বেড়ানো
মধু ভ্রমণে সুন্দরবন
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০১৩, ১৯:৩৬
লেখা ও ছবি মুস্তাফিজ মামুন
নানা প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার আমাদের সুন্দরবন। আর এ সম্পদের অন্যতম একটি মধু। প্রতি বছর সুন্দরবন থেকে কমবেশি ষোল হাজার মণ মধু সংগ্রহ করেন বনজীবী মৌয়ালরা। বহুকাল ধরে মৌয়ালরা বাঘ, কুমিরসহ নানান হিংস্র প্রাণীর ভয়কে উপেক্ষা করে নিজস্ব পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন জঙ্গলের গহীন থেকে। কোনো এক মৌয়াল দলের সঙ্গে গিয়ে আপনিও অর্জন করতে পারেন মধু সংগ্রহের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
রহস্যে ঘেরা এক বনের নাম সুন্দরবন। জালের মতো বিছানো শত শত নদী-আর খালের বাঁকে বাঁকে এখানে সৌন্দর্যের পসরা। সুন্দরী, খলসে, বাইন, পশুর, গেওয়া, কেওড়া, হেতাল, কাঁকড়া, গর্জন, ধুন্দল আরও কতশত গাছ এ বনে! গ্রীষ্মের শুরুতে এসব গাছে ফুল ফোটে, ঘ্রাণ ছড়িয়ে দেয় জঙ্গলের বাতাসে বাতাসে। মৌমাছিরা দলে দলে এসব ফুল থেকে মধু নিয়ে চাক বাঁধে গাছে গাছে। গাছের ডালে জমা হয় প্রকৃতির অমূল্য দান মধু। সুন্দরবনে মৌসুমের সর্বপ্রথম আসে খলসে ফুলের মধু। এর নাম পদ্ম মধু, রং সাদাটে। মানের দিক থেকে এরপরেই গরান ও গর্জন ফুলের ‘বালিহার মধু’, এর রং লাল, স্বাদে ঝাঁঝালো মিষ্টি। মৌসুমের একেবারে শেষে আসে কেওড়া ও গেওয়া ফুলের মধু, স্বাদ হালকা টক ও মৃদু তিতা। মৌয়ালরা তাদের সংগৃহীত মধু বিক্রির পসরা সাজান সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনী সংলগ্ন গাবুরা গ্রামে। এখানে ২৫০-৩৫০ টাকা মূল্যে বিক্রি হয় প্রতি কেজি মধু। পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন জঙ্গল লাগোয়া লোকালয়ে এই মধু উত্সকে কেন্দ্র করে লোকেরা বাস গড়েছে বহুকাল ধরে। যুগ যুগ ধরে জঙ্গলের এই মধু ‘মৌয়াল’ নামের এক শ্রেণীর পেশাদারের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উত্স। বন বিভাগ তিন মাসের জন্য মৌয়ালদের বনের ভিতরে ঢুকে মধু সংগ্রহের অনুমতি দিয়ে থাকে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ কার্যালয় থেকে মেলে এ অনুমতি। পয়লা এপ্রিল যাত্রা শুরুর আগে মৌয়ালদের বনের রাজস্ব আদায়সহ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই নৌকা ছুটাতে হয় বনের উদ্দেশ্যে। যাত্রার শুরুতে একটি প্রার্থনা সভার মাধ্যমে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ শেষে নিরাপদে ফিরে আসার আকুতি জানান নিজ নিজ ধর্মের প্রভুর কাছে। প্রার্থনা শেষে প্রত্যেক মৌয়ালের হাতে বেঁধে দেওয়া হয় লাল কাপড়। তাদের বিশ্বাস এ কাপড় বিপদ-আপদ বিশেষ করে বনের রাজার হাত থেকে রক্ষা করবে তাদের। প্রার্থনা শেষে মৌয়ালরা লোনা পানি কেটে বৈঠা টানেন জোরেসোরে।
সাত থেকে তেরজন মৌয়াল থাকেন সাধারণত একেকটি দলে। দলের সবাই থাকেন আপনজন। বনে পৌঁছে একজনকে নৌকা পাহারায় রেখে সবাই ঢুকে পড়েন ভেতরে। গামছা দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে নেন মৌমাছির হুল থেকে বাঁচতে। মৌয়ালদের চোখ থাকে গাছে গাছের ডালে ডালে। সবাই-ই ডালে ডালে খুঁজে ফেরেন মধু ভরা মৌচাক। তবে চাক ভাঙ্গার সিদ্ধান্তটি নেন দলনেতা, মৌয়ালরা যাকে বলেন বহরদার। সবার হাতে দা, ধামা। বহরদার অভিজ্ঞ মৌয়াল। বাতাসের