খাদ্য সংরক্ষণে বেসরকারি খাতকেও উত্সাহিত করিতে হইবে

সম্প্রতি খাদ্যমন্ত্রী ‘গুদামের ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় সরকার পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য কিনিতে পারিতেছে না’ বলিয়া জানাইয়াছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারি খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতা ১৫ লক্ষ টন হইতে বাড়াইয়া ১৭ লক্ষ টনে উন্নীত করিয়াছেন বলিয়া খাদ্যমন্ত্রী দাবি করিয়াছেন। সরকারের চলতি মেয়াদে এই ধারণ ক্ষমতা বাড়াইয়া ২০ লক্ষ টনে উন্নীত করিবার পরিকল্পনার কথা তিনি জানাইয়াছেন। খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর এই পদক্ষেপ নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর গত চার দশকে খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতার মোট সংযোজন মোটেই প্রত্যাশিত নয়। আমরা জানি, বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ খাদ্যশস্যের দামের স্থিতিশীলতার উপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশের জীবনযাত্রার মান অনেকাংশে নির্ভরশীল খাদ্যশস্যের দামের স্থিতিশীলতার উপর। আর এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখিবার জন্যে খাদ্যশস্যের সরকারি মজুত অত্যন্ত জরুরি। এই স্থিতিশীলতা ছাড়াও আরেকটা কারণে সরকারি মজুত অতীব জরুরি। তাহা হইল, খাদ্যশস্য উত্পাদনকারী আমাদের কৃষক সমাজের কাছে তাহাদের উত্পাদিত খাদ্যশস্যের সঠিক ও ন্যায্য দাম পৌঁছাইয়া দেওয়া। আর এই সরকারি মজুতের জন্যে দরকার সরকারি গুদামের পর্যাপ্ত ধারণ ক্ষমতা। আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের বিভিন্ন মৌসুমে সরকারকে বাজার হইতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান, চাল কিনিয়া এই সবের দাম তাহাদের উত্পাদন খরচের উপরে রাখিতে হয়। অন্যথায় ধানের মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে বাজারে ধান, চালের দাম অতিমাত্রায় পড়িয়া যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে, এইসব মৌসুমের ঠিক আগেভাগে যখন ধান, চালের সরবরাহ কমিয়া গিয়া এইসবের দাম অনেক বাড়িয়া যায় তখন সরকারি গুদাম হইতে চালের সরবরাহ বাড়াইয়া বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়। ধানের মৌসুমে দাম যত উপরে রাখিতে চাহিবে বাজার হইতে তত বেশি পরিমাণ ধান, চাল কিনিয়া সরকারি গুদামে মজুত রাখিতে হইবে। অন্যদিকে যত বেশি মজুত সরকারের হাতে থাকিবে তত বেশি সরবরাহের দ্বারা ধানের মৌসুমের আগে চালের দাম কমাইয়া রাখিতে পারিবে। ফলে সারা বত্সর ধরিয়া চালের মত খাদ্যশস্যের দাম সরকার যে স্তরেই রাখিতে চাহিবে সেই স্তরেই রাখিতে পারিবে প্রয়োজনীয় গুদাম থাকিলে। গত বত্সর চালের বাম্পার ফলন হইলেও কৃষক চালের দাম কম পাইয়াছিল সরকার পর্যাপ্ত মজুত করিতে না পারার কারণে। আর মজুত করা সম্ভব হয় নাই গুদামের ধারণ ক্ষমতা কম থাকায়। ফলে খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতা বাড়িলে সি:সন্দেহে তাহা দামে স্থিতিশীলতা আনিতে সাহায্য করিবে, যদি সঠিকভাবে তাহা ব্যবহার করা হয়। তবে, সরকারি গুদামের ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তি খাতেও যেন গুদাম নির্মাণের প্রণোদনা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখিতে হইবে। বিশেষ করিয়া আলু ও শাক্সব্জি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোল্ডস্টোরেজ-এর ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো খুবই জরুরি। আর এই সকল পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের উদ্যোগই মুখ্য। সরকারি বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার মাধ্যমে এই সব ক্ষেত্রেও ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর দরকার। তাহা না হইলে কোন কোন বত্সর আলু পচিয়া যাইবে ক্ষেতেই আবার কোন কোন বত্সর তাহা উত্পাদন খরচের কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হইবে।