আজ থেকে আবার সচল বিসিএস কম্পিউটার মেলা

স্লিম ডিভাইসের দিকে ঝুঁকছে ক্রেতা

বিসিএস কম্পিউটার সিটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্ প্রযুক্তি পণ্যের বাজার হিসেবেই স্বীকৃত। সারা বছর ধরেই এই প্রযুক্তি বাজারে থাকে প্রযুক্তিপ্রেমীদের ভিড়। তারপরেও প্রতি বছরেই একবার করে নতুন নতুন প্রযুক্তি আর পণ্যের পসরা নিয়ে এই মার্কেটে আয়োজন করা হয় বার্ষিক মেলার। প্রযুক্তি পণ্যের উপর মূল্যহ্রাস, আকর্ষণীয় সব অফার আর বৈচিত্র্যময় নানা আয়োজনের এই মেলা আকৃষ্ট করে থাকে সব ধরনের প্রযুক্তিপ্রেমী ক্রেতা-দর্শনার্থীদের। গত ১৪ মার্চ শুরু হয়েছে এই বছরের বার্ষিক এই আয়োজন। ‘সামাজিক ও গণযোগাযোগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম কম্পিউটার’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে এবারের বিসিএস সিটি আইটি কম্পিউটার ফেয়ার। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই মেলার উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। এ সময় আয়োজক কর্তৃপক্ষ ছাড়াও স্পন্সর প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিসিএস কম্পিউটার সিটির ১৬০টি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান নতুন রূপে সেজে অংশ নিচ্ছে এই মেলায়। দুই লক্ষাধিক বর্গফুট স্থানে এই মেলায় রয়েছে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, নেটওয়ার্ক ও ডাটা কমিউনিকেশন পণ্য, মাল্টিমিডিয়া ও আইসিটি শিক্ষা উপকরণ, ল্যাপটপ, পামটপ, ডিজিটাল ক্যামেরাসহ আধুনিক জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নানা ধরনের প্রযুক্তি পণ্য। স্লিম ডিভাইসে আগ্রহ বেশি মেলায় নানা ধরনের প্রযুক্তি পণ্য উপস্থিত থাকলেও ক্রেতা-দর্শনার্থীরা ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছেন একটু হালকা-পাতলা ডিভাইসের দিকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ল্যাপটপ বা নোটবুকের দিকে দৃষ্টি তাদের। একটু স্লিম ডিভাইসগুলোই তারা খুঁজছেন মেলায়—এমনটাই জানালেন অংশগ্রহণকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের সাথে কথা বলেও জানা যায় এমন কথাই। মেলায় আগত এমন একজন দর্শনার্থী ঢাকা কলেজের রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘মেলায় এসেছি মূলত একটি ল্যাপটপ কিনতে। চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব হালকা-পাতলা একটি ল্যাপটপ খুঁজে বের করতে। বাইরে নিয়ে ঘুরতে হবে বলেই পাতলা ল্যাপটপ প্রথম পছন্দ আমার।’ একই ধরনের কথা বললেন মেরুল বাড্ডা থেকে আসা চাকরিজীবী আশফাকুজ্জামান প্রবাল। তার কথায়, ‘আমার চাকরিটাতে প্রায়ই ঢাকার বাইরে যেতে হয়। ঢাকার মধ্যেও সারাদিন অফিসে বসে থাকার সুযোগ সবসময় মেলে না। তাই ভারি ল্যাপটপ যত হালকা হয়, ততই ভালো। তবে কনফিগারেশনটা যুতসই হতে হবে।’ কয়েকজন বিক্রেতা এবং আয়োজকদের সাথে কথা বলে জানা গেল, দেশের পরিস্থিতির কারণে মেলা শুরু হয়েছে বেশ দেরিতে। তবে মেলার শুরু থেকেই ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপস্থিতি বেশ ভালো, যা অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আশাবাদী করে তুলেছে। মেলার যত আয়োজন বিসিএস কম্পিউটার সিটির বার্ষিক এই আয়োজন কেবল প্রযুক্তি পণ্য প্রদর্শনী আর বিক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মেলায় রয়েছে একাধিক আলোচনা অনুষ্ঠান, কম্পিউটার বিষয়ক অনুষ্ঠান, গুণীজন সংবর্ধনা, শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, গেমিং প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা, রক্তদান কর্মসূচী ইত্যাদি। আয়োজক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কম্পিউটার