কোরিয়া উপদ্বীপে অশান্তির দামামা

কোরিয়া উপদ্বীপকে ঘিরিয়া বিশ্ব-অশান্তির দামামা নূতন করিয়া বাজিয়া উঠিতে শুরু করিয়াছে। দুই ভাগে বিভক্ত কোরিয়া দীর্ঘদিনের অভ্যাস বজায় রাখিয়া পরস্পরের দিকে উত্তপ্ত বাক্যবাণ নিক্ষেপ শুরু করিয়াছে। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে যে, কোন একটি পক্ষের একটুখানি হঠকারিতায় পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটিয়া যাইতে পারে। কোরিয়া সঙ্কট লইয়া উত্তর কোরিয়া দুষিতেছে দক্ষিণ কোরিয়াকে; দক্ষিণ কোরিয়া দুষিতেছে উত্তর কোরিয়াকে। এই কাণ্ড চলিতেছে বহুকাল ধরিয়া। মধ্যিখানে জীবন বিষময় হইয়া গিয়াছে একই ভাষা, একই সংস্কৃতি অথচ দুইটি আলাদা রাষ্ট্রের নাগরিক হইয়া থাকা সাধারণ কোরীয়দের। গত প্রায় এক দশক ধরিয়া উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচিকে ঘিরিয়া কোরিয়া উপদ্বীপে উত্তেজনা ছড়াইতেছে। এইবারও একই ঘটনা ঘটিয়াছে। দেশটির পরমাণু কর্মসূচির রাশ টানিয়া ধরিবার যুক্তিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ হইতে তৃতীয় দফা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। মধ্য-ফেব্রুয়ারিতে একটি পরমাণু পরীক্ষা চালাইবার দায়ে এই অবরোধ জারি করা হয়। অতীতেও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে এই ধরনের ব্যবস্থা লওয়া হইয়াছে। তবে এইবার উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া অন্যান্যবারকে ছাড়াইয়া গিয়াছে বলিয়াই মনে হইতেছে। দেশটি আগে হইতেই বলিয়া আসিতেছিল যে, অবরোধ আরোপ করা হইলে তাহাকে ‘‘যুদ্ধ ঘোষণা’’ হিসাবে ধরিয়া লওয়া হইবে এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে পরমাণু হামলা চালানো হইবে। পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়া ও সরকারগুলি একযোগে উত্তর কোরিয়ার নিন্দা করিতেছে। এইদিকে, উত্তর কোরিয়া যে অভিযোগটি তুলিয়াছে তাহাও লক্ষ্য করিবার মত। দেশটির মতে, গত মাসের শেষ দিক হইতে দক্ষিণ কোরিয়া তাহার সীমান্তের কাছাকাছি স্থানে তিন মাস মেয়াদী যে সামরিক মহড়া শুরু করিয়াছে তাহা লইয়া যাহাতে তেমন কোন শোরগোল তোলা না যায় সেই লক্ষ্য দ্বারা পরিচালিত হইয়াই পরমাণু পরীক্ষার অজুহাত খাড়া করিয়া অবরোধ আরোপ করা হইয়াছে। ‘কী রিজলভ’ নামের এই সামরিক মহড়ার প্রতিবাদে ১৯৫৩ সালের ‘আর্মিস্টিক অ্যাগ্রিমেন্ট’কে বাতিল হিসাবে ঘোষণা করিয়াছে উত্তর কোরিয়া। উল্লেখ্য, এই অ্যাগ্রিমেন্টের আওতাতেই কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় কোরিয়া উপদ্বীপে। উত্তর কোরিয়ার হুমকি লইয়া বেশ একটি সাড়া ফেলিয়া দিয়াছে পশ্চিমা বিশ্ব, প্রতিবেশি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। দেশটির প্রতি কিছুটা প্রীতিভাব ধারণকারী রাশিয়া ও একমাত্র মিত্র হিসাবে পরিচিত চীনের মধ্যেও এইবার পিছুটান লক্ষ্য করা যাইতেছে। এই অবস্থাটি পরিস্থিতিকে কোন দিকে লইয়া যাইবে বলা মুশকিল। পর্যবেক্ষক মহলের অনেকের অভিমত; অতীত ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয় যে, অবরোধ অস্ত্র প্রয়োগ করিয়া সাধারণ উত্তর কোরীয়দের জীবন দুর্বিষহ করিয়া তোলা ছাড়া আর তেমন কোন ফল পাওয়া যায় নাই। এইবারও অবরোধ আরোপের ফলে উত্তর কোরিয়া তাহার পরমাণু কর্মসূচি বাদ দিয়া দিবে বলিয়া মনে হয় না। কিন্তু বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশা শান্তি। অস্ত্রের বিস্তার এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস অশান্তির পথকেই প্রশস্ত করে। কাজেই শান্তির পথে অগ্রসর হইবার নিমিত্ত সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরই সংযমের পরিচয় দেওয়া উচিত।