[ রা জ নী তি ]
চলমান সহিংসতা :গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৬
রবিবার (২ মার্চ) থেকে ডাকা জামায়াতের টানা ৪৮ ঘন্টার হরতালের আগের রাতে চট্টগ্রাম শহর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরছিলাম। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, সন্ধ্যার পর থেকেই উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা ও শঙ্কা নেমে এসেছে শহরজুড়ে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। বন্ধ হয়ে গেছে দোকানপাট, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, বহুতল বিপণিবিতান। যানবাহন চলাচল কম। অফিস থেকে ঘরমুখো মানুষ গাড়ীর জন্য ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। কেউ কেউ দ্রুতগতিতে হাঁটছে বাসার উদ্দেশ্যে। মোড়ে মোড়ে পুলিশের সতর্ক অবস্থান। প্রেসক্লাবের সামনে গণজাগরণ মঞ্চে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছে তরুণরা। তাদের নিরাপত্তার জন্য আশেপাশের দু’একটি গলিতে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে চেক করে রাস্তায় উঠতে দেওয়া হচ্ছে পথচারীদের। বাণিজ্যিক রাজধানী পরিণত হয়েছে আতঙ্কের নগরীতে। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর ফাঁসির প্রতিবাদে তথা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার প্রতিরোধ করতে জামায়াত-শিবিরের মারমুখো লড়াই ও পুলিশের ‘কঠোর দমননীতি’র কারণে সৃষ্ট সহিংসতার জের ধরে শুধু চট্টগ্রাম নয়—গোটা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। সাঈদীর রায় ঘোষণার পর দুদিনে ৬ পুুলিশসহ মারা গেছে প্রায় অর্ধশত। দেশের রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাসে এতো বেশিসংখ্যক হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। হতাহতদের মধ্যে আছে পুলিশ, শিশু, বৃদ্ধ, গৃহবধূ, কমবয়সী ছাত্র, নিরীহ পথচারী। দক্ষিণ চট্টগ্রামে র্যাব-পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। যানবাহনে ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে। উপড়ে ফেলা হয়েছে রেললাইন। মহাসড়ক কেটে, গাছ ফেলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। প্রাণহানি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ঘর-বাড়ি ও ধর্মালয়ে হামলা করা হয়েছে। পাল্টপাল্টি হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে। যেসব এলাকায় ১৪৪ ধারা নেই, সেখানেও বিরাজ করছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। সরকারি স্থাপনায় হামলার আশঙ্কায় রাজধানীর প্রবেশপথে পাহারা বাড়ানো হয়েছে। সাঈদীর রায়ের পর জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা এতোটাই মরিয়া ও সহিংস হয়ে উঠেছে যে, পুলিশ-বিজিবির নির্বিচার গুলিও তাদের নিরস্ত করতে পারছে না। রবিবার হরতালের প্রথম দিন সকালে বগুড়ায় সাতজন নিহত হওয়ার পর সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। দেশের এ পরিস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
গত কয়েকদিনের সহিংসতা জনগণের জানমাল, নিরাপত্তা ছাড়াও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে দেশের অর্থনীতিতে। ঘন ঘন হরতাল কর্মসূচি মাঝারি ও ছোট পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রুগ্ন হওয়ার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্পে। আশংকার বিষয় হচ্ছে যে, সময়মতো পণ্য রফতানি করতে না পারলে ক্রয়াদেশ বাতিলের হুমকি দেয়া শুরু করছেন বিদেশি ক্রেতারা, যা এ শিল্পের জন্য একটি অশনিসংকেত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে দ্বিতীয় দফায় মন্দা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্থানীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত সমস্যা, বিদ্যুত্ ও গ্যাস সংকট, শিল্পে উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি পণ্যের মূল্য হ্রাস, সেইসঙ্গে দেশে ডলারের বিনিময়মূল্য হ্রাস, একইসঙ্গে জিএসপি প্রত্যাহারসহ নানা আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে বর্তমানে এমনিতে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। এতসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এ খাতের উদ্যোক্তারা তারপরও নিরন্তর সংগ্রাম করছেন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। এমন সময়ে হরতাল ও সহিসংতা পোশাক খাতকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে। এক হিসেবে দেখা গেছে, আমেরিকা এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের রফতানি বেশ ধীর গতিতে বাড়ছে। ২০১২ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে এ তথ্য দেয়া হয়। বিজিএমইএ’র গবেষণা বিভাগের বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে ২০১২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসে রফতানির পরিমাণ ৬৩ মিলিয়ন ডলার বেড়ে দুই দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অথচ ২০১১-১২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কেবল আমেরিকার বাজারেই বাংলাদেশ দুই দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছিল।
