রা জ নী তি
সরকার কোথায় থাকে?
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২১:২৭
গত খণ্ডে যখন লিখি ‘এই মেরুকরণটি জরুরি ছিল’, একটা রাজনৈতিক মেরুকরণই আমার উপলব্ধিতে ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ৪২ বছর ধরে অমীমাংসিত বিষয়াদির একটা তাগিদ ছিল অন্য অনেকের মতোই। শাহবাগের উছিলায় যে ‘তারুণ্য’ রাজনীতিবিমুখতার বদলে রাজনীতি-ইতিহাস সম্পৃক্তির ঘোষণাপত্র হাজির করেছেন তাদেরকে উপলব্ধির প্রচেষ্টা ছিল। সেই তরুণরা যতবারই নিজেদের জমায়েতকে অরাজনৈতিক বলুন না কেন, তারা বড়জোর রাজনৈতিক দলের মাতব্বরিকে প্রত্যাখ্যানের কথাই বলেছিলেন বলে আমি বুঝেছি। আরও ছিল বাংলাদেশে নানান আলাপ-বিতর্ক গড়ে না উঠবার যে পরিবেশ সেই পরিবেশ বদলের একটা সুস্পষ্ট ইশারা। অধিকন্তু ছিল মুক্তিযুদ্ধটির গুরুত্ব বিভিন্ন পাবলিক পরিসরে যেভাবে হয় সঙ্কুচিত নয়তো কুক্ষিগত করবার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, তার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের কিছু অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ। সেসব উপলব্ধির জের হিসেবে মেরুকরণটির গুরুত্ব এখনও আমার কাছে একইরকম। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যে বাস্তব জনজীবনে পরিস্থিতিটা ভীষণরকম বদলেছে।
এত ভয়ানক খুনোখুনির পরিস্থিতির মধ্যে শেষ কবে বাংলাদেশ পড়েছিল সেটা স্মরণ করা সমূহ কঠিন। আবার দুইটি সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে তুলনা করা বেহুদা, রাজনৈতিকভাবে ন্যায়সঙ্গতও নয় হয়তো। যেসব ‘সংখ্যালঘু’ রামুতে কিংবা অন্যান্য সময় হামলার মুখোমুখি হয়েছিলেন তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত ভয়ানক পরিস্থিতি কোনটা সেই পর্যালোচনাতে অংশ নেয়া বাহুল্য। যেসব পুলিশ আগুন, হাতবোমা, লাঠি কিংবা চাপাতির আঘাত থেকে কোনোমতে প্রাণে বেঁচে এসেছেন তাদের জন্য এর থেকে বিভীষিকাময় দিন আর কোনোটি ছিল না কোনোদিন। আর যেসব মানুষ পুলিশের গুলিতে মারা পড়েছেন তাদের আর কোনো তুলনার দুনিয়াতে থাকারই উপায় নেই। যে কারণেই হোক তারা পুলিশকে প্রতিরোধের দুরূহ প্রত্যয় নিয়ে নেমেছিলেন। আর পথচারী যারা মারা গেছেন ও যাচ্ছেন তাদের হতভাগ্যতার সীমা নেই। সহিংসতার মধ্যকার তুলনা আসলেই নিরর্থক। কিন্তু ভৌগোলিক বিচারেও সারাদেশে সর্বাত্মকভাবে যে খুনোখুনি-হিংস্রতা ছড়িয়ে পড়েছে গত কয়েকদিনে তা অভূতপূর্ব। আমি ভেবেছিলাম কিছু পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলের কিছু তথ্যোল্লেখ করে কথা বলব। কিন্তু সহিংসতা এতটাই পরিব্যাপ্ত যে, আলাদা করে কোনো ঘটনাসূত্র উদ্ধৃত করা নিরর্থক। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সময় যেভাবে ইলেকট্রনিক মিডিয়া আপডেট দিতে থাকে, যেন সেরকম নিয়মিত হিংস্র ঘটনাবলীর আপডেট চলছে। তখনো যেরকম কোনো একটা নতুন খবর কারো মনে উত্তেজনা আর কারো মনে হতাশা তৈরি করে, এখনো পরিস্থিতিটা প্রায় সেরকম পর্যায়ের। মনুষ্যজীবন আর মনুষ্যহিংস্রতার এই ক্রীড়াসুলভ সংবাদভোগ ভীষণ এক অশান্তি তৈরি করেছে। বাস্তবে প্রায় সারাদিন আমি এসব সংবাদভোগ বন্ধ করে রেখেছি। স্বস্তির একটা ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়া আমার এই কাজ যে আর কিছু নয় সেটা সম্বন্ধেও আমি সম্যক সজাগ আছি। মিডিয়াভোক্তা হিসেবে, বাংলাদেশের একজন বাসিন্দা হিসেবে কেবল একটা পক্ষ নিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাচ্ছে না। মিডিয়াভোগ সেই পরিস্থিতিতে আমাকে নিয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায়।
