একটি স্বস্তিদায়ক সংবাদ
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৩, ২১:৪০
অবশেষে সচল হইতেছে বহুল প্রত্যাশিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার নৌ-টার্মিনাল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকিলে আগামী মে মাসের মধ্যে টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হইবে বলিয়া জানাইয়াছেন প্রকল্প পরিচালক নৌ মন্ত্রণালয়ের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মজিবুর রহমান। টার্মিনালটি চালু হইবার কথা ছিল অনেক আগেই। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের অপেক্ষা করিতে হইয়াছে দীর্ঘ ২১টি বত্সর। পৌনে দুইশত কোটি টাকার এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করিয়াছিল প্রায় একযুগ আগে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হইয়াছে গত বত্সরের মে মাসে। কিন্তু টার্মিনালটি কে পরিচালনা করিবে তাহা লইয়াই কাটিয়া গিয়াছে অতি মূল্যবান আরও প্রায় একটি বত্সর। ইহা হইতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনভিপ্রেত দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার ধরনটি কিছুটা আঁচ করা যায়। অথচ ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরে ৮৮ একর জমির উপর গড়িয়া উঠা আধুনিক সুবিধা-সংবলিত এই টার্মিনালটির গুরুত্ব ও তাত্পর্য কী অপরিসীম তাহা কাহারো অজানা নহে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিজেএমইএ) বলিয়াছে যে, বর্তমানে একটি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর হইতে ঢাকায় পৌঁছাইতে সময় লাগে ১৫ হইতে ১৮ দিন—যাহা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নহে। এই প্রেক্ষাপটে পানগাঁও টার্মিনাল চালু হইলে তাহাদের সময় বাঁচিবে, পরিবহন ব্যয় কমিবে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও যানবাহনের চাপমুক্ত হইবে বলিয়া বিজেএমইএ নেতৃবৃন্দ মনে করেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানাইয়াছেন যে, কনটেইনার পরিবহনে বর্তমানে যেইখানে ৭ দিন হইতে একমাস পর্যন্ত সময় লাগিয়া যায়, পানগাঁও টার্মিনাল চালু হইলে তাহা মাত্র ২৪ ঘন্টায় নামিয়া আসিবে। ফলে শুধু যে ব্যয় সাশ্রয় হইবে তাহাই নহে, ব্যবসা-বাণিজ্যেও সঞ্চারিত হইবে নূতন গতি ও উদ্যমের। তাঁহার মতে, নূতন এই নৌ রুটে দৈনিক চারটি জাহাজ চলাচল করিবে। কনটেইনারবাহী একটি জাহাজ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হইতে ৫০টি ট্রাকের চাপ হ্রাস করিতে সক্ষম হইবে বলিয়া তিনি জানান। যে-চিত্রটি তুলিয়া ধরা হইয়াছে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে অধিকতর বেগবান করার ক্ষেত্রে তাহার তাত্পর্য অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বিশেষ করিয়া আমাদের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে সময় ও পরিবহন ব্যয় দীর্ঘকাল যাবত্ একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিদ্যমান। এই ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। ফলে আমদানি-রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই শুধু যে ব্যয় বৃদ্ধি পায় তাহাই নহে, ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষুণ্ন হয় ভাবমূর্তিও। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকিয়া থাকার ক্ষেত্রে যাহা মোটেও সহায়ক নহে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে যেইসব পণ্য খালাস হয় তাহার প্রায় ৭০ শতাংশই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের। এইসব পণ্যের ৯০ শতাংশই আসে সড়কপথে। মাত্র ১০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয় রেলপথে। রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের দুঃসহ চাপ লাগিয়াই থাকে। সেই সাথে দুর্ঘটনা, সেতু বা সড়ক মেরামতের কারণেও প্রায়শ সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের। অন্যদিকে, মহাসড়কে ডাকাতির ঝুঁকিও দিনদিন বাড়িয়া চলিয়াছে। সড়কপথের আরেকটি গুরুতর প্রতিবন্ধকতা হইল হরতাল বা ধর্মঘট। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতিও এখন নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই নৈরাশ্যজনক বাস্তবতার বিপরীতে নবনির্মিত নৌ টার্মিনালটি যে আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বহুমাত্রিক ও বিশাল স্বস্তিদায়ক সংবাদ তাহাতে সন্দেহ নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বহু আগেই বলিয়াছিল যে, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করার মাধ্যমে বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে পারে। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ অভ্যন্তরীণ নৌপথের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আমরা অদ্যাবধি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে পারি নাই।
বিলম্ব সত্ত্বেও পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল নিঃসন্দেহে এই ক্ষেত্রে একটি শুভ সূচনা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানাইয়াছেন যে, ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুতিই সম্পন্ন করা হইয়াছে। নির্মাণ করা হইয়াছে টার্মিনালসংলগ্ন চার-পাঁচ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। টার্মিনালটি চালু করার ক্ষেত্রে আর কোনো প্রকার দীর্ঘসূত্রতা বা বিলম্ব যাহাতে না ঘটে সেইদিকে লক্ষ্য রাখিতে হইবে। সর্বোপরি, নিশ্চিত করিতে হইবে স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা।