শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটালকরণ:সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ

শিক্ষা নিয়ে একটি বিখ্যাত উক্তি হলো—‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি সভ্য এবং শিক্ষিত জাতি উপহার দিব’। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট-এর এই উক্তি আজ একবিংশ শতাব্দিতে এসেও যথাযথ বলেই স্বীকার করা যায়। বর্তমানে গোটা বিশ্ব তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপকতা এমনভাবে মাতৃস্নেহ বিছিয়ে আছে যা ছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে উপযুক্ত উন্নয়ন ও বিকাশ প্রায় অসম্ভব এবং অকল্পনীয়ও বটে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষার ভিত্তিতে গোটা জাতিকে সমুন্নত করে তোলার ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রত্যয়টিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে দেশ এখন ডিজিটাল বা প্রযুক্তিগত দিকে অনেকটাই এগিয়ে। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি সেবাসমূহ জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে গৃহীত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের কার্যক্রম থেকে জনগণ আজ অনেকটাই সুফল পাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের দুর্বলতাও রয়েছে যথেষ্ট। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ২৪৯টি ওয়েবসাইটের মধ্যে মাত্র ৩৩টি ওয়েবসাইট সম্পূর্ণভাবে বাংলা ভাষায় আর বাকিগুলোর বেশিরভাগই সম্পূর্ণ ইংরেজিতে। কিছু ওয়েবসাইট বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় হলেও সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খোলা বা ব্যবহার করা যায় না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটটি দীর্ঘদিন ধরে হ্যাকড হয়ে থাকলেও তা এখনো উদ্ধার সম্ভব হয়নি। জাতীয় ওয়েব পোর্টালের ৫৯টি ওয়েবসাইটের মধ্যে সম্পূর্ণ বাংলায় ৮টি এবং অন্যান্য দপ্তরের ১৯০টি সাইটের মধ্যে ২৫টি সাইট সম্পূর্ণ বাংলায়। অনেক লিংকে দু’একটি ছবি দিয়েই কাজ শেষ করা হয়েছে। আবার কিছু সাইট দীর্ঘদিন থেকে আপডেট করা হয় না এবং পুরোনো তথ্য সংবলিত (২১ ফেব্রুয়ারি, দৈনিক কালের কণ্ঠ)। এসব ওয়েব পোর্টালগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার উপযোগী না হলে ডিজিটালকরণে দেশ অনেকটা পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা। বেসরকারি বা ব্যক্তি-উদ্যোগে বাংলাদেশে শিক্ষায় ডিজিটালের ছোঁয়াও যথেষ্ট রয়েছে। দেশি ও বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখছে। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে ও গবেষণায় নানাবিধ যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতেও অনেক প্রতিষ্ঠানকে দেখা যায়। আমার জানা মতে এ ধরনের উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভিউ ই-জার্নাল প্রকাশ ছাড়াও বহু গবেষণাকর্ম ই-আরকাইভিং-এর কাজও করেছে। যা থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকশ্রেণি অনেকটাই সুফল পাচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন ই-প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক গবেষণাসমৃদ্ধ ই-বুক প্রকাশ করেছে যা শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমার জানা মতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যাপ্তকরণে 'Digital Gaming Key Content' নামে শিক্ষার্থীদের সহজ পাঠ্য উপযোগী করে ডিজিবুক পাবলিকেশন্স মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছে যা সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন ও উত্তর সংবলিত। ইতিমধ্যেই কিছু বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের ক্ষেত্রেও এ ধরনের মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ব্যবহার হচ্ছে যা শিক্ষার্থীদের সহজ পাঠ্য উপযোগী। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি আরো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটালকরণে ই-বুক, সৃজনশীল ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে এগিয়ে আসা জরুরি। সরকারকেও ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রকাশনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে বেসরকারি উদ্যোগকে কার্যকর রূপদানে সহযোগিতার হাত বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটালকরণে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় উদ্যোগই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রথমেই শিক্ষায় ডিজিটালকরণে কিছু প্রতিবন্ধকতা সরকারিভাবেই সমাধান করতে হবে। সংক্ষেপে প্রতিবন্ধকতাগুলো উল্লেখ করতে চাই, যেমন:বিদ্যালয়ের জন্য ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ইন্টারনেট, ই-বুক সার্ভারের জন্য ব্যান্ডউইথ বাড়ানো এবং অন্যান্য প্রচলিত উপকরণও সাথে রাখতে হবে যেমন:হোয়াইট বোর্ড, মার্কার, ডাস্টার ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক এবং বৈদ্যুতিক সাপোর্ট। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক যথেষ্ট পরিমাণে বিস্তৃত ও শক্তিশালী করতে হবে। আবার ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির বিষয়টাও ইউনিফর্ম হতে হবে। কনটেন্টটি সৃজনশীল সাম্ভাব্য সবধরনের প্রশ্নোত্তর সংবলিত হতে হবে। আমাদের সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় সহায়ক পাঠ্যবই বা গাইড বই অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশ্নের সমাধান না পাওয়াতে এ ধরনের সহায়ক পাঠ্য বা গাইড বইয়ের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকাংশে গাইড বই ওই মূল বই হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। ডিজিটাল ক্লাসরুমে ব্যবহূত মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টসমৃদ্ধ না হলে তা শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় ও খারাপ ফলাফলের ঝুঁকি বহন করবে। ডিজিটালাইজড শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রিন্ট ভার্সনের সহায়ক পাঠ্যবই বা গাইডবই-এর বিকল্প হিসেবে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। সেটা বিনামূল্যে অথবা বাণিজ্যিকও হতে পারে। বাংলাদেশে কর্মজীবী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ যাদের শিক্ষার জন্য ই-স্কুলিং ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে। পাঠ্যবই ও সহায়ক বই ই-বুক করার পাশাপাশি সৃজনশীল সাহিত্য, বিজ্ঞান ও গবেষণাধর্মী বইসমূহ ই-বুক করে আমাদের মাতৃভাষাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলাই সবার কাম্য হওয়া উচিত। লেখক:শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় Email: sultanmahmud.rana@gmail.com