যে কোনো রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মেরুকরণ ভয়াবহ হিংস্র পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সংস্কৃতি আর রাজনীতির সম্পর্ক এত নিবিড় যে, এ দুইটিকে দুই বাক্সে ভাবা কিছু সরলীকরণ তৈরি করবার আশঙ্কা রাখে। এই আশঙ্কা সত্ত্বেও বলছি, সাংস্কৃতিক মেরুকরণের সম্ভাব্য হিংস্রতা বাংলাদেশে বেশি। বরাবরই তাই। আর সাম্প্রতিক সহিংস পরিস্থিতি মোটাদাগে যাকে রাজনৈতিক সংঘাত বলা হয়ে থাকে (দুইটি বিবদমান নির্বাচনী রাজনৈতিক দল বা মোর্চার সমর্থকদের মধ্যকার) তার থেকে অনেক পরিব্যপ্ত বলে বিবেচনা করি আমি। সেই অর্থে সাংস্কৃতিকই বটে। অনেক জটিল এই প্রতিপক্ষতা। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে দায় সারা যেতে পারে। তাতে একটুও কার্যকরী উপলব্ধি হয় না এই পরিস্থিতিটার। যখন মেরুকরণটির বিষয়ে একটা সন্তোষ প্রকাশ করি তখনও অনুমান করতে পারছিলাম যে, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারের রায় প্রকাশ পাবার পরেই সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বাস্তবে হলোও তাই। কিন্তু অনুমান এত নির্ভুলভাবে ফলে গেছে দেখেই কোনো আনন্দলাভ করা যাচ্ছে না। এরকম সহিংস পরিস্থিতি কেবল নির্বিচার পক্ষ নিয়ে যুদ্ধবিজয়ের জন্য নামলেই ধারণ করা সম্ভব। কিন্তু রেটরিকে যতই যুদ্ধ-যুদ্ধ করা হোক না কেন যুদ্ধে আমরা নামিনি। আমরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাস করছি। যুদ্ধ হতে হয় একটা নিশ্চিত ঘোষণার মধ্য দিয়ে, নিশ্চিত প্রতিপক্ষের সঙ্গে। যারা যুদ্ধাপরাধের ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখছিলেন তারা কি একটা যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন? একটা বিচার পাবার জন্য যুদ্ধপ্রস্তুতি থাকার দরকার পড়তে পারে এমন কোনো সম্ভাবনার কথাও কি কেউ জানিয়েছিল? দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ? সরকার? সরকার কি হিসেবের মধ্যে রেখেছিল এসব পরিণতি? দেশবাসীকে সর্তক করেছিল? যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চান তাদের? কিংবা যারা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে শাস্তি পেতে দেখতে চান না তাদের? সেই সতর্কীকরণ কি কেবল জনসভা করে হম্বিতম্বি করবার বিষয়, নাকি রাষ্ট্রীয় দফতরগুলোকে পোক্তভাবে দায়িত্বানুগ করবার বিষয়? পরিস্থিতিটা তৈরি হবার আগেই প্রশমনের উদ্যোগ নেবার বিষয়? সরকার কি বুঝেছিল যে, রাজনৈতিক অভিব্যক্তি কিংবা সংহতি কোনোদিক থেকেই বিএনপি মোকাবিলা আর জামায়াত মোকাবিলা এক কথা নয়? সরকার কি জামায়াতের তাকত সম্বন্ধে আদৌ কোনো স্পষ্ট ধারণা নিয়ে কাজ করছিল? তাদের সাংগঠনিক, রাজনৈতিক, ‘সামরিক’, কৌশলগত এবং মতাদর্শিক শক্তি সম্বন্ধে পরিষ্কার কোনো হোমওয়ার্ক কি সরকারের ছিল? যদি থেকে থাকে সে বিষয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিকারী মানুষজনকে সেসব মেলে-মেলে না দেখানো রীতিমতো অন্যায়। আর যদি না থেকে থাকে তাহলে অসহনীয় অদক্ষতা সেটা। সরকার কি আদৌ বোঝে যে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ করতে যেসব মানুষজন নামছেন তারা আওয়ামী লীগ বা বিএনপি’র মাঠে নামা মানুষের মতো বান্দা ভোটার কেবল নন, এর থেকে ঢের শক্তিশালী বন্ধন অনুভব করা মানুষজন?
