প্রতিভার আলোয়
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৩, ১৫:৪২
‘ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরবো না তার ভ্রুকুটিতে, দাও ছেড়ে দাও ওগো আমি তুফান পেলে বাঁচি, আমি ডুবতে রাজি আছি।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথাটা দারুণ পছন্দ তার। কথাগুলোর মতোই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উের গেছে সে। ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি ছিল অনেক বিষয়ে ঝোঁক। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি সৃজনশীল প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পদার্পণ। শিশু একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত ছবি আঁকা, রচনা প্রতিযোগিতা, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় রয়েছে অসংখ্য পুরস্কার। নানা গুণের এই তরুণ সোহানুর রহমান তাই আমাদের আজকের অন্য তারুণ্যে, তাকে নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
জন্ম শরিয়তপুর জেলায়। বাবা-মায়ের চাকরির সূত্রে শৈশবের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। তবে এরই মাঝে বেশ বড় একটা সময় কেটেছে শরিয়তপুরের ‘জোড়া ভবনে’। সকলের খুব আদরের ছিলেন সোহান। সারাদিন বন্ধুদের সাথে দুরন্তপনা আর পুকুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতারে কেটে যেত সময়। বাসার সামনে একটুকরো জমিতে বাবার সাথে মাঝে মাঝেই নেমে যেতেন ছোট্ট কোদাল হাতে। স্কুলজীবনের সাথে সাথেই শুরু হয়েছিল ছবি আঁকা আর গানের সাথে পথ চলা। এরপর দুটোই চর্চা করতে থাকেন নিজের জন্য, নিজের সুখ-দুঃখের সাথি হিসেবে বেছে নেন এদের।
সোহানের প্রথম স্কুল কিশলয় আদর্শ শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছোটবেলা থেকেই প্রথম সারির ছাত্র ছিলেন তিনি। ক্লাসের প্রথম স্থান বরাবরই থাকত তার দখলে। ৫ম শ্রেণী বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুল বৃত্তিসহ শরিয়তপুর জেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ ছিল সে সময়টা। নিজের মাঝে একটা জেদও ছিল—প্রথম হতে হবে। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষায় ২য় হয়ে গিয়েছিলেন যদিও। তখন বাবা-মায়ের বদলির অর্ডার সবে এসেছে। বাসায় ফিরে সোহান বলেছিলেন, ‘তোমরা অন্তত প্রথম সাময়িক পরীক্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, নিজেকে এখনও অনেক কিছু দেখানোর আছে।’ ৮ম শ্রেণীতেও ট্যালেন্টপুল বৃত্তি। এসএসসি (২০০৭) ও এইচএসসি (২০০৯) ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে সব বিষয়ে ‘এ’ প্লাস পেয়ে জিপিএ ৫.০০। মানবসেবার সবচেয়ে উত্কৃষ্ট পথ বোধহয় ডাক্তারী পেশা। সোহান মানবসেবার এই দীক্ষা নিচ্ছেন ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজে। স্কুল জীবনের মুকুল স্যারের কথা খুব মনে পড়ে তার। তিনি সোহানকে সোহান সাহেব বলে ডাকতেন।
সোহানের অর্জনের গল্প শুনলে রীতিমতো ঈর্ষা করবেন আপনি। পুরস্কারের বই রাখার জন্য নতুন বুক সেলফ বানাতে হয়েছে বাসায়। ছবি আঁকায় রয়েছে জাতীয় পুরস্কার। তবে তার নিজের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি - ভ্রাম্যমান চারুকলা প্রদর্শনীতে তার আঁকা ছবি প্রথম স্থান অর্জন করে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, গান আর বিতর্ক নিয়েই আছেন সোহান। যতদূর মনে পড়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে প্রথম বিতর্ক করেন। সেই থেকে বিতর্কের সাথে পথ চলা। স্কুল বিতর্ক থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন বিতর্কের টানে।
অবসর কাটে রঙতুলি আর গুনগুনিয়ে, কখনও প্রিয় কবিতার বই হাতে। সোহান মনে করেন, সৃষ্টিশীল হতে চাইলে সবার আগে স্বপ্ন দেখতে জানতে হবে, রঙহীন স্বপ্নকে রাঙিয়ে তুলতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘নিজেকে ভিন্নভাবে তৈরি করতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন ইচ্ছা এবং নিজের প্রতি সততা, যা না থাকলে কখনই ভালো মানুষ হওয়া যায় না। আর দরকার অধ্যবসায়।
সোহানের বাবা মো. মোশাররফ হোসেন, সরকারি চাকরিজীবী আর মা কোহিনূর আক্তার, সরকারি চাকরিজীবী। বাবা, মা আর ছোট্ট বোন ইরা নিয়ে তাদের সুখের পরিবার। ছোট বোন এইচএসসি ১ম বর্ষের ছাত্রী।
মা, বাবা, ইরা—এরাই তার একমাত্র জগত্। সোহান সবশেষে বলেন, ‘নিজের জায়গায় থেকে নিজের কাজটুকু সততার সাথে করতে পারাই আমার কাছে দেশপ্রেম। সব সময় চেষ্টা করি তা-ই করার।’ তরুণদের প্রতি বললেন, ‘স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে হবে, স্বপ্নের মাঝে নয়।’