প্রকৃতপক্ষে গত দুই মাসে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, দেশে এখন বল প্রয়োগের রাজনীতি চলছে। জামায়াত-শিবির যেমন আইন-শৃঙ্খলাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সহিংস আন্দোলনে মেতে উঠেছে; তেমনি রাষ্ট্র ও প্রশাসন সংকট নিরসনে শান্তিপূর্ণ পথ এড়িয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে জোরপূর্বক আন্দোলন দমন করতে চাইছে—যা প্রকারান্তরে সহিংসতার বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশের সর্বত্র। ‘বলপ্রয়োগ নীতি’র কারণে সৃষ্ট সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক, উন্নত ও সভ্য সমাজে কল্পনাতীত। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে অসভ্য জাতির যুদ্ধবিগ্রহ কোনো বিপজ্জনক খেলাধুলা অপেক্ষা বেশি খারাপ ছিল না। ব্রিটিশ নিউগিনির ট্রোব্রিয়ান্ড দীপপুঞ্জে যেকোনো বড় সংঘর্ষে যেখানে কয়েক হাজার যোদ্ধা অংশগ্রহণ করতো, সেখানে জন ছয়েকের বেশি মরত না এবং তাতে ডজনখানেক লোকের বেশি আহত হতো না। নিউগিনির পূর্বপ্রান্তে যেখানে নরমাংস ভক্ষণ ও ‘মস্তক শিকার’ প্রচলিত ছিল, সেখানে স্থানীয় লোকেরা রাত্রিকালে আক্রমণ রচনা করত ও বিনা কারণে হত্যা করত এবং নারী ও শিশুরাও রেহাই পেত না। কিন্তু, যখন এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসন্ধান চালানো হয়, তখন বোঝা যায় যে, এটা ছিল এক রকম দুঃসাহসী ও বিপজ্জনক অভিযান। এতে কিন্তু তেমন কোনো ফলও ফলত না, দেখা যেত জনছয়েকের মতো মানুষ মারা গেছে। মারাত্মক তেমন খুনোখুনি হতো না। অথচ আমাদের সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে রবিবার হরতালের প্রথম দিন সকালেই উত্তরাঞ্চলে পুলিশ, নারী-শিশু, মসজিদের ইমামসহ মারা গেছে ১১ জন। সারাদিনে প্রাণ গেছে ২৪ জনের।
সকলের সামনে এটা স্পষ্ট যে, শাহবাগের গণজাগরণ প্রমাণ করেছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির সাথে একাকার হয়ে আছে গোটা জাতি। কিন্তু, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সরকারকে কিছু কঠিন প্রশ্ন আর বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। একই ধরনের অপরাধে আবুল কালাম আযাদের ফাঁসি, কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ক্ষেত্রে আবার ফাঁসি—এ ধরনের রায় কেন? এর পেছনে কি বিচার-প্রক্রিয়ার কোনো ত্রুটি বা দুর্বলতা ছিল, কারো চাপ ছিলো, না-কি রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি কাজ করেছে। অন্যদিকে শুরু থেকেই শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে বিব্রতকর অবস্থায় থাকা বিএনপি কিছুদিন ‘একলা চলো’ নীতিতে থাকলেও অব্যাহত প্রাণহানির ঘটনার পর দলটি এখন কঠোর কর্মসূচির দিকে গেছে। তারাও জামায়াতের পথ অনুসরণ করে পুলিশের সঙ্গে হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে, হরতাল ডেকেছে। পুলিশ ফের মামলা করেছে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ ২৮ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। আবার, যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে গত কয়েকমাস ধরে জামায়াত-শিবিরের অব্যাহত তাণ্ডবলীলায় কেউ কেউ মনে করছেন, তারা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে এখন আবার নিজেদের ওপর থেকে দায় সরাতে জামায়াত নেতারা বলছেন, সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে নেই তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তৃণমূলে যে যার মতো মাঠের কর্মসূচি পরিচালনা করছে বলে দাবি করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। গত ১ মার্চ গণমাধ্যমে জামায়াতের এক নেতা জানান, হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হলে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাবে। অপরদিকে সরকার ও প্রশাসন জামায়াত-শিবিরের এ নৈরাজ্যকে যথাযথভাবে সামাল দিতে পারেনি। প্রথম দিকে জামায়াতকে মিছিল-সমাবেশ করতে না দেওয়া, পরে আবার জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের হামলার মুখে পুলিশের রহস্যজনক শিথিলতা প্রদর্শন—বিষয়গুলো বিজ্ঞতা ও কর্মকুশলতার পরিচয় বহন করে না। বহুদলীয় গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার অধিকার যেকোনো সংগঠনেরই রয়েছে। প্রত্যেকের রয়েছে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়াবহ সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির। এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে যেকোনো সাধারণ ও সচেতন নাগরিক উত্কণ্ঠিত না হয়ে পারে না।