সিটির নিচতলায় নিজস্ব মঞ্চে প্রতিদিনই একজনকে গুণীজন সংবর্ধনা প্রদান করা হচ্ছে। আইটি ব্যক্তিত্ব ছাড়াও শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদেরও সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে এই আয়োজনে। এ ছাড়া প্রযুক্তির তথ্য সকলের সামনে হাজির করার উদ্দেশ্যেই মেলায় রয়েছে ‘নলেজ ম্যানেজমেন্ট জোন’। প্রথিতযশা সব আইটি ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থেকে এই আয়োজনে প্রযুক্তি ও প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবহারকে সকলের মাঝে উপস্থাপন করছেন। মেলার যত অফার মেলার প্লাটিনাম স্পন্সর বাংলালায়ন তাদের ওয়াইম্যাক্স মডেম বিক্রি করছে ৯৫০ টাকায়। সেইসাথে রয়েছে বান্ডল অফার। মেলাতে রয়েছে ২১ হাজার টাকায় নেটবুক, ৯ হাজার টাকায় ডিজিটাল ক্যামেরা, ১১ হাজার টাকায় ট্যাবলেট পিসি। মেলায় কম্পিউটার সোর্স প্রোলিংক হ্যান্ডি রাউটার, অ্যান্টেক, করসায়ার এবং রেজার ব্র্যান্ডের ফুল গেমিং ডিভাইসের পাশাপাশি লজিটেক ব্র্যান্ডের তারহীন প্রযুক্তির কিবোর্ড, মাউসে দিচ্ছে বিশেষ মূল্যছাড়। অন্যদিকে এইচপি ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের সাথে ফ্রি দেওয়া হচ্ছে একটি মাউস অথবা টি-শার্ট। মেলায় গ্লোবাল ব্র্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড বিশেষ মূল্যে দিচ্ছে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটার। আবার মেলায় আসুস ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের সাথে রয়েছে স্ক্র্যাচকার্ডের মাধ্যমে ফোন, মাউস, পেনড্রাইভসহ বিভিন্ন উপহার। তোশিবার ল্যাপটপের সাথে রয়েছে ১,০০০ টাকার গিফট ভাউচার। ইউনিক বিজনেস সিস্টেম তাদের নিয়ে আসা এমএসআই নেটবুকের সাথে দিচ্ছে এটেক স্পিকার এবং পেনড্রাইভ ফ্রি। ইনসোর্স বাংলাদেশ এনসিআর টোনারে দিচ্ছে এক প্যাকেট ডাবল এ কাগজ। কিউবি পকেট ওয়াই-ফাই রাউটারে রয়েছে ৫০০ টাকা ছাড়। আবার জেএএন অ্যাসোসিয়েটস বিভিন্ন ক্যামেরায় দিচ্ছে মূল্যছাড়। ক্যানন প্রিন্টারেও রয়েছে ছাড়ের সুবিধা। মেলার গোল্ড স্পন্সর স্যামসাং তাদের প্রতিটি ল্যাপটপের সাথেই রেখেছে টি-শার্ট উপহার। আর তাদের নির্দিষ্ট চারটি মডেলের ল্যাপটপের সাথে রয়েছে স্ক্র্যাচ কার্ড। এসব স্ক্র্যাচ কার্ডে রয়েছে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকার গিফট ভাউচার। এ ছাড়াও এই কার্ডে রয়েছে ১,০০০ টাকার গিফট ভাউচার, গ্যালাক্সি নোট ২, নেপাল ভ্রমণের সুযোগ এবং মেগা পুরস্কার হিসেবে রয়েছে ৪৬ ইঞ্চি আকৃতির এলইডি স্মার্ট টিভি। মেলায় প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। প্রতিবারের মতো এবারও মেলায় শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিনামূল্যে প্রবেশের সযোগ পাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধীরাও বিনামূল্যে মেলায় প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। ১৪ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলার কথা ছিল ২৩ মার্চ পর্যন্ত। তবে গতকাল এবং পরশু হরতাল থাকায় মেলা বন্ধ ছিল। আর সে কারণে দুই দিন বেড়ে যাবে মেলার দৈর্ঘ্য। অর্থাত্ মেলা চলবে ২৫ মার্চ পর্যন্ত। মুজিবুর রহমান স্বপন প্রেসিডেন্ট, বিসিএস কম্পিউটার সিটি বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে মেলা। মেলা শুরুর চার দিন শেষ হতেই দুই দিনের হরতাল। