মূল ফিচার
ভালো লাগছে না
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৩, ১৫:২৬
‘মন খারাপ করা বিকেল মানে মেঘ জমেছে, দূরে কোথাও দু-এক পশলা বৃষ্টি হচ্ছে’—কবীর সুমনের গানটির মতো করেই বলছি, আমাদের মন খারাপ মানেই মনটা একরাশ কালো মেঘে ছেঁয়ে যাওয়া, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, অবশ্যই দূরে কোথাও দু-এক পশলা বৃষ্টি হচ্ছে এবং সেই বৃষ্টিতে অবশ্যই আমাদের মনের মেঘগুলো কেটে যাবে। বস্তুত, ‘মন খারাপ’ শব্দ দুটির সাথে আমাদের প্রায়ই সাক্ষাত্ ঘটে, বা নিজের অজান্তেই বলে ফেলি ‘আমার মন খারাপ’, কিন্তু ঠিক কী কারণে মন খারাপ হয়েছে, সেটা নির্ধারণ করা প্রায়ই আমাদের কাছে শক্ত হয়ে পড়ে। মূলত পুরো ব্যাপারটি নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর। তাই মন খারাপের রেশ কাটাতে প্রায়ই আমরা নির্ভরশীল হই, প্রিয় বন্ধুর ফোন বা প্রিয় স্থানে বন্ধুদের সাথে আড্ডা বা হৈচৈয়ের উপর। তাই বলে হুটহাট মন খারাপকে কখনোই ডিপ্রেশন বলা চলে না, মূলত মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং সঙ্গে কয়েকটি বিশেষ লক্ষণ দেখা দিলেই তাকে ডিপ্রেশন বলা চলে।
তিথি। রাজধানীর নামকরা কলেজে পড়েন। এমনিতে তার কোনো সমস্যা নেই, কেবল একটি জায়গায় ছাড়া। প্রায়ই সে নিজেকে ভীষণ অস্তিত্বহীন মনে করেন, মনে করেন তার কোনো অবস্থান নেই। কথায় কথায় রেগে যাচ্ছেন, বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্য বড়দের সঙ্গে অহেতুক দূরত্ব তৈরি করছেন। ভাবছেন, যদি চারপাশের লোকজনকে ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেত। তিথি যেন একুশ শতকের গড়পড়তা টিনএজারদের মনের ছবিটাকেই তুলে ধরেছেন। আঠারো বা উনিশ বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা নিজেদের ইমোশনের এক্সপ্রেশন নিয়ে অনেক সময়ই খুব বিব্রত থাকেন। শৈশব আর কৈশোরের এই ওভারল্যাপিং পিরিয়ডে সামাজিক চাহিদা মনের ওপর চাপ তৈরি করে। অন্যের চাহিদা ও নিজের ভালো লাগার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। নিজের মতামত ঠিক করে প্রকাশ করতে না পারলে অথবা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সেই মতামতের স্বীকৃতি না পেলে রাগ হয়, অভিমান জমে। এক সময় টিনএজার ছেলেটি বা মেয়েটি নিজের সঠিক আইডেন্টিটি সম্পর্কে কনফিউজড হয়ে পড়ে। কিন্তু রাগ, অভিমান, আবেগ, ভালোবাসাকে ঠিকমতো ব্যালান্স করতে পারলে, সোজা কথায় নিজের ইমোশনকে কন্ট্রোলে রাখতে পারলে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে স্বাভাবিকভাবে পথচলা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
আসুন প্রথমেই মন খারাপ ও ডিপ্রেশনের মধ্যে রকমভেদগুলো জানা যাক, দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপের সাথে যে কয়েকটি বিশেষ লক্ষণ দেখা দিলে তা ডিপ্রেশনের পর্যায়ে পড়ে, সেই লক্ষণগুলো প্রথমেই জেনে নিই।
++ কোনোভাবেই কোনো কিছুতেই উত্সাহ না পাওয়া।
++ টানা দুই সপ্তাহ মন খারাপ থাকা।
++ নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব।
++ যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা।
++ খুবই সাধারণ বিষয়ে উত্তেজিত হওয়া, চারপাশের জগত্ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
++ ক্ষিদে এবং সেই সাথে ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া।
++ ঘন ঘন মৃত্যু বা আত্মহননের চিন্তা মনে আনা।
++ অ্যানার্জি লেভেল কমে যাওয়া।
সাধারণত ডিপ্রেশন তিন রকমের দেখা যায়—মাইন্ড, মডারেট ও সিভিয়ার। ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলোর উপরেই এর লেভেল স্থির করা হয়।
ডিপ্রেশনের কারণ
++ ডিপ্রেশনের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে জেনেটিক কারণ। জেনেটিক কারণগুলো প্রধানত দুই ধরনের হয়, ক্রোমোজোমের গঠনের কারণে ও পলিজেনিক ইন জেরিটেন্সের কারণে। উল্লিখিত কারণগুলোর জন্য ডিপ্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু নিশ্চিতভাবে হবে—এমন নয়।
++ শারীরিক ও মানসিক গঠনের মধ্যে ডিপ্রেসড হওয়ার প্রবণতা শুরু থেকেই থাকে। তবে, উপযুক্ত সময়ে স্ট্রেস বা চাপের মুখোমুখি হয়ে সেই প্রবণতা থেকেই বেরিয়ে আসা সম্ভব।
++ সাধারণত যমজদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ক্রোমোজোমের গঠনের কারণে ডিপ্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
++ সেরেটনিন ও নরঅ্যাড্রিনালিন নিউরোট্রান্সমিটারে ভারসাম্যের অভাব দেখা দিলে ডিপ্রেশনের সম্ভাবনা থাকে।
++ ছোটবেলায় যৌন হয়রানি, ভয়ের ঘটনার মুখোমুখি হওয়া, প্রতারণা, মা-বাবার মৃত্যু—এ রকম স্ট্রেসের মতো পরিস্থিতি ডিপ্রেশনের কারণ হতে পারে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে
মূলত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যেকোনোটির মধ্যে ‘মাত্রাতিরিক্ত’ প্রবণতা থাকলে ডিপ্রেশন আরও বেড়ে যায়। যেমনটি হচ্ছে—
পারফেকশনিজম :পারফেকশনিস্ট হওয়া ভালো। কিন্তু এই প্রবণতা যখন অতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখনই মুশকিল। অতি তুচ্ছ সাধারণ কাজও যখন অতি নিখুঁতভাবে করার প্রবণতা থাকে, তখনই অস্থিরতা কাজ করে।
অস্থিরতা :কোনো কাজ সম্পূর্ণ করার পর মনে হওয়া, ঠিক করলাম কি না, বা আরও একটু ভালো হতে পারত ইত্যাদি ডিপ্রেশনের সম্ভাবনা বাড়ায়।
খারাপ দিক চিন্তা করা :সবকিছুর খারাপ দিকটি চিন্তা করার প্রবণতা।
প্রতিকারের উপায়
চিকিত্সা :সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া দরকার।
পারিবারিক সহযোগিতা :পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের থেকে মানসিক সহযোগিতা পাওয়া একান্ত প্রয়োজন। মানসিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রিয়জনদের আশ্বাস একান্ত প্রয়োজন, মূলত ভালো দিকগুলো প্রথমেই পরিবারের লোকজনরাই ভালোভাবে ধরিয়ে দিতে পারে।
থেরাপি ও কাউন্সিলিং :ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠার জন্য গঠনমূলক আলোচনা একান্ত প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ডাক্তার ও পরিবারের সবার সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। ডিপ্রেশনের রোগীরা সাধারণত নেগেটিভ চিন্তাটা বেশি করে, তাই থেরাপি সব সময় পজেটিভ চিন্তা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ইন্টারপারসোনাল থেরাপিতে ইমোশনাল সমস্যাগুলো তুলে ধরে। সাইকোডাইনামিক থেরাপিতে ছোটবেলার কোনো সমস্যা থেকে ডিপ্রেশন হলে তার চিকিত্সা করা হয়।
পজিটিভ চিন্তাভাবনা করা :নিজের উপর অকারণে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না, অন্যকে দিয়ে নিজেকে চিন্তা করা যাবে না। সবক্ষেত্রে পজিটিভ চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নিজের প্রতি রাগ করবেন না :অ্যাঙ্গার বা রাগ। ভয়ের মতো এটিও মনের নেগেটিভ অনুভূতি। আপনার হাজারটা গুণ থাকতে পারে, কিন্তু যদি রাগকে বশে রাখতে না পারেন, তবে লাভের ঘরে শূন্যই থেকে যাবে। এমন হতেই পারে, কোনো ঘটনায় বা কারও ব্যবহারে আপনি মেজাজ হারিয়ে ফেলেছেন। এবং সে জন্য প্রায়ই নিজেকে দোষারোপ করছেন। সেক্ষেত্রে কয়েকটা ধাপ বা স্টেপ অনুসরণ করলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন।
++ কারও কথা পছন্দ না হলে পজেটিভ বা নেগেটিভ কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাবেন না। প্রয়োজনে ওই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও সরে যান।
++ যে পরিস্থিতিতে পড়লে আপনি নিজেকে দোষী মনে করেন, তেমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন।
++ মনের রাখবেন, রাগ দেখিয়ে নিজেকে ভয় দেখানো যায়, দুঃখ দেওয়া যায়, কাজও আদায় করা যায়। কিন্তু ভালোবাসা বা আনন্দের অনুভূতি জাগানো যায় না।
++ অনেকেই আছেন যারা তাদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে মনে করেন। কিন্তু আসলে তা ১০০% স্বাভাবিক নয়। কম বয়সী লোকেরা বলে থাকেন যে, প্রচণ্ড ব্যস্ততা, ভালোবাসা, কাজ-কর্ম প্রভৃতির কারণে তাদের অস্তিত্ব কমে যাচ্ছে। তবে তারা সাধারণত মনে করেন না যে তাদের নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাওয়ার রোগ আছে। কিন্তু একই অবস্থা যদি কোনো বৃদ্ধ লোকদের হয় তবে তারা মনে করেন যে তাদের অস্তিত্ব প্রায় নষ্টের পথে। এমনকি যদি এমনটা নাও হয় তবু তারা তাই ভাবেন। এর জন্য নিজেকে আরও বেশি জানুন, নিজেকে বিশ্বাস করতে শিখুন। নিজের ভাবধারা অন্যের সাথে শেয়ার করুন, কম্পিটিশন করুন। দেখবেন স্বাভাবিকভাবেই আপনি বুঝতে পারছেন আপনি আছেন।
মডেল শুভ্রা