এই সহিংসতা কি চলিতেই থাকিবে

দেশে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া হিংসা, হানাহানি এবং নানাবিধ সহিংস ঘটনায় অনেকগুলি মূল্যবান প্রাণ অকালে ঝরিয়া গিয়াছে। রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও ভয়াবহ সহিংস রূপ ফুটিয়া উঠিতে দেখা যাইতেছে। নারায়ণগঞ্জের একজন অত্যন্ত মেধাবী ও নিরীহ নিষ্পাপ কিশোরকে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ দিতে হইয়াছে। আবার ঢাকায় একজন ব্যবসায়ী যুবককেও দুষ্কৃতদের হাতে প্রায় একইভাবে প্রাণ দিতে হইয়াছে। তাহাছাড়া রাজধানীতে গৃহবধূ হত্যা, একজন প্রসিদ্ধ আইনজীবীর বাসায় পুলিশ পরিচয়ে দুষ্কৃতকারীদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা এবং অনেককে প্রাণনাশের হুমকি-ধমকি প্রদানের মতো ঘটনা চলিতেছে হরহামেশাই। দুষ্কৃতকারীদের ধরিতে যাইয়া গুলিতে পুলিশ কন্সটেবলের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটিয়াছে। সারা দেশের দিকে নজর দিলে প্রায় প্রত্যহই কোন না কোন নৃশংস নির্মম ঘটনার চিত্র পাওয়া যায়। যে কোন মৃত্যুই দুঃখজনক। সুতরাং সাম্প্রতিককালে যেসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়াছে উহাতে আতঙ্কিত না হইয়া পারা যায় কি? আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে, সমাজজীবনও যারপরনাই অস্থির হইয়া উঠিতেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা সংশ্লিষ্ট সকলকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করিয়া তুলিতেছে বৈ কি। অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনা এই সমাজে যদিও নূতন কোন ঘটনা নহে, তথাপি সাম্প্রতিককালে ইহার ব্যাপকতা যে বৃদ্ধি পাইয়াছে উহাতে সন্দেহ কি? সমাজ হইতে পারস্পরিক প্রীতি ও শ্রদ্ধাবোধ কর্পূরের মতো উবিয়া যাইতেছে। সামাজিকভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এহেন দুর্বৃত্তায়ন নাই যাহার কিনা আশ্রয় লইতেছে না তথাকথিত সমাজপতিরা। অসহায় মানুষকে জিম্মি করিয়া নানাবিধ কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দুর্মতি পাইয়া বসিয়াছে কিছু মানুষকে। ফলে অসাধু ও অবৈধ উপায়ে জবর দখলের এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু হইয়াছে দেশে। ইহার যাহারা পৃষ্ঠপোষক তাহারা একবারও ভাবিয়া দেখে না যে, তাহাদের এই জাতীয় দৌরাত্ম্য পর্যায়ক্রমে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করিতে উদ্যত। ইহা যে নূতন করিয়া সৃষ্টি হইয়াছে তাহা কিন্তু নহে। আমরা যদি আমাদের নিকট অতীতের দিকে তাকাই তাহা হইলে একশ্রেণির পেশাজীবী কিংবা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাপ্রয়াসী দুর্বৃত্তের পোয়াবারো অবস্থাই দেখিতে পাইব। একটি সমাজে যদি গণতন্ত্রের চর্চা না থাকে, সহিষ্ণুতা যদি অনুশীলিত হইবার অবকাশ না পায়, আইনের শাসন যদি কায়েম না হয় তাহা হইলে সমাজে হিংসা-হানাহানি রোধ করা যাইবে কি করিয়া! পরমতসহিষ্ণুতার পরিবর্তে এইখানে পরমতের প্রতি অবজ্ঞা ও অসহিষ্ণুতা সৃষ্টিরই প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। নিছক সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ হইতে সবকিছু বিচার- বিশ্লেষণ করিতে গিয়া আমরা আজ নিজেরাই এমন এক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছি যাহা হইতে মুক্তিলাভ বড়ই দুষ্কর হইয়া উঠিয়াছে। আমরা ক্ষমতার বড়াই করিতে শিখিয়াছি; কিন্তু ক্ষমতাকে জনস্বার্থে প্রয়োগ করিতে শিখি নাই। ক্ষমতাকে আমরা দুর্বৃত্তদের লালন-পালনের হাতিয়ার রূপে ব্যবহারপূর্বক বৈষয়িক লোভ-লালসা চরিতার্থ করিতে চাহিয়াছি। আর সেইজন্য এমন কোন দুর্বৃত্তায়ন নাই যাহাকে কিনা আমরা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেই নাই। ইহার নতিজা যে ভাল হইতে পারে না সেই বোধ-বুদ্ধি-চেতনা আজ বহুদিন হইল আমাদের মাঝ হইতে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। নিছক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে এই ধরনের উদ্ভট মানসিকতায় আচ্ছন্ন হইয়া পাড়িয়াছি আমরা। আর তাই এই সমাজকে ইটের বদলে পাটকেল ছুঁড়িবার শিক্ষাই যেন আয়ত্ব করিতে দেখিতে পাওয়া যায়। এই বিশ্বে ‘প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রহিয়াছে’-এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে যাহারা আমলে নেয় না তাহারা হয় বুঁজদিল নয় ধড়িবাজ। তাই তাহারা বুঝিয়া না বুঝিবার ভান করিয়া থাকে এবং সমাজ-সংসারের জন্য ঘোরতর বিপদ ডাকিয়া আনে। বর্তমানে দেশে যাহা ঘটিতেছে প্রথমত উহা নূতন কিছু নহে। বহুকাল ধরিয়াই এই সহিংসতা বিভিন্নরূপে এই সমাজে বিদ্যমান রহিয়াছে। জনস্বার্থকে সামনে রাখিয়া যুক্তি, বিবেক ও বুদ্ধি দ্বারা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার যে সংস্কৃতি উন্নত, সুশিক্ষিত ও পরমতসহিষ্ণু দেশগুলিতে দেখা যায় উহা আমাদের দেশে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। ফলে ঐ হানাহানি অতীতে যেমন ছিল বর্তমানেও তেমনি আছে এবং আগামীতেও যে উহা সোত্সাহে চলিতেই থাকিবে সেই কথা তো বলাই বাহুল্য।