শুক্রবারে প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে সাধারণ মিডিয়াভোগী শিক্ষিত মানুষজনের মধ্যে অন্তত প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে পড়েছিলেন তিনি এবং বিএনপি। যারা আশা করছিলেন তিনি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের তত্পরতা বিষয়ে একটা প্রতিপক্ষ অবস্থান নেবেন তারা খালেদা জিয়া আর বিএনপি নিয়ে হতাশ হতে শুরু করেছেন। হতাশা কাটিয়ে বড়জোর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করার রাস্তা নেয়া ছাড়া বিশেষ কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারেননি। কিংবা আরও পরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতামূলক আলাপ-আলোচনা এবং প্রচারণা। যারা কর্তব্য নির্ধারণ করে উঠতে পারছিলেন না, খালেদা জিয়ার ও বিএনপি’র আনুষ্ঠানিক অবস্থান ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তারা আগেরদিন বৃহস্পতিবার মীর্জা ফখরুল সাহেবের বক্তৃতা থেকেই একটা প্রস্তুতি নিতে পারছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষণা সেই প্রস্তুতিকে নিশ্চয়তা দিয়েছে মাত্র। যেসব মানুষ বিএনপি’র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থেকে নিজেদের অবস্থান বা কর্তব্য সাব্যস্ত করতে চেয়েছিলেন তাদের আসলে চূড়ান্ত বিচারে হতাশার বিশেষ পরিস্থিতি নেই। এদের মধ্যে অনেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে রীতিমতো সিরিয়াস, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে থাকতেও বিশেষ উত্সাহী নন, কিংবা এমনকি দূরপাল্লার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামকে একটা শক্তি হিসেবে দেখতেও বিশেষ আগ্রহী নন। কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কিংবা রাজনৈতিক অনুসারী হিসেবে তাদের লয়্যালটি পোক্ত। অন্য কোনো দলের সঙ্গে তুলনা করে এটা বলছি না, অন্তত এই মুহূর্তে তার প্রয়োজন নেই। ফলে তাদের জন্য নেত্রীর ঘোষণাটির নানাবিধ অর্থ উপলব্ধির কোনো প্রয়োজন নেই। বিএনপি বহুদিন ধরে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে আসছে। নিজেদের শাসনকালীন অবস্থা যাই হোক, বিএনপি’র এসব সমালোচনার বড় অংশই প্রাসঙ্গিক। ফলে বিএনপি’র অনুসারী, কর্মী কিংবা এর প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষজনের জন্য সরকারকে প্রতিরোধ করবার অপেক্ষাকৃত পুরোনো ডাক ও কর্মসূচিতে মনোনিবেশের কাজটি আবার সামনে চলে এসেছে। গত দুই সপ্তাহের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, আগুপিছু মনোভাব, দোটানা আর শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে নানারকম বেফাস কথাবার্তার স্রোতের মধ্যে এই অবস্থানটি তাদের জন্য অর্থবহ এবং উদ্দেশ্যমণ্ডিত।
তবে যারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা বিষয়ে শক্ত একটা প্রতিপক্ষতার অবস্থান নেবেন তাদের শিশুসুলভতায় মায়া জন্মাতে পারে বড়জোর। ঠিক কোন কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে তারা আশা করেছিলেন তা তারাই জানেন। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গতি-প্রকৃতিতে, নিজ পক্ষে ভোট নেবার কৌশলের অবধারিত খেলায় খালেদা জিয়া ঠিক তাই-ই করেছেন, যা বিএনপি’র নেত্রী হিসেবে তার করবার কথা। জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিষয়ে অবস্থান নেবার সঙ্কটটি তার জন্য নতুন কিছু নয়। বিশেষত এরশাদ পতনের পর বিএনপি যখন প্রথম দফায় নির্বাচিত সরকার গঠন করে তখন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ধারাবাহিক টানাপড়েন চলছিল। সেই টানাপড়েনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের বহু ছাত্রনেতা চেয়েছিলেন যাতে দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ জামায়াত সংসর্গ এড়িয়ে চলেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত মানুষের ভাবনাভঙ্গির কারণেই বিএনপি’র পক্ষে কখনো সেটা সহজ ছিল না। এই কথাগুলো আসছে এই কারণে যে, সেসব সময়েই বরং বিএনপি’র পক্ষে অপেক্ষাকৃত সহজ পরিস্থিতি ছিল জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে দূরত্ব রচনা করবার। আজকের এই উত্তুঙ্গ পরিস্থিতিতে সেটা একেবারেই সহজ নয়। আসলে কোনো রাজনৈতিক অপশনই না সেটা বিএনপি’র জন্য। যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইছেন কিংবা যারা শাহবাগে ‘তারুণ্যে’র উন্মেষ দেখবার পর যুদ্ধাপরাধের বিচারের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন, যারা কাদের মোল্লার বিচারে প্রকাশ্য অসন্তোষকে দেশব্যাপী একটা ইতিবাচক বদল হিসেবে দেখছেন তারা বিএনপিকে একটি নৈতিক অবস্থান নেবার চাপ দিচ্ছে বা অন্তত আকাঙ্ক্ষা করছেন যে, জনসমর্থন হিসেব-নিকেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বদলে বিএনপি একটি নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করুক। রাজনীতি কোনোদিনই নৈতিকতার ধ্বজা দিয়ে চালিত হয়নি। সেটা কাঙ্ক্ষিত কিনা তা একদম স্বতন্ত্র প্রশ্ন।
আশঙ্কার বিষয় হলো খুব দ্রুত মানুষজন পক্ষ নিয়ে ফেলছেন এই মুহূর্তে। সেটা কেবল রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন নয়। পুলিশ মানুষ মেরে ঠিক করল নাকি জামায়াত হামলা করে ঠিক করল তর্ক হচ্ছে সেটা নিয়ে। কে আগে কোনটা করল তর্ক হচ্ছে সেটা নিয়ে। এভাবে পাবলিক আলাপ ও ভাবনা পরিশেষে হিংস্রতার পক্ষই নিচ্ছে কেবল। এটা চরম আতঙ্কজনক পরিস্থিতি জনসমাজের জন্য। প্রশ্ন তুলেছিলাম যে, পুলিশ ও প্রশাসনের বিপক্ষে যেসব মানুষ, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও দাঁড়াচ্ছেন, সেসব মানুষের সম্পৃক্তি যে আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র দলীয় কর্মীদের সম্পৃক্তির থেকে গুণগতভাবে ভিন্ন সেই বিষয়টি সরকার মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছিল কিনা। সরকার কি লক্ষ্য করছে পুলিশের উপর হামলা কিংবা জনসম্পত্তির তছরুপ করবার জন্য একেক অঞ্চলে কি পরিমাণ মানুষ জড়ো হচ্ছে? সরকারের কি হিসেবের মধ্যে ছিল এটা? কেন ছিল না? এখন কি সরকার ঠিকমতো পাঠ করতে পারছে এই জনসমাগমের অর্থ? কেবল গুলি দিয়ে বৃহত্তর জনসমাজের এই সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিকে রোধ করা সম্ভব? বলা হচ্ছে এই জমায়েত প্ররোচনা থেকে হয়েছে। প্ররোচিত হয়ে সাধারণ মানুষজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিপক্ষের লোকজনের প্রতি আগ্রাসী হয়ে উঠলেই কি সেটা কম গুরুত্বের?
