প্র জ ন্মে র আ ই ক ন

নানা রঙে রঙিন

শুধুমাত্র নিজের মেধা এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমেই নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন সফলতার শীর্ষে। ছোটবেলায় প্রায় সকলেই জীবনের লক্ষ্য নিয়ে অনেক রচনাই লিখেছেন, সেখান থেকেই হয়তো শুরু হয় জীবনের ছক কষা। কিন্তু তিনি কখনোই নিজেকে এই ছকে ফেলেননি। জীবনকে কখনোই কোনো নির্দিষ্টতায় আটকে ফেলতে চাননি, বরাবরই নিজের ভালোলাগাকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন, কাজের মাঝে নিজের তৃপ্তি খুঁজেছেন। বলছিলাম প্রজন্মের সফলজন স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী, ভিডিও মেকার ও ইভেন্ট প্রডিউসার হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল সম্পর্কে। তার সফলতার পেছনের গল্পগুলোই উঠে এসেছে আমাদের এবারের আয়োজনে। তাকে নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী, ভিডিও মেকার ও ইভেন্ট প্রডিউসার। নব্বইয়ের দশকে তার ‘সেদিনের এক বিকেলে’, ‘আমার আছে অন্ধকার’, ‘একটা মানুষ’, ‘বেশি কিছু নয়’, ‘ফিরতি পথে’ অ্যালবামগুলো দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। ভিডিও মেকার হিসেবে ৩০টির বেশি ডকুমেন্টারি, ক্যামেরাম্যান হিসেবে ৫০টি ডকুমেন্টারি এবং ১৫ হাজার মিনিট টিভি প্রোগ্রাম নির্মাণ করেছেন। ইভেন্ট প্রডিউসার হিসেবে দুবাইয়ে লাক্স-চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ডের উদাহরণই যথেষ্ট। জুয়েল গানের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন ছোটবেলা থেকে। চাচা শহীদ আলতাফ মাহমুদ যিনি একুশের গানের সুরকার হিসেবে সর্বজন পরিচিত, তার অনুপ্রেরণায় সংগীত জগতে প্রবেশ। সাধারণত মেলোডিয়াস রোমান্টিক ধারার গান করে থাকেন জুয়েল। তবে নিজেকে পেশাদার গায়ক হিসেবে কখনোই ভাবেননি। গান করার ক্ষেত্রে নিয়মিত না হওয়ার কারণ হিসেবে অভিমানের বিষয়টি তুলে ধরে জুয়েল জানান, সেই সময়ে বাজারে হিন্দি গানের প্রসার এবং যে ধারায় গান করেছেন সেই ধারার বাইরে এসে প্রযোজকদের চাহিদার গান করাটা তার জন্য সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া অন্য পেশায় জড়িয়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি ব্যস্ততার কারণে গানে আর নিয়মিত হতে পারেননি। এক সময় মিক্সড অ্যালবামগুলোতে অনেক কাজ করেছেন জুয়েল। জনপ্রিয় সব শিল্পীদের সাথে একই অ্যালবামে গান করাটা তার জন্য আনন্দদায়ক ছিল বলে জানান তিনি। বরিশালে জন্ম নেওয়া হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলের বাবা রেজাউল করিম পেশায় ব্যাংকার ছিলেন। প্রাথমিক পড়াশোনা বরিশালেই করেন এবং উচ্চতর ডিগ্রি নেন ঢাকা থেকে। মিডিয়াতে কাজ শুরু করেন ’৮৬ সাল থেকে ভিডিও সেক্টরে। তখন আবার ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তার ডিরেকশনে এ পর্যন্ত ৩০টি ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১৫ হাজার মিনিট টিভি প্রোগ্রাম বানিয়েছেন তিনি। ’৯৩-তে ওয়ার্ল্ভ্র টিভিতে কাজ শুরু করেন। ’৯৯-তে চলে আসেন একুশে টেলিভিশনে, তারপর সেখান থেকে ২০০৪ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত কাজ করেন চ্যানেল আইতে। সে সময় একুশে টিভির জন্য বানিয়েছিলেন ‘বলতে চাই’, আলী যাকেরের উপস্থাপনায় ‘সরাসরি’, ‘মিউজিক ক্যাফে’, ‘হ্যালো বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশের ঢোল’, ‘প্রিয় সাবিনা’ আর ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান তো ছিলই। চ্যানেল আইয়ের জন্য বানিয়েছিলেন ‘সা টু সা’, ‘আমার প্রিয় গান’ এবং বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। এনটিভিতে ‘সুরের জলসা’, ‘আরশীনগর’ এবং এনটিভির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নতুন ‘ঢাকের বাজনা’ তার পরিকল্পনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কাজ করার স্পৃহা এবং কাজ করার বিষয়ে কী করা উচিত? এমন প্রশ্নের উত্তরে হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল বলেন, ‘এই প্রজন্মের কাজ করার স্পৃহা অনেক। তারা কাজের প্রতি যথেষ্ট আগ্রহী কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে অনেকে এই সেক্টরে খুব বেশি সুবিধা করতে পারে না। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহের কোনো কমতি নেই। আর মিডিয়াতে কাজ করতে হলে প্রচুর পড়াশোনার প্রয়োজন আছে। কেননা একজন মিডিয়াকর্মীর বরাবরই সকল বিষয়ে আপডেট থাকা হচ্ছে প্রথম শর্ত। তাই এই প্রজন্মের প্রয়োজন অনেক বেশি পড়াশোনা করা, অনেক বেশি জানা, কারণ এই সেক্টরে এর কোনো বিকল্প নেই। নতুন ধারার এই পেশায় অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই আছেন, যারা অভিজ্ঞতা ছাড়াই ইভেন্ট কোম্পানি খুলে বসেছেন। আমার মতে, আগে কাজ শিখতে হবে তারপর কোম্পানি খুলতে হবে। ইভেন্টের কাজ খুবই ক্রিয়েটিভ কাজ। এ পেশায় নেতৃত্বের গুণাবলি, সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মানসিকতা থাকতে হবে। একটা নতুন ইভেন্ট মানেই নতুন চ্যালেঞ্জ।’ হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল বাংলাদেশের অন্যতম একজন অভিজ্ঞ ইভেন্ট ডিরেক্টর। তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সমান জনপ্রিয়। সারজায় এবং ইউএসএ-তে অনুষ্ঠিত লাক্স-চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ড ২০০৪, ২০০৮ ছাড়াও সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০০৫ এবং ২০০৮, ওয়াশিংটন ডিসি, রোম, মাসকাট এবং সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ নাইট, চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ ২০০৮, ডেইলি স্টার বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড ২০০৫-২০০৮, স্ট্যান্ডার্ড চ্যার্টাড-ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ ২০০৮, মেরিল আদরে গড়া ভবিষ্যত্ ২০০৫-২০০৮ ইত্যাদি প্রোগ্রামের পরিচালনা করেছেন। তিনি একজন সফল সংগীতশিল্পী এবং সংগীত পরিচালক। ’৯০-এ আবৃত্তি শিল্পী শিমুল মুস্তাফা ও বেতার জগতের কচি আহমেদের উদ্যোগে তার প্রথম অ্যালবাম ‘কুয়াশা প্রহর’ বের হয়। এরপর আইয়ুব বাচ্চু তার নিজস্বতা বের করে আনেন। তার গাওয়া ‘সেদিনের এক বিকেলে’, ‘আমার আছে অন্ধকার’, ‘চোখের জল ঢেলে’, ‘এ কোন ব্যথায়’, ‘কোথায় রাখো আমাকে’, ‘সামনে তোমার চাঁদের পাহাড়’, ‘চোখের ভেতর স্বপ্ন থাকে’—গানগুলো এখনো শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। কাজ এবং পরিবার এই দুটি বিষয়ের মাঝে সামঞ্জস্য কীভাবে রাখেন? উত্তরে জুয়েল বলেন, ‘সাধারণত এই সেক্টরে কাজের কোনো নির্দিষ্টতা নেই, তাই পরিবারকে ঠিক সময় দেওয়ার ব্যাপারটি সব সময় হয়ে উঠে না তারপরও আমি চেষ্টা করি দুটি ক্ষেত্রেই সমান দায়িত্ব পালন করতে। আমি বরাবরই সময়-সচেতন মানুষ তাই দুটি বিষয়ে টাইমিং ঠিক রাখা আমার জন্য খুব বেশি সমস্যা হয় না।’ এই বহু গুণে গুণান্বিত মানুষটির ভবিষ্যত্ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই, তার শুধু একটাই আশা যেন স্বাভাবিকভাবে মরতে পারেন, কেননা বর্তমান সময়ে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হওয়াটাও বিশাল বড় ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।