কলঙ্কমোচনে জনগণকেই আগাইয়া আসিতে হইবে

দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দলমতনির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের মনে গভীর বেদনা ও উদ্বেগের সঞ্চার হইয়াছে। সেই উত্কণ্ঠা ছড়াইয়া পড়িয়াছে বহির্বিশ্বেও। ইতিমধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগী দেশ এই ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে। উদ্বিগ্ন হইবারই কথা। গত কয়েকদিন যাবত্ যেইভাবে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে বোধবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষের পক্ষেই তাহা মানিয়া লওয়া সম্ভব নহে। কোথাও কোথাও এখনও চোরাগোপ্তা হামলা চলিতেছে। বহু সংখ্যালঘু পরিবার সর্বস্বান্ত হইয়া গিয়াছে। মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছে তাহাদের ধর্মীয় অনুভূতি। ক্ষতিগ্রস্তদের বেশিরভাগই সমাজের অতি সাধারণ মানুষ। তাহারা জানেন না তাহাদের কী অপরাধ। প্রতিকারের আশাও সুদূরপরাহত। কারণ সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলি যথারীতি পরস্পরের উপর দায় চাপানোর পুরনো খেলায় অবতীর্ণ হইয়াছে। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, কয়েকদিন অতিবাহিত হইবার পরও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও ক্ষতিগ্রস্তদের দেখিতে যান নাই—এমন দৃষ্টান্তও একেবারে কম নহে। সর্বাপেক্ষা পরিতাপের বিষয় হইল, জনগণের কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা ও সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও এই কলঙ্কের দায়ভার চাপিতেছে তাহাদের উপরই। বাংলাদেশ যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ তাহা কোনো নূতন কথা নহে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয় ও সহনশীল। শত শত বছর ধরিয়া এই জনপদে মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধসহ নানা ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করিয়া আসিতেছে। জায়গাজমি লইয়া ছোটখাট বিরোধ হইয়াছে। কিন্তু তাহারা নিজেরা কখনই গুরুতর কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাতে লিপ্ত হয় নাই। ইহা প্রমাণিত যে, হাতে গোনা যেই উদাহরণগুলি রহিয়াছে তাহার পিছনে ছিল কূট রাজনীতি। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে উচ্চাভিলাষী রাজনীতিকরা বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে উসকাইয়া দিয়াছেন পরিকল্পিতভাবে। অপরাজনীতির সেই ধারা যে আজো অব্যাহত আছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। পাশাপাশি ইহাও অনস্বীকার্য যে, মতলববাজ এই রাজনীতিকরা সাময়িকভাবে সফলকাম হইলেও চূড়ান্ত বিচারে এই দেশের মানুষ কখনোই কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িকতা বা চরমপন্থাকে গ্রহণ করে নাই। বরং অব্যাহত উস্কানি ও প্ররোচনার মুখেও বরাবরই তাহারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পতাকাকে সমুন্নত রাখিয়াছেন। জনগণের সেই উজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে আবারো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হইয়াছে। ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চলিতেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। ইতিমধ্যে অনেক ক্ষতি হইয়া গিয়াছে। সেই ক্ষতি যে সহজে পূরণ হইবে না—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষতিগ্রস্তদের সর্বতোভাবে সহায়তা প্রদান করা এবং তাহাদের পাশে দাঁড়ানো সরকার ও প্রশাসনের অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব। ইতিমধ্যে সেই দায়িত্বের কথা স্মরণও করাইয়া দেওয়া হইয়াছে সংশ্লিষ্ট মহলকে। তবে সরকার কিংবা অন্য কাহারও আশায় বসিয়া থাকিলে চলিবে না। এই কলঙ্কমোচনে জনগণকেই আগাইয়া আসিতে হইবে। গড়িয়া তুলিতে হইবে সম্মিলিত প্রতিরোধ। ব্যর্থ করিয়া দিতে হইবে মতলববাজদের সকল অপচেষ্টা। আশার কথা হইল, কোনো কোনো এলাকায় ইতিমধ্যে সেই কাজ শুরু হইয়া গিয়াছে। দলমতনির্বিশেষে স্থানীয় জনগণই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় ও বাড়িঘর রক্ষায় আগাইয়া আসিয়াছেন। সুফলও পাওয়া গিয়াছে তাত্ক্ষণিকভাবে। অন্যদেরও এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা উচিত।