বাংলাদেশের রাজনৈতিক রোগ নির্ণয়, চিকিত্সা এবং আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৪
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেউ কেউ বলছে গৃহযুদ্ধ, কেউ বলছে মুক্তিযুদ্ধ। আসলে এটি হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধ (cold war) । ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর রাজনীতির মূল ইতিহাস হচ্ছে ১ম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), ২য় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫), স্নায়ুযুদ্ধ (১৯৪৮-৬৫), Detente (১৯৬৫-১৯৮৯) এবং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি।
১ম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) জার্মানী, ফ্রান্স, ব্রিটেনের উপনিবেশবাদ সংক্রান্ত কর্তৃত্বের কারণে সংঘটিত হয়। ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া, ইটালী শক্তিশালী জার্মানীকে হারিয়ে দেয়। যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা হলো ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানীর নিকট থেকে ১৫ বছরব্যাপী ক্ষতিপূরণ আদায়, জার্মানীর সামরিক ক্ষমতা হ্রাস এবং বিদেশী ভূমির দখলদারিত্ব বাদ ইত্যাদি। ফলে ইটালী ইউরোপের অধিকাংশ ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব পায় এবং ফ্রান্স রাইন নদী দখল করে। ১৯৩৬-৩৯ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মুখোমুখি হলে জার্মানীরা রাশিয়াকে হারিয়ে স্পেনে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে জার্মানীর ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানীর সম্মানহানির প্রতিশোধ নিতে ফ্রান্সের নিকট হতে রাইন নদী দখল করে নেয় এবং আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে।
২য় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) মূলত জার্মানী, ইটালী, জাপান কর্তৃক ফ্রান্স ও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধে জার্মানী একদিকে তার উপনিবেশবাদ পুনঃস্থাপন, ভার্সাই চুক্তির বিরোধিতা করা, অন্যদিকে একই সময় ইহুদী ও সমাজতন্ত্রের হোতাদের ফ্যাসিবাদতত্ত্বের আওতায় শাস্তি ও হত্যার মধ্য দিয়ে আমেরিকা ও রাশিয়ার বিরোধিতার শিকার হয়ে যুদ্ধে পরাজয়বরণ করে। ঐ সময় জার্মানী ও জাপান কর্তৃক রাশিয়াতে এবং আমেরিকার পার্ল হারবারে আক্রমণ করা হয়। তখন আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এবং যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধে জার্মানীর পরাজয় এবং ফ্রান্স ও ব্রিটেন সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীর কর্তৃত্ব চলে আসে আমেরিকা ও রাশিয়ার হাতে। আমেরিকা ও রাশিয়া যথাক্রমে পশ্চিম জার্মানী ও পূর্ব জার্মানী গ্রাস করে নেয়। পশ্চিম জার্মানীতে আমেরিকা পুঁজিবাদ (capitalism) এবং পূর্ব জার্মানীতে রাশিয়া সমাজতন্ত্র (socialism) প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলে শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ। বার্লিন প্রাচীর দিয়ে দুই রাষ্ট্র নীতিতে ১৯৪৯-এ জার্মানী ভাগ হয়। একই কারণে ভাগ হয় দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া এবং পৃথিবীর প্রতিটি দেশে স্নায়ুযুদ্ধের হাওয়া বইতে থাকে। পরবর্তীতে রাশিয়ার সরকার প্রধান মিখাইল গর্ভাচেভ কর্তৃক Perestroyka & glasnost-এর মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে সংস্কারের এক পর্যায়ে সমাজতন্ত্রের অনেকটা পতনের মধ্য দিয়ে আমেরিকা পৃথিবীতে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী অবস্থায় আমেরিকা এবং রাশিয়া যে নতুন নীতি প্রণয়ন করে তা হলো Detente (১৯৬৫-৮৯) অর্থাত্ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। আসলে এটি হচ্ছে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতিযোগিতামূলক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
বাংলাদেশে ইসলামী সংগঠনগুলোকে মৌলবাদী বলা হয়। বিএনপি নীতিগতভাবে মধ্যম পুঁজিবাদে বিশ্বাসী হওয়ায় জামায়াত- শিবিরের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলেও মৌলবাদী/চরমপন্থি নয় বিধায় বাংলাদেশে একটি বৃহত্ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টিদের মৌলবাদী বলা হয়। আওয়ামী লীগ মধ্যম সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হওয়ায় বাম দলগুলোর সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলেও চরমপন্থি নয় বিধায় বাংলাদেশে একটি বৃহত্ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। মধ্যপন্থি হিসাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মূল দল, যা বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান মাইলফলক। বাম দল ও জামায়াত-শিবিরের পুনঃউত্থান এটিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তবুও আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। কারণ জার্মানীর মতো crazy জাতি হয়ে ফ্যাসিবাদে বিশ্বাসী হয়ে সবাইকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইলে এক সময় প্রতিভাবান জার্মানীর মতো যুদ্ধে হেরে যেতে হবে।
আমেরিকা “Policy of Isolation”-এর মাধ্যমে ১ম বিশ্বযুদ্ধে এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে নিরপেক্ষ থেকে অর্থনৈতিকভাবে অনেক সাফল্য অর্জন করে। আমরা যারা দেশকে ভালোবাসি তারা বাংলাদেশের এই স্নায়ুযুদ্ধের কোন পক্ষকে সমর্থন না করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারি। অথবা অনতিবিলম্বে দুই পক্ষকে এই ধ্বংসের/হত্যার রাজনীতি বন্ধের জন্য বল প্রয়োগ করতে পারি। আমাদের দেশে অর্থনৈতিক মন্দা হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এটি অন্য দেশের সাথে তুলনা করার মতো নয়। কারণ এদেশের ১৬ কোটি মানুষ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়লে সহসাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে। তাই সমস্ত রাজনৈতিক কলহ ভুলে জাপানের মতো Import Substitute পণ্য তৈরির মাধ্যমে অথবা প্রচুর দেশীয় পণ্য রফতানির মাধ্যমে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে দেশের উন্নয়নে মননিবেশ করতে পারি। চীন, ভারতের সাথে আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি তারই প্রমাণ। আমরা আর একটি সেকেন্ডও অনুত্পাদনশীল রাজনীতিতে সময় নষ্ট করতে চাই না। উত্পাদনশীল রাজনীতিই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ শুনলে এখনও গা শিউরে উঠে। চমত্কার নেতা ছিলেন। বাংলাদেশে ১৯৬০-৭০ দশকে পুঁজিবাদী চিন্তা-চেতনার মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ার পরও রাশিয়া ও ভারতের পতাকাতলে/সহায়তায় অর্থাত্ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সহায়তায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশে যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েও কোন সুবিধা করতে পারে নাই। হরতাল দিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমাধান হচ্ছে শিক্ষা—সবাইকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে short term foreign policy, long term foreign policy গ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিবিদ হলে অবশ্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সাংবাদিকতা ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। ড্রাইভার হলে শুধু কুকুর- বিড়াল না চিনে স্থিতিবিদ্যা (statics), গতিবিদ্যা (Dynamics), জ্যামিতি, মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞান থাকতে হবে। সাধারণ মানুষ হলেও পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকতে হবে।
বাংলাদেশে উপরোক্ত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের চিন্তা করতে হলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেই করতে হবে। কোন প্রকার তৃতীয়/চতুর্থ শক্তির আবির্ভাব দেখতে চায় না মানুষ। কারণ তৃতীয়/চতুর্থ শক্তির মধ্যে কেউ চরমপন্থি, কেউবা একনায়ক এবং কেউ কেউ একরোখা বুদ্ধিহীন—এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
লেখক : ফার্মাসিস্ট (গ্রা.) স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ
মিটফোর্ড, ঢাকা।