বছর বারো আগে একবার রাত্রিকালীন বাসে ফিরছিলাম একটা রাজনৈতিক সভা থেকে। আমার সহযাত্রী ছিলেন একজন বর্ষীয়ান কম্যুনিস্ট নেতা। চট্টগ্রাম ছাড়তেই বাসে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর একটা ওয়াজের লাইভ রেকর্ড চালালেন বাসের ড্রাইভার। বক্তার কণ্ঠস্বর আর পারফরম্যান্স বাদ দিলে তার বিষয়বস্তু ও বিরোধী ভাবনা-চিন্তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার কিছুই আমাকে আরাম দিচ্ছিল না। কিন্তু আমি সেটা বন্ধ করবার উদ্যোগ নিইনি। আমার সহযাত্রী কিছুতেই সেটা চলতে দেবেন না। তার প্রবল আপত্তির মুখে কন্ডাক্টর সেটা বন্ধ করলেন বটে, একটুও খুশি না হয়ে। বাসের অন্য বেশ কিছু যাত্রীও ওয়াজটি চলবার পক্ষে ছিলেন। আমার সহযাত্রীর রাশভারী ভূমিকার মধ্যে তারা বেশিদূর আগালেন না। কিন্তু অসন্তোষের রেশটা অন্ধকার বাসেও টের পাওয়া যাচ্ছিল। ১২ বছর আগে একটা বাসে সাঈদী সাহেবের জনপ্রিয় বক্তৃতা বন্ধ করতে পারা বিশেষ কোনো কৃতিত্ব নয়। এমনকি আমি সাঈদীর বক্তৃতা বন্ধ করবারও পক্ষে নই, তাতে যে ধরনের লিবেরেলই আমাকে মনে হোক না কেন। কিন্তু অবশ্যই কোনো ধরনের বিদ্বেষ ছড়ানো যাবে না তার সুস্পষ্ট নীতিমালা রাষ্ট্রের থাকতে হবে। সেই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকতে হবে। সমাজে বিদ্বেষের বীজ ছড়াতে দিয়ে আচানক হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ দেখে থতমত খাওয়া রাষ্ট্রশাসকসুলভ আচরণ নয়। আজকে যে হিংসায় উন্মত্ত সমাজ-সংস্কৃতি প্রকাশ পেল সেই হিংসার চারাগাছ বিনষ্ট করবার কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি। এই সরকার না। বিগত সরকার না। গত চার বছরেও না। বিগত ৪২ বছরে তো নাই-ই। দীর্ঘকালীন সংস্কৃতির বিনাশগুলো দিয়ে হবে না। এই মুহূর্তের সহিংসতা, আমার আশঙ্কা যে, ভোটবাক্সের হিসেবে কাজে লাগবে, প্রতিহিংসা প্রলম্বনে কাজে লাগবে, অমীমাংসাকে জিইয়ে রাখতে কাজে লাগবে, রাষ্ট্রীয় এজেন্সিসমূহের শক্তি বৃদ্ধিতে কাজে লাগবে, এমনকি নানাবিধ নাহক দেশবিদ্বেষী হস্তক্ষেপের জন্য কাজে লাগবে। ন্যায়বিচারের সাধারণ স্বপ্ন বিকাশের কোনোই কাজে আসবে না। এমনকি ক’দিন আগে যা বাস্তব লক্ষ্য ছিল সেই যুদ্ধাপরাধের ন্যায়বিচার সমেতই বলছি। জনসমাজে প্রতিহিংসা আর রাষ্ট্রিক পরিমণ্ডলে ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা যুগপত্ চলতে পারে না।
লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক