণ ছাড়া অন্য কোন যুক্তি নেই। পর্যবেক্ষণ থেকে এ কথা বলা যায় যে, আমাদের দেশে কৃষক পর্যায়ে ধান-চাল ধরে রাখার অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রবণতা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। মিল মালিকরা বিভিন্ন সময় আর্থিক মুনাফা লাভের প্রত্যাশায় এমন অনৈতিক আচরণ করার নজির এদেশে আছে। তাই চালের মতো এমন স্পর্শকাতর পণ্যের হঠাত্ দাম বৃদ্ধির কারণে সরকার কর্তৃক মিল মালিকদের চাল মজুতের বিষয়টি কার্যকরভাবে নিরীক্ষা করা ভুক্তভোগীদের দাবি। বিষয়টি অগ্রাধিকারের পর্যায়ে বিবেচিত হওয়াই কাম্য। কারণ, কৃষিপণ্যের মধ্যে চালের দামের উপরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুলাংশে নির্ভর করে। বাস্তবিকভাবেই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের পারিবারিক খরচের হিসেবের ক্ষেত্রে চালের খরচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে খেটে খাওয়া মানুষ যতটা না চিন্তিত হয় তার চেয়ে অধিক পরিমাণে চিন্তিত হয় চালের দাম বৃদ্ধিতে। এটা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব ফেলে না, বরং মনোজগতেও ভীষণভাবে প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে। তাই অযৌক্তিকভাবে চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি দেশের সচেতন-দেশপ্রেমিক মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না। লেখক : চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বনানী,ঢাকা।