গতি ও মৌমাছির উপস্থিতি ইত্যাদি লক্ষ করে মৌচাকের অবস্থান খুঁজে বের করেন তিনি। সাধারণত তারা মৌচাকের অস্তিত্ব টের পান গাছের পাতায় মৌমাছির মল কিংবা মৌমাছির ওড়াউড়ি দেখে। বহরদারের অনুমতি মিললে গাছে চড়ে মৌচাকে আগুনের ধোঁয়া দেন একজন, একজন দা দিয়ে কাটেন চাক, নিচে বেতের তৈরি ধামা পেতে কাটা চাক ধরেন অরেকজন। এভাবেই জঙ্গলে জঙ্গলে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন মৌয়ালরা। সারা দিনের সংগ্রহ নিয়ে সন্ধ্যায় নৌকায় ফেরেন তারা। মাটির বড় মটকিতে পুরে ফেলেন দিন শেষের সংগ্রহ। মৌয়ালদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সুন্দরবনের গহীনে মধু সংগ্রহের এসব রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা করে থাকে বেসরকারি বিভিন্ন ভ্রমণ সংস্থা। সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ দেখতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন অভিজ্ঞ কোনো ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে। প্রতি বছরের মতো এবারও ভ্রমণ সংস্থা বেঙ্গল ট্যুরস মধু সংগ্রহের বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা করেছে। যে কেউ উপভোগ করতে পারবেন সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবনযাপন ও মধু সংগ্রহের রোমাঞ্চকর সব দৃশ্য। ৩১ মার্চ থেকে শুরু হবে এ ভ্রমণ। ৪ রাত ৩ দিনের এ ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ হবে ১৩৫০০ টাকা, বিদেশিদের জন্যে ১৫৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে এসি বাসে সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনী, সেখান থেকে বেঙ্গলের নিজস্ব ভ্রমণ তরীতে পশ্চিম সুন্দরবনের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো আর মধু সংগ্রহ দেখা। সবশেষে আবার এসি বাসে ঢাকায় ফেরা। যোগাযোগ :বেঙ্গল ট্যুারস লিমিটেড, বাড়ি-৪৫, রোড-২৭, ব্লক-এ, বনানী, ঢাকা। ফোন :০২-৯৮৫৭৪২৪।
ইমেইল :info@bengaltours.com
ওয়েবসাইট :www.bengaltours.com
প্রয়োজনীয় তথ্য
সুন্দরবনের এ এলাকাটিতে মানুষ খেকো বাঘের আনাগোনা বেশি। বনের কোথাও তাই নিরাপত্তা কর্মী ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না। চাক ভাঙ্গা সময় মৌমাছির কামড় থেকে বাঁচতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নেট ঘেরা হ্যাট। এ ছাড়া শরীরের কোনো অংশই যেন অনাবৃত না থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। প্যান্টের নিচের অংশ বুটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া যেতে পারে। ফুল হাতার টি-শার্ট পড়ে হাতে পড়তে হবে পাতলা মোজা। সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী অঞ্চলে মশা আর পোকামাকড়ের উপদ্রব বেশি। এ ছাড়া ভ্রমণকালীন কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি। বনের মধ্যে কোন রকম পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট ফেলবেন না। বনের ভেতরে ধূমপান করবেন না।
সঙ্গে যা নেবেন
কেমোফ্লাজ ট্রাউজার, জাঙ্গল বুট, ফুল হাতা টি শার্ট, নেট ঘেরা ক্যাপ, দূরবিন, ক্যামেরা, পর্যাপ্ত মেমোরি কার্ড, জঙ্গল বুট, হাত মোজা, পা মোজা, রোদ টুপি বা হ্যাট, ছাতা, হেড ল্যাম্প কিংবা টর্চ, পতঙ্গ নিরোধক ক্রিম, প্রয়োজনীয় ঔষধ-পত্র, মানচিত্র, জিপিএস ইত্যাদি।