কালজয়ী নেতা হুগো শ্যাভেজ
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৬
লাতিন আমেরিকার সমাজতন্ত্রের প্রতীক ভিক্টর হুগো শ্যাভেজ আর নেই। লাতিন আমেরিকার নিষ্পেষিত মানুষের বুকচেরা ফরিয়াদ থেকে জন্মেছিলেন শ্যাভেজ। তার মৃত্যুসংবাদ ঘোষণার সাথে সাথে হাজার হাজার ভেনিজুয়েলান বুক চাপড়ে কাঁদছেন আর বলছেন, শ্যাভেজ মরেনি, আমরাই শ্যাভেজ, তিনি মরতে পারেন না। দুই বছর ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের কাছে হার মানলেন বিশ্বনন্দিত ও গরিব মানুষের নেতা। তাবত বিশ্বের নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ করছেন তার মৃত্যুতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, “শ্যাভেজের মৃত্যুর এই কঠিন মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার জনসাধারণের পাশে আছে এবং ভেনিজুয়েলার সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে। ভেনিজুয়েলায় যেহেতু নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার গণতন্ত্র রক্ষায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” ১৯৫৪ সালে জন্ম নেয়া শ্যাভেজ সামরিক একাডেমী থেকে ১৯৭৫ সালে গ্রাজুয়েশন করেন। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এই নেতা সাবেক একজন ছত্রীসেনা ছিলেন। ১৯৯৮ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর গত বছর ২০১২ সালে নির্বাচনেও জয়লাভ করেন। কিন্তু শপথ গ্রহণ করতে পারেননি।
প্রায় বিশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে শ্যাভেজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ভেনিজুয়েলার মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে তাঁর চৌদ্দ বছরের শাসনামলে। গরীবদের উপকারের মধ্যেই মূলত ন্যায়বিচার নিহিত, এই মন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন শ্যাভেজ। রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হলো গরিব জনসাধারণ। সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের এই মডেল বিশ্বে অভূতপূর্ব। লেনিনের বিপ্লবী স্পর্ধার সঙ্গে আলেন্দের জনবন্ধুত্ব মিলে গেল। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আদর্শে পার্টিকেন্দ্র ও ক্ষমতাকেন্দ্রকে জনতার জবাবদিহিতার মুখে রাখা হলো। তেল খাত রাষ্ট্রীয়করণ, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মালিকানাধীন অব্যবহূত জমি গরিবদের মধ্যে পুনর্বন্টন ও ব্যাপক সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্যের ব্যাপক হার কমিয়ে আনেন দেশে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভেনিজুয়েলায় দারিদ্র্যের হার ২৮.৫ শতাংশ কমেছে। মাথাপিছু আয় চার হাজার ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ডলারে। দারিদ্র্য বিমোচন ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যে ভর্তুকি, সাক্ষরতা কর্মসূচি, উচ্চশিক্ষায় ভর্তুকি, কর্মসংস্থান, আবাসন খাতে বিশাল পরিবর্তন আনেন শ্যাভেজ। কিউবা থেকে শত শত চিকিত্সক এনে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের চেয়ে বেশি সময় দিতেন বস্তিতে, গ্রামাঞ্চলে। এ এক সত্যিকার তৃণমূল গণতন্ত্র। বিপ্লবী পার্টির চেয়ে জনতাকে বিপ্লবী করে তোলাই ছিল তার প্রধান কর্মসূচি। বস্তির স্বাস্থ্যসেবা, গৃহায়ণ কীভাবে চলবে ইত্যাদি ছিল তার চিন্তার বিষয় । প্রতি সপ্তাহে জনগণের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতেন। সরাসরি মতামত গ্রহণ করতেন এবং উত্তর দিতেন। তিনি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করেন । মাত্র তিন বছরের মধ্যে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এলো। বেকারত্ব বিশ শতাংশ থেকে সাত শতাংশে নেমে এলো। তাঁর তের বছরের শাসনামলে ভেনিজুয়েলা থেকে নিরক্ষরতা বিদায় নিয়েছে, এ এক অভাবনীয় সাফল্য যা আমাদের কাছে শিক্ষণীয়। বাজেটের ৪৩ শতাংশ ব্যয় করেন সামজিক কর্মসূচিতে । তাঁর সময়ে ১০ বছরের মধ্যে নির্মিত হয়েছে ২২টি রাষ্ট্রচালিত বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকদের সংখ্যা ৬৫ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখে উন্নীত করেন। আমরা কি এক্ষেত্রে শ্যাভেজকে অনুসরণ করতে পারি না?
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসতে গঠন করেছেন চতুর্দেশীয় জোট অ্যালবা। ক্যারিবীয় দেশগুলো এবং মেক্সিকোও এর সদস্য হতে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম হতে যাচ্ছে পর্যবেক্ষক সদস্য । সত্তর-আশির দশকে যে লাতিন আমেরিকা মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে, সেই লাতিন আমেরিকার হয়েছে অভাবনীয় পরিবর্তন। সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস আর এর পেছনে শ্যাভেজ ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোর অবদানই বিশ্ব শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে।
তিনি কিউবা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়াসহ ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে বাদ দিয়ে আমেরিকা মহাদেশের বাকি দেশগুলোকে নিয়ে নতুন জোট গঠনের উদ্যোক্তা তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবিরোধী দেশ রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া, গাদ্দাফি শাসিত লিবিয়ার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন শ্যাভেজ। বিশ্বনন্দিত কথাসাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, শ্যাভেজ এক জোরদার কংক্রিট, যিনি তাঁর দেশকে বাঁচাতে পারেন। শক্রর কাছে তিনি বুনো ষাঁড়, অথচ জনগণের সামনে তিনি নাচেন, গান করেন, বেসবল খেলেন, গল্প বলেন বক্তৃতার মধ্যে। ১৯৯২ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটালেন, যদিও সাফল্য আসেনি, তিনি এটিকে ছোট সাফল্য হিসেবে দেখলেন। দুই বছর জেল খাটার পর পথ বদলে ফেললেন, গেলেন জনগণের কাতারে, চে গুয়েভারার মতো বিদ্রোহী পথে গেলেন না। নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করলেন। সিমন দ্যা বলিভার তাঁর নায়ক, গুরু চিলির নিহত নেতা সালভাদর আলেন্দে, ক্যাস্ট্রো তার প্রেরণা। এই তিন আদর্শের সমন্বয়ে গড়া তার বলিভীয় জাতীয় সমাজতন্ত্র। শ্যাভেজের নিজের ভাষায় ‘আলেন্দের মতোই আমরা শান্তিবাদী ও গণতন্ত্রী।’
শ্যাভেজ শুধু ভেনিজুয়েলার নেতা ছিলেন না, নেতা ছিলেন গোটা দুনিয়ার নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের। তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করাই এখন তাঁর উত্তরসূরিদের প্রধান দায়িত্ব।
লেখক : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি