গণচীনে নতুন নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৪
গত কয়েকদিনে গণচীনের সর্বোচ্চ পদ্গুলিতে নূতন মুখের আবির্ভাব ঘটিয়াছে। একবিংশ শতাব্দীর নূতন পরাশক্তি চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হইয়াছেন যথাক্রমে শি জিনপিং ও লি কেকিয়াং। ইহাছাড়া সামরিক বাহিনীর উপপ্রধান পদেও দুইটি নূতন মুখ আসিয়াছে। অবশ্য এতসব পরিবর্তনের মধ্যে জিনপিং-এর প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়াটাই হইতেছে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গত নভেম্বরে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদে আরোহণের ধারাবাহিকতাতেই তিনি এইবার প্রেসিডেন্ট হইলেন; একই সাথে রীতি-মোতাবেক পাইয়াছেন সামরিক বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বটি।
খুব স্বাভাবিক যে, এক নাম্বার অর্থনৈতিক পরাশক্তি হইবার পথ দ্রুত পাড়ি দিতে থাকা দেশ চীনের নেতৃত্বে পরিবর্তন, নীতির ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন লইয়া আসে কিনা তাহা জানিতে বাকি-বিশ্ব উত্সুক হইয়া আছে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেয়া প্রথম ভাষণে জিনপিং যাহা বলিয়াছেন তাহাতে নূতন কিছু নয় বরং এতদিন ধরিয়া চলিতে থাকা নীতিমালাগুলিই অনুসরণ করা হইবে বলিয়া অনুমান করা যাইতেছে। বিশেষ করিয়া গত কয়েক দশক ধরিয়া চলিয়া আসা ‘সংস্কার’ কর্মসূচিতে কোন ধরনের পরিবর্তন আনিবার কোন ইঙ্গিত নূতন নেতৃত্ব হইতে দেওয়া হয় নাই। ইহার অর্থ হইতেছে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র ভূমিকা এবং অর্থনীতিতে এক ধরনের বাজারমুখী সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই অব্যাহত থাকিবে। গত বেশ কিছুদিন ধরিয়া চীন বিষয়ক মার্কিন নীতি লইয়া কড়া অবস্থানে আছে বেইজিং। এমতাবস্থাতে সামরিক ক্ষেত্রেও শক্তিমত্তা বৃদ্ধির নীতিই অব্যাহত থাকিবে তাহা বলাই বাহুল্য।
নীতি-আদর্শের ক্ষেত্রে তেমন কোন চ্যালেঞ্জ এখন অবধি দৃশ্যমান না হইলেও, সমাজ-রাষ্ট্রের স্তরে-স্তরে শিকড় গাঁড়িয়া বসা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করাটাই হইবে চীনের নূতন নেতৃত্বের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। মিডিয়ার উপরে নানাবিধ বিধি-নিষেধের দেয়াল ভেদ করিয়া যতটুকু খবর বহির্বিশ্বে ছড়াইয়া পড়িয়াছে তাহা হইতে ইহা স্পষ্ট যে, দুর্নীতি এক ভয়াল সমস্যা হইয়া উঠিয়াছে চীনে। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি, আমলাতন্ত্র, সরকারের নানান স্তরে ছড়াইয়া পড়িয়াছে দুর্নীতি। এই ব্যাধির প্রকোপ এতটাই বাড়িয়াছে যে, কিছুদিন পূর্বে চীনের রেল মন্ত্রণালয় ভাঙিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছে কর্তৃপক্ষ। বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকিলে গোটা ব্যবস্থাটিই ধ্বসিয়া পড়িয়া যাইতে পারে বলিয়া সতর্ক করিয়া দিয়াছিলেন সদ্য-বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও। একশত পঁয়ত্রিশ কোটি মানুষের দেশে দুর্নীতির সমস্যাটি নূতন নেতৃত্ব কিভাবে মোকাবিলা করে তাহা হইবে দেখিবার বিষয়। ইহাছাড়াও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমশ বাড়িতে থাকা, আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্য এবং গ্রামাঞ্চলের দিকে জমি দখল কিংবা জাতিগত সংঘাতের মত বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলিকে মোকাবিলা করিতে হইবে নূতন নেতৃত্বকে।
চীনের নূতন নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নূতন কোন রাস্তা অনুসরণ করিবে কিনা তাহা স্বভাবতই এখন অবধি স্পষ্ট নহে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রথম সফরের জন্য রাশিয়াকে বাছিয়া লইবার মধ্য দিয়া মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি প্রচ্ছন্ন একটি ইঙ্গিত প্রেরণ করা হইয়াছে বলিয়া ধারণা করিলেও করা যাইতে পারে। পূর্ব চীন সাগরে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা লইয়া প্রতিবেশী জাপানের সহিত বিবাদকে ঘিরিয়া চীনের মাটিতে গত কিছুদিন ধরিয়া বেশ খানিকটা জাতীয়তাবাদী উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাইতেছে। জাতীয়তাবাদের এই জোশের লাভ-ক্ষতি হিসাবকরত নূতন নেতৃত্বের সময়ে জাপানের সহিত সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেয় তাহাও দেখিবার বিষয় হইবে বৈকি।