[ আলোকপাত ]
‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি’
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৩, ২০:৪৫
বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি ও কূটনীতির প্রধান সম্পর্কযুক্ত বিষয় হচ্ছে অর্থনীতি। রাজনীতি ও অর্থনীতি এখন জমজ দুই ভাইয়ের মতো। একটির উন্নয়নের সাথে আরেকটির উন্নতি নির্ভরশীল। দেশের অর্থনীতি ভাল থাকলে সুশাসন কায়েম করা সহজ হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দূর হয়। আবার কোন কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে অর্থনীতিরও বারোটা বাজে।
কয়েকদিন আগে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধি দল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সাথে সাক্ষাত্ করেন। তারা অর্থমন্ত্রীকে আইন করে হরতাল বন্ধ ও প্রয়োজনে গণভোট নেওয়ার প্রস্তাব দেন। একই সাথে চলমান সংকট নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের একটি অংশ শুধু ব্যবসা-সংক্রান্ত দাবি-দাওয়া নিয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
এদিকে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে নিজেদের করণীয় ঠিক করতে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতিরাও গত শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে বৈঠকে মিলিত হন। তারা কয়েকদিনের সহিংসতায় পুলিশসহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তির হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও দুঃখ প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ছিলেন সালমান এফ রহমান, আব্দুল আওয়াল মিন্টু, ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন, আকরাম হোসেন, একে আজাদ, আনিসুল হক, মীর নাসির হোসেন ও বর্তমান সভাপতিসহ আরও অনেকে। বলাবাহুল্য, এসব ব্যবসায়ী নেতা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখেন।
গত চার বছরে সরকারের কোন সাফল্য নেই এই কথা আমরা বলি না। প্রতিটি সরকারেরই সাফল্য-ব্যর্থতা থাকে। বিশেষত শিক্ষা, কৃষি, তথ্য-প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও অবকাঠামো প্রভৃতি খাতে এই সরকারের অনেক সাফল্যের দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। কিন্তু দেশ পরিচালনা ও ম্যানেজ বলতে যা বোঝায় তা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। গত চার বছর ধরে এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। অথচ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হল যাতে সাধারণ মানুষ খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারে, স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে ও শান্তিতে ঘুমাতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা। আজ এই পরিবেশ কি বিদ্যমান আছে? যিনি নব্বইয়ের গণআন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতেও রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি নামাতে পরোয়া করেননি, তিনি এখন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে কয়েকবার ভাবছেন। কেননা কোন রাস্তা বা অলিগলি হতে কখন কোন চোরাগুপ্তা হামলা হয়, তা কেউ জানেন না। কখন কে গুম হন, কোন ডোবা-নালায় সেই লাশ পাওয়া যায় তাও কারও জানা নেই। নির্মল সেন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই আপসোস ও দুঃখ নিয়েই মারা গেলেন। আমাদের অবস্থাও তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হল কিংবা একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদের শেষপ্রান্তে বারবার কেনইবা এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী দেশ ও জাতির কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন একান্ত দরকার। বিশ্বনেতারা এখন এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। কয়েকমাস আগে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষায় তিনি অর্থনীতিকেই প্রাধান্য দেন। বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার জেলে নেয়ার কথাও এখন বলা হচ্ছে। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ড অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে রাজনৈতিক বিরোধ অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। ব্যাংককের রাস্তায় রেডশার্ট ও ইয়েলো শার্টের আন্দোলন আর চোখে পড়ছে না। গণতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র ও রাজতন্ত্রপন্থি এই ত্রিশক্তির মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে যেসব এলাকায় মুসলিম বিদ্রোহী রয়েছে, সেখানেও বিদ্রোহীদের সাথে সমঝোতা রক্ষার চেষ্টা চলছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই সমঝোতা ও সহনশীলতার কোন বিকল্প নেই।
২০০৯ সালে আমেরিকায় বিশ্বমন্দার সূত্রপাত হয়। তারপর থেকেই সেখানকার নেতাদের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড় হয়েছে। নির্বাচনে অর্থনৈতিক ইস্যুই প্রাধান্য পায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে জয়লাভের পর এই অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও বেকারত্ব দূর করতে আরও মনোনিবেশ করেছেন। বাজেট কাটছাট করতে ও কৃচ্ছ্রতা সাধনে তিনি এখন কী না করছেন। বিরোধী রিপাবলিকানদের সাথে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেননা এত বড় সংকট আর যাই হোক একা তো সামাল দেয়া যায় না। এজন্য জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজন হয়। সকলের বোঝাপড়া লাগে। এভাবে ওবামা আমেরিকাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন।
বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব ইউরোপেও যে একদিন ভয়াবহ রূপ লাভ করবে তা বুঝতে অনেকের বাকি ছিল না। গত দুই বছর ধরে ইউরো জোনে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে চলেছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা দূর করতে না পারায় সরকার পড়ে যাচ্ছে। নেতা বা কাণ্ডারির রদবদল হচ্ছে। গ্রিসের রাজনীতিতে হুলস্থ্থূল কাণ্ড ঘটে গেছে। ইতালিতে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু কেউ সরকার গঠন করতে পারছে না। আর্থিক অসংগতি থেকে জনবিক্ষোভ এমনকি দাঙ্গারও সূত্রপাত হয়। পর্তুগাল ও স্পেনেও সরকারের পালাবদল ঘটে। এমনকি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানেও ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন হচ্ছে। দুনিয়া জুড়েই এক টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজমান। তবে বাংলাদেশের সাথে ঐসব দেশের প্রার্থক্য হল সেসব দেশে সংকট সমাধানের একটা চেষ্টা ও প্রক্রিয়া আছে। আন্তরিকতা আছে, কোন গুয়ার্তুমি নেই। তারা দেশটাকে যেভাবেই হোক শেষপর্যন্ত ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্দশায় কারও যেন মাথাব্যথা নেই। এককথায় যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। এর শেষ কোথায় তা আমরা জানি না।
একদিকে চালু থাকা শিল্প-কল-কারখানায় ঠিকমত গ্যাস দেয়া হচ্ছে না। গ্যাস আছে, কিন্তু প্রেসার কম। অন্যদিকে এই সরকারের শুরু থেকেই শিল্প-প্রতিষ্ঠানে নতুন করে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ প্রদান বন্ধ রয়েছে। অনেকে বিদেশ থেকে মেশিনপত্র কিনে ও অন্যান্যভাবে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে মাথায় হাত রেখে বসে আছেন। অথচ ব্যাংকে ঋণের মিটার ঘুরছে তো ঘুরছেই। আবাসিক খাতেও নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। ফলে আবাসন শিল্পও একইভাবে মার খাচ্ছে।
একদিকে প্রয়োজনীয় গ্যাস-বিদ্যুত্ নেই, অন্যদিকে নানা নীতিমালা করে শিল্পের প্রাণশক্তি বিনষ্ট করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা ঋণ শ্রেণীকরণ এর নীতিমালাই সর্বনাশ ডেকে এনেছে। ঋণ পরিশোধে ব্যবসায়ীরা আগের চেয়ে কম সময় পাচ্ছেন, যা তাদেরকে আরও চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। গত বছরের ১৪ জুন জারিকৃত এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলারে এসএমএ-এর (স্পেশাল মেনশনড একাউন্ট) ক্ষেত্রে ঋণ প্রদাণের সময়সীমা তিন মাসের বদলে দুই মাস বা ৬০ দিন করা হয়েছে। এটা কোন যুক্তিতে করা হয়েছে তা বোধগম্য নয়। কেননা এলসি করা মালামাল আসতেই ৪৫দিন বা তারও বেশি সময় লাগে। ব্যবসা-বাণিজ্য লাভজনক ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি সুবিধাজনক না হলে এ ধরনের নীতি করা যায় না। ফলে পরিণাম যা হবার তাই হচ্ছে। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আর বিদেশিরা এসব প্রতিষ্ঠান কিনে নেয়ার জন্য ওত পেতে আছে।
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আমাদের শিল্প-কারখানা বন্ধ করে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়ার জন্যই কি এসব নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে? গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলের অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। জ্বালানি সংকট ও দফায় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। আর অর্থমন্ত্রী জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হিসেব নিয়েই ব্যস্ত আছেন। অথচ উন্নয়ন সহযোগীরা বলছেন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।
এদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। গত বছরের হিসেব অনুযায়ী দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ১২ শতাংশ। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি। তাছাড়া শেয়ারবাজার, হলমার্ক ও ডেসটিনিসহ বিভিন্ন হাই হাই কোম্পানির আর্থিক কেলেঙ্কারির কোন সুবিচার হয়নি। ফলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর জনগণের আস্থা কমে গেছে। সেই সাথে ব্যাংকিং খাতেও দেখা দিয়েছে অশনি সংকেত। কোন কোন ব্যাংকও বিদেশিরা কিনে নিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। অর্থনীতিতে এসব দুঃসংবাদের পাশাপাশি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা বা বিষফোড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে হরতালসহ সাম্প্রতিককালের নৈরাজ্য। যারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের অবশ্যই এ সকল সমস্যা দূর করতে হবে। নতুবা পথ আগলে রাখলে চলবে না।
মনে রাখা প্রয়োজন, এই পৃথিবীতে ফেলম্যান বা ব্যর্থ লোককে কেউ সমর্থন করেন না। এমনকি তার প্রভুরাও পাশে এসে দাঁড়ান না। আসল বিপদের সময় ঠিকই কেটে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে সর্বনাশ ও অঘটন ঘটিয়ে দোষ চাপান অন্যের ঘাড়ে। তাই সময় থাকতেই সতর্ক হওয়া জরুরি।
রবীন্দনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’ দেশ পরিচালনার মতো কঠিন কাজে যারা ব্রত থাকেন, তাদের অবশ্যই দূরদর্শিতা থাকা দরকার। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকা দরকার। কিন্তু সেই মনোবল কি এখন সরকারের আছে? পরিশেষে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আবারও রবীন্দ্রনাথের কথায় সুর মেলাই। ‘এ দুর্ভাগা দেশ হতে হে মঙ্গলময়, দূর করে দাও তুমি সর্বতুচ্ছ ভয়’। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এর চেয়ে ভাল প্রার্থনা আর কিছু হতে পারে না।
লেখক : সাংবাদিক