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আবেগ, অনুভূতি, দাবি-দাওয়া প্রত্যাশার একটি যোগ হচ্ছে আন্দোলন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আন্দোলন-সংগ্রামে মানুষের আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। সরকার জনগণের আবেগের মূল্য দেবে, কিন্তু তাকে চলতে হয় সাংবিধানিক বিধিবিধান ও আইনের পথে। কোনো রাষ্ট্রের তাঁরাই দক্ষ প্রশাসক ও নীতিনির্ধারক, যাঁরা প্রচলিত আইনকানুন ও জনগণের চাওয়া-পাওয়ার সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেন এবং দ্রুত সমাধান করেন। দেশের স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করেন। মন্ত্রী, নেতাদের ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংযত বক্তব্য প্রত্যাশিত। শিবির দেখামাত্র পুলিশ কমিশনারের গুলির নির্দেশ, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত না থাকার পরও সময় বেধে দিয়ে মন্ত্রীদের জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা, জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করতে গজারির লাঠি নিয়ে শাহবাগের সমাবেশে আসতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের আহবান দূরদর্শিতা ও শুভবুদ্ধির পরিচয় বহন করে না। বিরোধী মত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন করে কিছুকাল ক্ষমতায় থাকা সম্ভব; কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হয় না। অব্যাহত সহিংসতায় দেশের গণতন্ত্র যখন বিপন্ন হওয়ার পথে, রাজনীতিক নেতাদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত ও যথাযথ পদক্ষেপের। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। জাতীয় কনভেনশন ডাকার কথা বলছেন কেউ কেউ। সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি থেকে দেশকে সকলের জন্য নিরাপদ করে তোলার সঠিক কাজটিই সাধারণ মানুষ দেখতে চায়। আন্তর্জাতিক মহল থেকেও সহিংসতার ইস্যুতে বক্তব্য আসতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র প্যাট্রিক ভেনট্রেল, নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামসের বিবৃতির সারকথা হচ্ছে: উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্দেশে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাণ্ডব বন্ধ করতে এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান এবং একইসঙ্গে সহিংসতা চলাকালীন নিজেদের বা অন্যের জীবন রক্ষা করা ছাড়া প্রাণঘাতি পদক্ষেপ নেবার বিষয়ে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনএন ভারতীয় রাজনৈতিক আইএইচএস এক্সক্লুসিভ এনালাইসিস-এর উপপ্রধান রমেন বোসের মতামত তুলে ধরে বলেছে, স্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মহলের এ ধরনের মন্তব্যও আমাদের জন্য ইতিবাচক কোনো কিছুর ইঙ্গিত দেয় না নিশ্চয়ই!
সবশেষে বলতে হয়, নজীরবিহীন সহিংসতা অব্যাহত হলে তা শেষ পর্যন্ত জামায়াতের ‘গৃহযুদ্ধের হুমকি’ বাস্তবায়নের কাজটি বহুলাংশে এগিয়ে নিবে, দেশের পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে; এবং এর পরিণতিতে অগণতান্ত্রিক কোনো শক্তির আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসার পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে অনেকের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অধিকন্তু, সম্প্রতি সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্তে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা ও তিনদিনের সফরে আসা ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হরতালের নিরাপত্তার অজুহাতে দেখা না করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ওয়াশিংটন টাইমসে নিবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র সমালোচনার কারণে অনেকটা নীরব হয়ে যাওয়ার পর বেগম জিয়া হঠাত্ এতোটা সোচ্চার ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করায় ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের গন্ধ পাচ্ছেন কেউ কেউ। প্রভাবশালী কোনো আন্তর্জাতিক লবি থেকে তিনি কোনো ‘সবুজসংকেত’ পেয়েছেন কি-না, তাই এখন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে বিরোধী দলকে দমন করে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে সরকারের টার্গেট হোক, কিংবা অন্যকোনো শক্তির সংকেত বাস্তবায়নের বিরোধী দলের অভিসন্ধি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে জামায়াত-শিবিরের মরণকামড়, যাই হোক না কেন; দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা রক্ষা ও গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার বিষয়টিকেই সকলে অগ্রাধিকার দিবেন—এতটুকু প্রত্যাশা করা কি অত্যুক্তি হবে?
লেখক :সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়