প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০১৩, ২১:৪৪
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রভূত অবদানের জন্য ঢাকা রবিবার ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। তাঁর এই সফর এবং পুরস্কার প্রদান একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির ব্যাপক প্রতিবাদ ও হাঙ্গামার মধ্যে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রণব মুখার্জি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আসছেন, এই সফরের মাধ্যমে সেই মনোভাব স্পষ্ট। তিনি বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতম ভারতীয় রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত একই সাথে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কোন্নয়নে তিনি সহানুভূতিশীল।
ভারতীয় রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরকালে বিরোধী দলীয় নেতার সাথে বৈঠক করবেন এটাই রীতি। বিএনপি প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তার বৈঠক ছিল পূর্বনির্ধারিত। কিন্তু সে বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। ‘প্রতিবাদ’ স্বরূপ ঐ বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে যে, বিএনপির মিত্র জামায়াত যেহেতু চাপের মধ্যে রয়েছে সেখানে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া ভারতীয় রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত্ করতে চাইছেন না।
মার্চের ৩ ও ৪ তারিখে জামায়াত প্রথমে হরতাল আহ্বান করে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জামায়াতের এই হরতাল। খালেদা জিয়া শুক্রবার তার মিত্র জামায়াতের পাশে এসে দাঁড়ান। খালেদা জিয়া হরতাল কর্মসূচি আরেকদিন বাড়িয়ে ৫ মার্চ পর্যন্ত ঘোষণা করেন। আর এদিনই ভারতীয় রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর শেষ হচ্ছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ে জামায়াত বিরোধিতা করেছিল। খালেদা জিয়া জামায়াতের ওপর সরকারের ‘নৃশংসতার’ সমালোচনা করেন এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করেন। উল্লেখ্য, ’৭১ সালে মানবিকতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে জামায়াতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিচার চলছে। প্রণব মুখার্জি অনেক অনিষ্পন্ন বিষয়ে ভারতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলবেন। এর মধ্যে রয়েছে- তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি এবং স্থল সীমান্ত সংক্রান্ত চুক্তি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুক্রবার নয়াদিল্লীতে বলেছেন যে, প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের অনিষ্পন্ন বিষয়াদি নিষ্পন্নের ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি অবহিত করবেন। দ্বিপাক্ষিক সমস্যাদি শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় স্থান পাচ্ছে। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির সফর শেষে চলতি বছরের শেষার্ধে শেখ হাসিনার ভারত সফরের প্রস্তুতি শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট সহিংস অবস্থায় উপনীত হয়েছে।
সফরকালে ভারতীয় রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্মান পদক দেয়া হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনারারি ডক্টরেট অব ল’ পদক দিচ্ছে। প্রণব মুখার্জি প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার আব্দুল হামিদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সাথে বৈঠক করবেন। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সাথেও তার বৈঠক করার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এদেশের ভারতীয় কম্যুনিটির এক সংবর্ধনায়ও যোগ দেবেন।
প্রণব মুখার্জির সফর সঙ্গিদের মধ্যে রয়েছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় রেল প্রতিমন্ত্রী এবং ৪ জন লোকসভা সদস্য। এর মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক রেলমন্ত্রী মুকুল রায়ও রয়েছেন। মুকুল রায়ের দলে অন্তর্ভুক্তির কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে যে, মনমোহন সিং সরকার ও রাষ্ট্রপতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে আস্থায় নিয়ে তিস্তা ইস্যুর সমাধান করতে চাইছেন।
ভারতীয় রাষ্ট্রপতির প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বাংলাদেশকে নির্বাচন বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ব্যাপক গুরুত্ব প্রদানকেই মনে করিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়। উল্লেখ্য, প্রণব মুখার্জির সফরকে সামনে রেখে ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি বলেছে, ২০১১ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তিটি ত্রুটিপূর্ণ এবং সরকার এক্ষেত্রে বিজেপি’র সমর্থন পেতে পারে না। উল্লেখ্য, বাজেট অধিবেশনে সীমান্ত সংক্রান্ত ইস্যুতে সংবিধান সংশোধন বিলটি সংসদে উঠবে। সংবিধান সংশোধন হলেই বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত চুক্তি কার্যকর হবে। গত মাসে মনমোহন সিং মন্ত্রিসভা ঐ সংশোধনী বিলটি অনুমোদন করে যা স্থল সীমান্ত চুক্তি ১৯৭৪ নামে পরিচিত।
গত শনিবার অনুষ্ঠিত বিজেপির জাতীয় সম্মেলনে দলীয় সভাপতি রাজনাথ সিং বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে স্বাক্ষরিত চুক্তি একপেশে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মনমোহন সিংয়ের ঢাকায় সফরকালে স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তি ১৯৭৪ বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। আরো উল্লেখ্য, এই চুক্তির সাথে জড়িত বাংলাদেশে অবস্থিত ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতীয় ভূখণ্ডের ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল। সংবিধান সংশোধন সম্ভবপর হলেই ছিটমহলের জমি পরস্পরের কাছে হস্তান্তর সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই এই চুক্তি র্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলের আয়তন ১৭ হাজার ১৪৯ একর। এদিকে ভারতের ভূখণ্ডে বাংলাদেশি ছিটমহলের জমির আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর। বিজেপি প্রধান বলেছেন, ছিটমহল বিনিময়ের উদ্যোগ ভারতকে পরিত্যাগ করতে হবে ১৩ হাজার একর জমি। পক্ষান্তরে বাংলাদেশকে পরিত্যাগ করতে হবে ৩ হাজার একর জমি। কিন্তু সরকার কোন সদুত্তর দিচ্ছে না যে, দশ হাজার একর জমি বাবদ ক্ষতিপূরণ কীভাবে শোধ হবে।
ভাষান্তর :কায়কোবাদ মিলন
লেখক :দিল্লির সিনিয়র সাংবাদিক