শান্তির রসদ এখন দু’নেত্রীর হাতে

দেশবাসীর শান্তির রসদ এখন দু’নেত্রীর হাতে। তারাই দেশকে সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে পারেন। এজন্য তাদের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। জনগণও তাদের মুখপানে চেয়ে আছেন। জনগণ চায় সমঝোতা। সংঘাত চায় না কেউ। অল্প সময়ের সংঘাতেই দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে। অর্থনীতিতে টান পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে। শিল্প-কারখানা গার্মেন্টস সবক্ষেত্রে মন্দাভাব বিরাজ করছে। এখনই ছোটখাট ব্যবসায়ীরা পথে বসে গেছে। এ অবস্থা আরও ৪/৫ মাস চলতে থাকলে বড় এবং মাঝারি গোছের ব্যবসায়ীরাও পথে বসবে। সমঝোতা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সামনে সংঘাত আরও বাড়বে। এটাও সত্য বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতির ইতিহাস অনেক পুরনো। অতীতেও ছিল এখনও আছে। গত দুই দশক ধরে এই সংঘাতের চিত্র বেশ প্রত্যক্ষ করা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এখন শুধু গণতন্ত্র নয়, অতিসমপ্রতি ধর্ম, সামপ্রদায়িকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা প্রশ্নগুলো এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এ কারণেই বর্তমান রাজনীতি অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতি আমাদের সকলের জন্যই খুব উদ্বেগজনক। দেশবাসী, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা এখন বিপদে নিপতিত। কি রাজনৈতিক, কি অর্থনৈতিক এমন এক পরিস্থিতি অতিক্রম করছেন যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দিচ্ছে। নূতন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বিদ্যমান পরিস্থিতি নূতন বিনিয়োগের অনুকূলে নেই। দেশবাসীও জানমাল ও নিরাপত্তা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে অপহরণ, গুম এবং খুন হওয়ার আতঙ্কে ভুগছে জনগণ। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত পুলিশের হিসাব অনুযায়ী জানা যায়, চলতি ২০১৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে খুন হয়েছে ৬২৭টি। অপহরণ ও নিখোঁজ হয়েছে ১৬৭ জন। আর ডাকাতি হয়েছে ১১৮টি। বলাবাহুল্য, অপরাধের এ হার আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে সরকারও উদ্বিগ্ন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মানুষের জানমাল ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। ঘরে-বাইরে কোথাও এখন আর মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। কে কখন কোথায় দুষ্কৃতচক্রের কবলে পড়ে মালসামান, এমনকি জীবন হারাবে সেটা আন্দাজ করারও উপায় নেই। জনগণ নিরাপত্তাহীনতার শিকার। এ আশংকাও প্রবল যে, আগামীতে তাদের অনিরাপত্তা আরও বাড়তে পারে। এজন্য রাজনৈতিক অস্থিরতাই যে দায়ী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের লাগাতার তাণ্ডব ও বিএনপির একের পর এক কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নিরাপত্তার শঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে সহিংস ঘটনা। একের পর এক গুম আর প্রাণহানি হচ্ছে। এমন সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমাদের রাজনীতির ভবিষ্যত্ কী? আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? আমরা এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে দিন কাটাচ্ছি। যত দিন যাচ্ছে উদ্বেগ তত বাড়ছে। রাজনৈতিকভাবেই সঙ্কট বাড়ানো হচ্ছে। আমি মনে করি, রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য। এই ধরনের সংঘাতের জন্য গণতন্ত্রের যাত্রা যদি ব্যাহত হয় তাহলে সঙ্কট দীর্ঘায়িত হবে। উত্তরণের কথা আমরা বার বার বলেছি। হাজারবার বলেছি। সমঝোতা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সমঝোতা কীভাবে সম্ভব? দু’দল ইচ্ছা করলে যে কোনো সময় যে কোনোভাবে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। তারা যদি ইচ্ছা না করে তাহলে আমরা যতই বলি সমস্যা সমাধান হবে না। সবকিছুই দুই দলের ওপর নির্ভর করছে। দেশজুড়ে যে আতঙ্ক তা দূর করার দায়িত্ব রাজনীতিক ও সরকারের। দেশে শান্তি ও স্বস্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজনীতিকদের ও সরকারকে এ মুহূর্তে আন্তরিক হতে হবে। সবার সমবেত চেষ্টায় দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে বলে আমরা মনে করি। জনগণ সেই শান্তি ও স্বস্তির দিনের অপেক্ষায় আছে। জান-মালের নিরাপত্তা পাওয়া দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার। তাই জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। সরকার সেটা দিতে না পারলে তা হবে সরকারের ব্যর্থতা। সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে আমাদের। আমরা বিশ্বাস করি সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালালে অবশ্যই জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষিত হবে। সরকার যদি বলেন আমাদের বিরোধীদল বিএনপির আর জামায়াত-শিবিরের কারণে জানমাল নষ্ট হচ্ছে তা মেনে নেবে না জনগণ। কার কারণে হচ্ছে জনগণের কাছে সেটা বড় নয়। তাদের জানমাল অনিরাপদ তা রক্ষায় ব্যর্থ হলে সরকারকেই দুষবে তারা। ধরে নিচ্ছি এজন্য বিএনপি জামায়াত-শিবিরই শতভাগ দায়ী। তাই বলে সরকার আরো কঠোর হয়ে দেশকে আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে না। কিছুতেই জনগণের জানমাল নষ্ট করা যাবে না। এজন্য অবশ্যই সরকারকে কৌশলী হতে হবে। জানমাল রক্ষা করে তবেই সরকারকে সকল পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনে রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সে দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে হবে। বিরোধীদলকে কেবল মসনদে যাবার আকাঙ্ক্ষায় একের পর এক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দিলেই চলবে না। তাদেরকেও দেশের কথা ভাবতে হবে; দেশের সার্বিক অর্থনীতির কথা ভাবতে হবে। জনগণের জানমাল নষ্ট করে জনগণের ভোটেই ক্ষমতায় যাওয়া যাবে তা ভাবা কিন্তু গুড়েবালি। তাই সরকার এবং বিরোধীদল উভয়কে বলবো ক্ষমতা কুক্ষিগত করা আর ক্ষমতায় যাওয়ার মোহ ত্যাগ করুন; দেশকে ভালোবাসুন; জনগণের স্বার্থে দেশের স্বার্থে সংঘাত নয়, সমাধানের পথ খুঁজে বের করুন। আর তা করতে ব্যর্থ হলে জনগণের কাছে আপনাদের একদিন এর জবাব দিতেই হবে। লেখক: সাংবাদিক e-mail-newsstore09@gmail.com