হুগো শ্যাভেজের কৃতকর্মের গুরুত্ব

চলিয়া গেলেন হুগো শ্যাভেজ কিন্তু রাখিয়া গেলেন দরিদ্র সাধারণের কল্যাণসাধন আর নিপীড়িত দুনিয়ার হইয়া সদম্ভে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার অপরূপ এক দৃষ্টান্ত। শ্যাভেজের অনন্য কীর্তি কেবলমাত্র নিজের দেশ ভেনিজুয়েলা নহে সারা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের নিকট আলোকবর্তিকা হইয়া থাকিবে সর্বদাই। ক্যান্সারের সাথে তাঁহাকে বসবাস করিতে হইয়াছে অনেকদিন; শেষাবধি ক্যান্সারের কাছেই হার মানিয়াছেন। কিন্তু তিনি মরিতে চাহেন নাই। নিকটজনেরা জানাইয়াছেন, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তটিতেও বাঁচিয়া থাকিবার প্রবল ইচ্ছা জারি রাখিয়াছিলেন শ্যাভেজ। বাঁচিয়া থাকিবার এই দারুণ আকাঙ্ক্ষা মৃত্যুভয়-কাতরতা উদ্ভূত নহে। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে নিজের মুখেই জানাইয়াছিলেন যে, নিজ-জনগণের জন্য অধিকতর দায়িত্ব পালনের নিমিত্তেই বাঁচিয়া থাকিতে চাহেন তিনি। দ্বাদশ বর্ষব্যাপী শাসনকালে পশ্চাত্পদ ভেনিজুয়েলাকে অচিন্তনীয় উচ্চতায় তুলিয়াছেন শ্যাভেজ। তাঁহার আগমনের পূর্বে তৈলসমৃদ্ধ দেশটি বহুজাতিক কোম্পানিগুলির উন্মুক্ত লুণ্ঠন ক্ষেত্র ছিল। তাঁবেদার সরকারগুলি ভেনিজুয়েলাবাসী নয়, বরং ইহাদের সেবাতেই নিজেদের সঁপিয়া দিত। কিন্তু শ্যাভেজ আসিয়া দাবার ছক উল্টাইয়া দিলেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে নিজেদের হিস্যা ভালোভাবেই বুঝিয়া লইলেন। এই কাজে তাঁহাকে প্রচণ্ড শক্তিক্ষয় করিতে হইয়াছে। শক্তিমান রাষ্ট্রগুলি, শক্তিমান মিডিয়াগুলি তাঁহার পিছু লইয়াছে, তাঁহার চরিত্র হননের যাবতীয় চেষ্টা করিয়াছে। কিন্তু কোন কাজ হয় নাই। জনতার অন্তরে স্থান লইয়া থাকা প্রেসিডেন্ট শ্যাভেজকে পরাভূত করা সম্ভব হয় নাই। শ্যাভেজের লড়াইয়ের সরাসরি ফল পাইয়াছে দরিদ্রসাধারণ। সারা বিশ্ব স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছে যে, শ্যাভেজ আমলে ভেনিজুয়েলার দারিদ্র্য-আক্রান্ত জনসাধারণের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়াছে অদৃষ্টপূর্ব মাত্রাতে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা হইতে শুরু করিয়া এমনকি বিনোদন, অবসরভোগ, আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রেও আসিয়াছে বিপুল পরিবর্তন, যাহা অতীতে কখনো দেখা যায় নাই। এই যে দরিদ্রসাধারণের জীবন বদলাইয়া দিতে পারিবার রাজনীতি ইহাকে বলা হইতেছে ‘শ্যাভেজিমো’, যাহা ইদানীংকালে ছড়াইয়া পড়িতেছে লাতিন আমেরিকা জুড়িয়া। ‘শ্যাভেজিমো’র ‘গড’ দরিদ্র জনগণকে বক্ষে তুলিয়া লইয়া তাহাদের জীবন-যাতনার উপশম করে। পক্ষান্তরে, জর্জ বুশের ন্যায় রাষ্ট্রনায়কদের ‘গড’ সাম্রাজ্যবাদী আস্ফাালন সহকারে পর-রাষ্ট্রের উপরে হামলা চালাইয়া লক্ষ-লক্ষ প্রাণ বিনাশ করে। নিজ দেশের দারিদ্র্যনিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের বাহিরে, এক যুগ ধরিয়া সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর হইবার জন্য হুগো শ্যাভেজ চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবেন। একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন হইতে আমৃত্যু সামরিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্যাভেজ এক মূর্তিমান চ্যালেঞ্জ। সাম্রাজ্যবাদ তাঁহাকে স্বভাবতই অপছন্দ করিয়াছে কিন্তু অগ্রাহ্য করিতে পারে নাই; ক্রমাগত হুমকি দিয়াছে কিন্তু হামলা চালাইবার সাহস করে নাই। তাহারা শ্যাভেজকে ‘অগণতান্ত্রিক’ এক ‘একনায়ক’ হিসাবে চিহ্নিত করিবার যারপরনাই চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু সর্বশেষ নির্বাচনেও আগেরবারের তুলনায় বেশি ভোটে বিজয়ী হইয়া সকল অপপ্রচারের মুখ বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। উল্লেখ্য, শ্যাভেজ সর্বমোট ছয়টি নির্বাচন জিতিয়াছেন এবং এইসব নির্বাচনের কোনটি লইয়াই বিরোধীদের কোন অভিযোগ নাই। শ্যাভেজের মৃত্যুসংবাদে ভেনিজুয়েলাবাসী শোকের সাগরে ভাসিয়াছে। সারা দুনিয়ার অগণিত মুক্তিকামী মানুষ তাঁহার জন্য চোখের জল ফেলিতেছে। এই শোক এই কান্নায় তাহারা শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতেছে একজন নেতাকে, যিনি নিজের দেশের সীমানা ছাড়াইয়া হইয়া উঠিয়াছেন আন্তর্জাতিক। এই নেতা কেবলমাত্র নিজের দেশকেই ভিনদেশি লুটেরাদের হাত হইতে মুক্ত করার লড়াই করেন নাই বরং বিশ্বব্যাপী এই বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারিয়াছেন যে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব, গরিবি হঠানো সম্ভব।