প্রসঙ্গ :রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প

পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ৬২টি শিল্প-কারখানার কোন হদিসই পাওয়া যাইতেছে না। এইগুলি সম্পূর্ণভাবে গায়েব হইয়া গিয়াছে। বেসরকারিকরণের জন্য বিভিন্ন সময়ে পাঁচ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত ১০১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের যেই তালিকা প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডকে দেওয়া হইয়াছে সেই সম্পর্কে সরেজমিনে জরিপ করিতে গিয়া এই বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গিয়াছে। জরিপে দেখা যায় যে, বর্তমানে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব থাকিলেও অবশিষ্ট ৬২টির কোন প্রকার খবরই নাই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও করপোরেশন দফায় দফায় যোগাযোগ করিলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের সঠিক ঠিকানা দিতে পারে নাই সংশ্লিষ্টরা। ইহা আসলেই তাজ্জব কথা বটে। কাগজে-কলমে ১০১টি শিল্প-কারখানার অস্তিত্ব দেখানো হইলেও প্রকৃত প্রস্তাবে সেইখানে আছে মাত্র ৩৯টি। তাহা হইলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, বাকিগুলি গেল কোথায়? এইগুলি কাহার বা কাহাদের উদরপূর্তি করিল? এবং তাহা কি উপায়েই বা সম্ভব হইল? ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নাই’ এই প্রবাদ বাক্যটি এই ক্ষেত্রে একেবারেই মোক্ষম রূপে প্রযোজ্য বৈ নহে। কথাটি এই যে, রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লইয়া এইরূপ তিলিস্মাতি কাণ্ড যাহারা ঘটায় বা ঘটাইতেছে তাহাদের শনাক্ত করার উপায় কি? রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বিরাষ্ট্রীয়করণের জন্য প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের নিকট তালিকা পাঠানো হয়। কিন্তু এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে গোটা ব্যাপারটাই লুটপাটের ঘটনায় পর্যবসিত হইতে দেখা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মাত্রেই লোকসানী প্রতিষ্ঠান-এই ধরনের একটি ধারণা সৃষ্টি করিয়া কিংবা কাগজে-পত্রে এই অলীক কাহিনী প্রচার করিয়া ঐ দুর্নীতিগ্রস্ত, দেশবিরোধী ব্যক্তিরা গাছেরটাও খায় তলারটাও কুড়ায়। ইহাই চলিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন ধরিয়া। এইসব বিষয়ে যাহাদেরকে তদারকীর ভার দেওয়া হয় তাহারাও রাবণরূপে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে জনগণের টাকা ও স্বার্থ মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজের দ্বারা ভূলুণ্ঠিত হয়। মোদ্দাকথা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি করিয়া এবং বত্সরের পর বত্সর একরকম উদ্দেশ্যমূলকভাবে লোকসান দেখাইয়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকে হাতাইয়া নেওয়ার খেলা চলিতেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত থাকাকালে যেইসব প্রতিষ্ঠান লোকসান গনে সেইগুলিকে ব্যক্তিমালিকানায় ছাড়িয়া দিলেই তাহা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় ইহা কি একপ্রকার ভোজবাজি নয়। অর্থাত্, নানান বুজরুকীর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে লোকসান দেখাইয়া স্বল্পমূল্যে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের জন্য একটি-দুটি চক্র রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ঘাপটি মারিয়া বসিয়া রহিয়াছে। ব্যক্তিমালিকানায় ছাড়িয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কোষাগারে যেই পরিমাণ অর্থ আসা উচিত উহাও আসে না ঐ দুর্নীতিবাজদের নানান কারসাজির কারণে। আবার অনেককে স্বল্পমূল্যে এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মালিক বনিবার পরে প্রতিষ্ঠানটির জমি-জিরাত বা স্থাপনা, কল-কারখানা বিক্রয় করিয়া দিতে দেখা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলি দিনকে দিন লোকসান গনুক ইহা নিশ্চয়ই কেহই কামনা করে না, কিন্তু আসলেই লোকসান গনিতেছে কিনা, নাকি কাগজেপত্রে লোকসান দেখাইয়া কুচক্রীরা উহা নামমাত্র মূল্যে হাতাইয়া লইতেছে এইসব বিষয়ও গভীরভাবে পরখ করিয়া দেখা দরকার। সত্যি সত্যি লোকসান গনিলে উহাকে ব্যক্তিমালিকানায় ছাড়িয়া দিতে কোনই আপত্তি থাকিতে পারে না। ব্যক্তি মালিক উহাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করিয়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখিবেন ইহাই প্রত্যাশিত। কিন্তু কাগজেপত্রে থাকিলেও বাস্তবে অস্তিত্বহীন ঐ ৬২টি কল-কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যে আসলে কি ঘটিয়াছে উহা নিরূপিত হওয়া একান্তই আবশ্যক। কেননা, সকলের জাগ্রত চক্ষুর সম্মুখে একটি নহে, দুইটি নহে বাষট্টিটি প্রতিষ্ঠান একেবারেই দৃশ্যের অন্তরালে হারাইয়া গেল, ইহা সম্ভব কিরূপে? এমনিভাবে কল-কারখানা হারাইয়া গেলে একদিন দেশের আরও বড় কিছু যে হারাইয়া যাইবে না সেই গ্যারান্টি আজ কোথায়? আর কেইবা দিবে সেই গ্যারান্টি?