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অস্থিতিশীল। মেলায় হরতালের প্রভাব কেমন, সে সম্পর্কে জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান স্বপন বলেন, ‘মেলার শুরু থেকেই আমরা বরাবরের মতোইভালো সাড়া পাচ্ছি। হরতালের একটা প্রভাব থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। এই প্রভাবটা অবশ্যই নেতিবাচক। যেমন রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও দুপুরের পর থেকেই উপস্থিতি কমে যেতে থাকে। তবে আমাদের দেশের মানুষের কিন্তু সব ধরনের পরিস্থিতির সাথে তালমিলিয়ে চলার অভ্যাস অনেক পুরোনো। মেলাতেও তার প্রতিফলন রয়েছে।’ মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদেও উপস্থিতিতে সন্তুষ্ট মুজিবুর রহমান স্বপন। তার কথায়, ‘মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি আমাদের আশাবাদ ছাড়িয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার মেলা উদ্বোধনের পর শুক্রবারেই সাড়ে আট হাজারের বেশি টিকেট বিক্রি হয়। অর্থাত্ শুক্রবারেই প্রায় ২৫ হাজার দর্শনার্থী হাজির ছিল মেলায়। এমনকি রবিবারেও সাড়ে ছয় হাজারের বেশি দর্শনার্থী মেলায় উপস্থিত ছিল। এএনএম কামরুজ্জামান আহ্বায়ক, সিটি আইটি কম্পিউটার ফেয়ার ২০১৩ কথা হয় মেলার আহ্বায়ক এএনএম কামরুজ্জামানের সাথে। তিনি বলেন, ‘মেলা শুরু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও মেলার প্রথম চারটি দিনে মানুষের উপস্থিতি এবং বিক্রির পরিমাণ ছিল আশাতীত। শুক্র ও শনিবার অন্যান্যবারের মতোই মেলায় উপস্থিতি বেশি ছিল।’ তিনি বলেন, ‘গত ছয় মাসে প্রযুক্তি বাজারে যে এক ধরনের মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, সেটার কোনো প্রভাবও মেলায় ছিল না। বরং মেলা সেই মন্দাকে কাটিয়ে উঠতে অনেকটাই সহায়তা করছে ব্যবসায়ীদের।’ কামরুজ্জামান বলেন, ‘মেলার আয়োজকদের প্রায় সবার সাথেই আমার কথা হয়েছে। তারা মেলার আয়োজনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।’ মেলা প্রাঙ্গনের সর্বত্র ওয়াই-ফাই সংযোগ থাকার কথা থাকলেও দর্শনার্থীদের অভিযোগ রয়েছে, ওয়াই-ফাই সংযোগ মেলা প্রাঙ্গনের সীমিত কিছু স্থানেই রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কামরুজ্জামান বলেন, ‘মেলায় যে পরিমাণ ক্রেতা-দর্শনার্থী উপস্থিত থাকে, তাদের সকলের জন্য ওয়াই-ফাই সংযোগের ব্যবস্থা না করতে পারার পেছনে কিছু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেই কারণেই আসলে আমরা গোটা মেলা প্রাঙ্গন ওয়াই-ফাই করতে পারিনি।’ আবুল হাসনাত সোহেল ডিজিএম (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং), স্যামসাং বাংলাদেশ সিটি আইটি মেলায় গোল্ড স্পন্সর হিসেবে অংশগ্রহণ করছে স্যামসাং। মেলায় অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে স্যামসাং বাংলাদেশের আবুল হাসনাত সোহেল বলেন, ‘এই মেলায় আমরা গত কয়েকবারেই অংশগ্রহণ করছি। আমরা মূলত সব ধরনের আইটি মেলাতেই নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে থাকি। বাংলাদেশের আইটি মার্কেটের সব স্থানেই আমার অবদান রাখতে চাই বলেই এখানেও আমরা নিজেদের উপস্থিতি রেখেছি।’ মেলায় স্যামসাংয়ের বিভিন্ন অফার বা মূল্যছাড় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যামসাং মূল্যছাড়ে বিশ্বাসী নয়। এমনিতেই আমাদের প্রযুক্তি পণ্যগুলো দামের দিক থেকে হাই-এন্ডের। আমরা এসব পণ্যের গ্রাহকদের জন্য রেখেছি নানা ধরনের উপহার। সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসেবে নির্দিষ্ট মডেলের ল্যাপটপে ৪৬ ইঞ্চি স্মার্ট টিভিও রয়েছে।’ মেলায় কী ধরনের সাড়া পাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই বলা যায় আমরা আশানুরূপ ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ করছি। শুক্র এবং শনিবারের দুই দিনে যথেষ্ট দর্শনার্থী পেয়েছি আমরা। এ ছাড়া রবািরেও দুপুর পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক।’