সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ ও উন্নত শিক্ষাকাঠামো
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৩, ২০:৪৪
সৃজনশীলতার কদর এদেশে বিশেষ হয় না, উত্সাহিতও করা হয় না। জীবনের শুরুতেই পিতা-মাতাগণ সন্তানের সৃজনশীলতার গলা টিপিয়া ধরিয়া পাঠ্যপুস্তকের পাতায় আর গৃহশিক্ষকের হোমওয়ার্কে মনোনিবেশ করিতে বাধ্য করেন। শিক্ষার্থীদের অন্তরে এই ধারণা বদ্ধমূল হইয়া যায় যে, তোতা পাখির মতো মুখস্ত করিয়া ভালো ফলাফল করাটাই মোক্ষ, জীবনে সাফল্য লাভের একমাত্র উপায়। তাহারা পাঠ্যপুস্তকের বাহিরে কিছু পড়িবার, করিবার বা ভাবিবার অভ্যাস গড়িয়া তুলিতে পারে না। এমনকি, চিন্তা করিবার সাহসটুকুও তাহারা হারাইয়া ফেলে। ফলে, মুখস্তবিদ্যার দৌরাত্ম্য বাড়িলেও কমিতে থাকে তাহাদের মেধার সৃজনশীল ব্যবহার। তাহারা হইয়া উঠে সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ও অনুকরণপ্রিয়। যদিও দেশের ভবিষ্যত্ সম্ভাবনা অনুকরণপ্রিয়তায় নহে, নিহিত রহিয়াছে বস্তুত শিশু-কিশোর ও তরুণদের সৃজনশীল কর্মপ্রয়াসের মধ্যেই। তাহাদেরকে সঠিকভাবে স্বপ্ন দেখা এবং সুন্দর আগামীর প্রেরণায় উজ্জীবিত করিতে পারিলে জাতির সোনালি ভবিষ্যত্ বাস্তবায়ন সম্ভব হইবে; তাহাদের হাতে গড়িয়া উঠিবে স্বপ্নের দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো।
এরূপ পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা অন্বেষণ এবং তাহা বিকাশের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায় হইতে তৃণমূল পর্যন্ত সমন্বিত একটি কর্মসূচির মাধ্যমে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণের উদ্যোগ নিয়াছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রথম দেশব্যাপী সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা ২০১৩-এর আয়োজন করা হইয়াছে। সকল উপজেলায় একযোগে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ-কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডের আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬ষ্ঠ হইতে দ্বাদশ শ্রেণীর দশ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করিবে বলিয়া আশা করা হইতেছে। প্রতিযোগিতা হইবে ৪টি বিষয়ে: ভাষা ও সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত ও কম্পিউটার এবং বাংলাদেশ স্টাডিজ। ৬ষ্ঠ-৮ম, ৯ম-১০ম ও একাদশ-দ্বাদশ এ তিন গ্রুপে মোট সাতটি বিভাগ ও ঢাকা বিভাগীয় মহানগরী থেকে নির্বাচিত ৯৬ জন সেরা বিভাগীয় মেধাবী জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিবে। সেখান হইতে নির্বাচন করা হইবে জাতীয় পর্যায়ে ‘বত্সরের সেরা মেধাবী’ ১২ জন। জাতীয়ভাবে বত্সরের সেরা মেধাবী ১২ জনকে সনদসহ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হইবে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রায় সাত হাজার বিজয়ীকে অর্থ ও সনদপত্র প্রদান করা হইবে।
শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হইতে বেশকিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হইয়াছে। ৮৩টি সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ প্রায় ২ হাজার শিক্ষকের পদ সৃষ্টি, সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে দেড় হাজার শিক্ষক নিয়োগ, কয়েকটি বিশেষায়িত এবং প্রফেশনালস বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, ভর্তি এবং ফল প্রকাশে মোবাইল ও অনলাইন পদ্ধতির আরও উন্নতি এবং ১ম শ্রেণীতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য। বিগত চার বত্সর ধরিয়াই বত্সরের শুরুর দিনে দেশের সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর হাতে পাঠপুস্তক পৌঁছাইয়া দিবার সাফল্য এই সরকারের আগে কোনো সরকারই কখনো দেখাইতে পারে নাই। শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটাল বা তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। বর্তমানে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সকল পুস্তকের ডিজিটাল ভার্সান পাওয়া যায়। প্রতিটি স্কুলে একটি করিয়া মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ স্থাপন করা হইতেছে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করিয়া তুলিতে। ইহা ছাড়াও, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রবর্তিত বৃত্তি প্রদান কর্মসূচি নারীশিক্ষাকে আগাইয়া নিতেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে আবারও আশার দেখা মিলিতেছে, শিক্ষাকে আমরা জাতীয় সম্পদ বিনিয়োগের অগ্রাধিকার ক্ষেত্র ভাবিতে শিখিতেছি। আমরা আশা করিব, শিক্ষার উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলির পাশাপাশি সৃজনশীলতা বিকাশে গৃহীত এই প্রতিযোগিতা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হইবে এবং সারাজীবন শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃজনশীলভাবে চিন্তা করিবার ও পদক্ষেপ লইবার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করিবে।