ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত সমাবর্তন বক্তৃতা

আমাদের কাজ করে যেতে হবে একযোগে

আজ এই ঐতিহাসিক স্থানে আপনাদের সামনে উপস্থিত হতে পেরে আমি গর্বিত। আপনারা আমাকে এক অসাধারণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। আপনারা আমার প্রতি যে ভালোবাসা ও স্নেহসুধা বর্ষণ করেছেন এবং যে চমত্কার আতিথেয়তা প্রকাশ করেছেন তাতে আমি অভিভূত। বাংলাদেশ ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার বিদেশ সফরের প্রথম দেশ। বাংলাদেশে ভারতবর্ষের শেষ রাষ্ট্রপতির সফর ছিল রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরির, প্রায় ৪০ বছর আগে ১৯৭৪ সালে। আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে এটি একটি আবেগময় সফর। আমার শিকড় বাংলাদেশের মাটিতে গাঁথা এবং আমি এর ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আত্মভূত করেছি। আমার স্ত্রীর জন্ম নড়াইলে। এখানেই তিনি লেখাপড়া শুরু করেন। আমি বড় হয়েছি আপনাদেরই মত একই সাহিত্যিক ও কবিদের লেখা পড়ে। সেসব গান শুনেছি, যা শুনতে আমাদের উভয় দেশের জনগণ ভালোবাসে। ঘুরে বেড়িয়েছি একই নদীর তীরে, যা একই রকম ভাবে লোকসংগীতের জন্ম দেয়। যা আমাদের মনকে একই রকম ভাবে আপ্লুুত করে তোলে। যখন ছোট ছিলাম তখন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি আমার দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমি এখানে আসতে পারবো। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন এবং শুভেচ্ছা জ্ঞাপনে আমি অভিভূত। আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সর্বস্তরের মানুষের অনেক অভিনন্দনবার্তা পেয়েছি। এই সুযোগে আমি সেদিনের শুভেচ্ছার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আজ, আমি শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে উপনীত মহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। এটি একটি অর্জনের শতাব্দী। এই সমাবর্তন উত্সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষাক্রমে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ সকল স্নাতক শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। আজ আমরা যেভাবে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে এর পুরনো স্মৃতির কথা স্মরণ করি তেমনি আমরা গর্বের সঙ্গে লক্ষ্য করি সমসাময়িক এশিয়ার শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে এর অবস্থান। আজ আপনারা যারা স্নাতক হয়েছেন তারা আপনাদের আগের প্রজন্মের উত্তীর্ণ মহান প্রাক্তনীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। মনে আসছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ, বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বোস, ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, কবি বুদ্ধদেব বসু ও শামসুর রাহমানের কথা। এদের মধ্যে আছেন গত শতাব্দীর উজ্জ্বলতম মননশীল ব্যক্তিত্ব, যারা তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের জন্য বিশিষ্ট হয়ে আছেন। এই মহান শিক্ষায়তনে ছাত্রাবাসগুলি বাংলাদেশ সৃষ্টির সূতিকাগার ও কর্মভূমি। এই ক্যাম্পাসে স্বাধীনতা যুদ্ধেও অগণিত রূপকার প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু এর আগে যারা ছিলেন তারা ছিলেন পথপ্রদর্শক। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তত্কালীন সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সমাজ যে মিছিল বের করেছিল তা কে ভুলতে পারে। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে আজ জাতিসংঘ শহীদদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দিয়েছে। আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পৈশাচিক হামলার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, যে হামলায় ৩০০ শিক্ষক, সতীর্থ ও বুদ্ধিজীবী নিহত হন। তারা অনেকেই এই দেশের ওপর চাপানো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তোলেন এবং তারাই আবার স্বাধীনতার পর দেশকে রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরন্তর প্রয়াস চালাচ্ছেন। আজ যখন বাংলাদেশ মুক্ত ও স্বাধীন এবং আনন্দের সঙ্গে আত্মউন্নয়নে নিয়োজিত তখনই শহীদদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি মিলছে। তাদের আত্মত্যাগের কারণে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এই দেশকে তাদের নিজেদের দেশ বলতে পারছে। আপনাদের মত তরুণ-তরুণীরাই আমাদের এই অঞ্চলের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ আপনাদের হাতে। আপনাদের জানা উচিত যে, আপনাদের একটি মহিমান্বিত অতীত আছে এবং প্রতিশ্রুতিভরা ভবিষ্যত্ আছে। জাতি গঠন কাজে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের বিচক্ষণতা, সচেতনতা ও সংশ্লিষ্টতা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এটি একটি ভালবাসার শ্রম-যেভাবে এদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অনবদ্য ভাষায় বর্ণনা করেছেন, ‘যা মানব সভ্যতাকে উদ্বিগ্ন করে, একজন মানুষ হিসেবে, তা আমাকেও উদ্বিগ্ন করে। একজন বাঙালি হিসেবে বাঙালিকে যে সব বিষয় উদ্বিগ্ন করে আমি তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই অবধারিত জড়িয়ে পড়া দীর্ঘস্থায়ী ভালবাসা, চিরন্তন ভালবাসার মধ্যে সৃষ্ট ও লালিত- যা আমার রাজনীতি এবং আমার একান্ত নিজস্বতাকে তাত্পর্য দিয়েছে।’ মানবতা ও আস্থার এই অসাধারণ চেতনাই বাংলাদেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠেছে। এটি প্রশংসনীয়। সার্বিক মানব উন্নয়নে তাদের অর্জনের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের প্রশংসা করি। অনেক সামাজিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশ দৃষ্টান্তমূলকভাবে এগিয়ে আছে। দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৪ বয়ঃক্রমের তরুণদের মধ্যে সাক্ষরতার হার এখন ৭৭ শতাংশ, অন্যদিকে মানুষের গড় আয়ু ৬৯ বছর। আপনারা দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা নিরসন ও সার্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন নজীর স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের বিদ্যালয় পাঠ্যবই প্রণয়ন প্রকাশ কর্মসূচি পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ শিক্ষাজনিত কর্মসূচি বলে পরিচিত এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থীর গড় প্রায় ৫১ শতাংশ। যদিও দারিদ্র্য হার প্রায় ৩১ শতাংশ, আপনাদের অর্জন বিশ্বমানের যার ওপর ভিত্তি করে সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশের সৌধ নির্মিত হবে। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, আপনারা বাংলাদেশের তরুণেরা, নিষ্ঠার সঙ্গে এই মহান দায়িত্ব পালন করবেন। আজ বাংলাদেশ যে গণতন্ত্রকে বরণ করেছে, সেটি হল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এর জনগণ যে মূল্যবোধ ও নীতিমালার সমাদর করতেন, তার কারণে। আপনারা আপনাদের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন। আপনারা যে কারুর চেয়ে ভাল জানেন যে, গণতন্ত্রের অর্থ হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান প্রদর্শন এবং অভিন্ন কল্যাণের জন্য জনগণের ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দেয়া। আপনারা জানেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং স্বাধীন উক্তি ও স্পন্দনমান সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করে তোলা। আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্তিশালী হবে এবং আপনারা গণতন্ত্র রক্ষায় সদা সতর্ক থাকবেন। ভারত ও বাংলাদেশ যেভাবে আন্তসম্পর্কযুক্ত, বিশ্বে এমন আর দুটি দেশ নেই। আমাদের নিয়তি আমাদের ইতিহাস এবং ভূগোলের মতই একত্রে বোনা। আমাদের সাধ্যের মধ্যে ভারত বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নতি ও তার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সমর্থন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা বিশ্বাস করি, ভারত ও বাংলাদেশকে একযোগে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে এবং এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, আমাদের প্রবৃদ্ধি যেন আমাদের দু’দেশের জনগণের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করে। আমরা উভয়েই একই বাধার মোকাবিলা করছি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন বলেছেন, আমাদের একই শত্রু—সেই শত্রু দারিদ্র্য। আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতার শক্তি সর্বাধিক করতে আমাদের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। একটি দ্রুতপ্রজ আধুনিক অর্থনীতির দেশ হিসেবে উঠে আসতে বাংলাদেশ তার প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ কাজে লাগাবার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। স্থল ও জলসম্পদের শক্তি ছাড়াও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি আশীর্বাদ যা অনুসন্ধান করা এবং লাভজনকভাবে কাজে লাগানো দরকার। বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা বাংলাদেশে জন্মলাভ করে। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আবার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে। এর বাস্তব ফল পাওয়া যাবে সুষ্ঠু জল ব্যবস্থাপনা, অধিক বিদ্যুত্ ও গ্রিড সংযুক্তি, আরো বাণিজ্য এবং দু’দেশের মধ্যে জনগণ ও পণ্যের আরো আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে। ভারত ও বাংলাদেশ আমাদের এই অঞ্চলে এবং এর বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃহত্তর সমন্বয়ের পথে নেতৃত্ব দিতে পারে। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর এবং ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের ফলে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি নতুন জোয়ার এনেছে। এখন আমাদের উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা চুক্তি কাঠামো রয়েছে যা আমাদের ভবিষ্যত্ সহযোগিতার পথনির্দেশিকা। এই দুই ঐতিহাসিক সফরকালে গৃহীত সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নে দুই দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখে আমি সন্তুষ্ট। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, ভারত সকল গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ানোর বিরাট সুযোগ রয়েছে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে ২৫টি ট্যারিফ লাইন ছাড়া সকল পণ্যের ওপর থেকে কোটা ও শুল্কের বাধা তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ এখন আমাদের বিশাল বাজারে করমুক্ত প্রবেশাধিকার লাভ করেছে। আমি বাংলাদেশের শিল্পমহলকে এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের আমন্ত্রণ জানাই। আমরা বাকি পণ্যের কর বাধা অপসারণে আরো সীমান্ত হাট চালু এবং পণ্যের মানের সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষেত্রে আপনাদের সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সংশোধিত ভ্রমণ ব্যবস্থার ফলে ভিসা ব্যবস্থা সহজতর হবে। এর ফলে বিশেষ করে ব্যবসায়ী, ছাত্র, সাংবাদিক, ভ্রমণকারী এবং চিকিত্সার জন্য যেতে ইচ্ছুকদের সহায়তা হবে। আমাদের দুই দেশকে ঘনিষ্ঠতর করার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে দুই দেশের মানুষের মধ্যে আরও যোগাযোগ ও আদান প্রদান। বাংলাদেশ সরকারকে আমার সরকারের দেওয়া ঋণরেখা বাস্তবায়নে অগ্রগতি হচ্ছে জেনে আমি খুশি। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে রেলওয়ে খাতে কাজ শুরু হয়ে গেছে। ঋণরেখায় কেনা দ্বিতল বাস রাস্তায় চলাচল করছে দেখে আমি খুশি হয়েছি। বাংলাদেশের রেলপথে শিগগিরই অনেক নতুন ভারতীয় ইঞ্জিন ও রেলশকট সন্নিবেশিত হবে। আমরা বাংলাদেশকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প রূপায়ণের জন্য ২০ কোটি ডলার মঞ্জুরির প্রস্তাব করেছি। কয়েক সপ্তাহ আগে এই মঞ্জুরির ৫ কোটি ডলারের প্রথম কিস্তি হস্তান্তর করা হয়েছে। আমাদের দুই দেশ বিদ্যুত্ খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে প্রথমবারের মত এ বছরের মাঝামাঝি আমাদের দুই দেশের বিদ্যুত্ গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সঞ্চালিত হবে। বাংলাদেশের বিদ্যুত্ চাহিদা মেটাতে ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুত্ কোম্পানি’ মংলার কাছে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক সুপার থারমাল কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছে। আমার সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমানা চুক্তি এবং এর ২০১১-এর প্রটোকল কার্যকর করতে সংসদে সংবিধান সংশোধনের একটি বিল আনার প্রস্তাব করছে। সীমান্তে যাবতীয় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা রোধে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সীমান্তকে শান্তি ও হিতকর সহযোগিতার প্রবেশপথ বানাতে আমাদের অবশ্যই একযোগে কাজ করতে হবে। অভিন্ন নদীর জলবণ্টন আমাদের কাছে একটি উচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক বিষয়। অতীতে আমরা সাফল্যের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি করেছি এবং তিস্তার জল বণ্টনে আশা করি তেমনি একটি চুক্তিতে আমরা শীঘ্রই উপনীত হতে পারব। ইতোমধ্যে আমাদের যেসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে, সেগুলো হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তি, দক্ষতা অর্জন, কৃষি গবেষণা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, সুন্দরবন রক্ষা এবং প্রচলিত ও উভয় উেসর শক্তির সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ। শিক্ষাখাতে আমাদের আরও অধিক বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে অধিক হারে ছাত্র, অনুষদ, গবেষক ও শিক্ষক বিনিময় করতে হবে। আমরা বাংলাদেশের ছাত্র ও পেশাজীবীদের বিপুলসংখ্যক বৃত্তি দিয়ে থাকি। আরও অনেক ছাত্র নিজ খরচে ভারতে উচ্চশিক্ষা নিতে যান। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেসন্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেগোর চেয়ার ও হিন্দি চেয়ার প্রবর্তন করেছে। এইসব ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অধিকতর শিক্ষাবিষয়ক যোগাযোগ ও মতবিনিময়ে উত্সাহ যোগাবে। আমি গত বছর বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মত যাওয়া একশো জন যুবপ্রতিনিধির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে সাক্ষাত্ করে খুশি হয়েছিলাম। এঁদের অনেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। এ বছর অনুরূপ একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফরে আসবেন জেনে আমি আনন্দিত। বিশ্বে এমন দেশ খুব কমই আছে যেখানে বাংলাদেশের মত গান, কবিতা, শিল্পকলা ও নাটক জাতির বিবেক ও সচেতনতার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। আপনাদের কাছ থেকে আমাদের ভারতের অনেককিছু শেখার আছে। আমি এই সুযোগে জানাতে চাই যে, শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের ক্যাম্পাসে ‘বাংলাদেশ ভবন’ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশকে জমি প্রদান করেছেন। বিশ্বভারতীর ‘বাংলাদেশ স্ট্যাডিজ প্রোগ্রাম’-এর গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণে ‘বাংলাদেশ ভবন’ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস। আপনাদের দিকে তাকিয়ে আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছি বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল। আমি আপনাদের ভবিষ্যত্ জীবনের সাফল্য কামনা করি যাতে আপনারা সোনার বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করতে পারেন। আপনাদের দেশের ভাগ্য নির্মাণে ভারত আপনাদের পাশে থাকবে। এই কথা বলে আমি বিনম্রচিত্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Doctor of Laws Honoris Causa উপাধি গ্রহণ করছি। আজ আপনাদের মাঝে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর এবং কয়েকটি কথা বলার সুযোগ করে দেবার জন্য আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পুনরায় ধন্যবাদ জানাই। এই সুযোগে আমি আপনাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম জনগণকে ভারতের জনগণের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী দীর্ঘজীবী হোক। ধন্যবাদ।