বারাক ওবামার মধ্যপ্রাচ্য সফর
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৩, ২১:৪০
প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রথমবারের ন্যায় ইসরাইল, ফিলিস্তিন ও জর্ডান সফর করিতেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আজ তাহার জর্ডানে অবস্থান করিবার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই মিত্র দেশের বাদশাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গে তিনি বৈঠক করিবেন। এখানে সিরিয়ার শরণার্থীদের সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়া আলোচনা হইতে পারে। আজই তাহার মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষ হইবে। ইহার আগে তিনি রামাল্লায় ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও প্রধানমন্ত্রী সালাম ফায়াদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে প্রথম দিন তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। সফরকালে ইসরাইলকে ওবামা অন্তরের ও চিরদিনের মিত্র হিসাবে উল্লেখ করিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থেই ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলিয়াছেন।
মধ্যপ্রাচ্য শান্তি উদ্যোগ বা এরূপ কোন আলোচনার জন্য ওবামা এবার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য সফরে যান নাই। মিসরের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের বাদশাহর অসুস্থতা, সেখানে উত্তরাধিকার নিয়া টানাটানি ইত্যাদি কারণে সেই পরিস্থিতি ও পরিবেশও নাই। তাই তিনি সকলের কথা শুনিতে যান । ইসরাইলের অভিমান ভাঙাইতে যান । ২০০৮ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম মেয়াদ জুড়িয়া তিনি ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেন। বুশ জামানায় আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধসহ নানা কারণে বিশ্বের মুসলমানদের সহিত দেশটির সম্পর্কের অবনতি হয়। তিনি মিসর ও মরক্কোতে গিয়া ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন। তাহার পরই আরব বসন্তের সূচনা হয়। আরব বিশ্বে এক এক করিয়া স্বৈরশাসনের অবসান হয় কিংবা রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষত উপশমের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ওবামা মুসলিম বিশ্বের দিকে মনোযোগী হইতে গিয়া ইসরাইলের আস্থা হারান। ইহুদিরা তাহাকে অবিশ্বাস করিতে শুরু করে। এমনকি আরব বসন্তের হাত ধরিয়া ইসলামপন্থিদের উত্থানেও ইহুদিরা নাখোশ। ইহার কারণে তিনি প্রথম মেয়াদে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করিলেও কোন সাফল্য পান নাই। তাহার এই সফরের পর মধ্যপ্রাচ্যের সকল পক্ষ আবার শান্তি আলোচনার টেবিলে ফিরিয়া আসিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মৃতপ্রায় টু স্টেট বা দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব আবার হালে পানি পাইতে পারে।
ওবামার এই সফরের মাত্র দুইদিন আগে প্রায় দুই মাসের অচলাবস্থার পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন ইসরাইলের নূতন জোট সরকার শপথ গ্রহণ করে। এই নূতন সরকারের সহিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কোন্নয়নই ওবামার নূতন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য, যাহাতে তাহারা আগামী বত্সরগুলিতে দ্বিপাক্ষিক ও মধ্যপ্রাচ্যে সুসম্পর্ক রক্ষায় একত্রে কাজ করিতে পারেন। ওবামা এবার ইহুদি রাষ্ট্র আন্দোলনের প্রধান তত্ত্বীয় নেতা থিওডর হারজেলের সমাধিস্থল পরিদর্শনে যান, যাহা খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। একদিকে ইসরাইলবাসী নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলের নূতন বসতি সম্প্রসারণে ফিলিস্তিনীরা উত্কণ্ঠিত। এমনকি ইসরাইলের নূতন জোট সরকারের প্রতিরক্ষা ও আবাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে আগ্রাসনবাদী মনোভাবের রাজনীতিকদের। এভাবে হতাশাগ্রস্ত ইহুদি, ফিলিস্তিনী ও মধ্যপ্রাচ্যবাসী সকলে ওবামার নিকট তাহাদের সুখ-দুঃখের কথা বলিয়াছেন।
তবে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইয়াছে ইরান ও সিরিয়া ইস্যু মোকাবিলা করা। ইসরাইল মিসরের ন্যায় সিরিয়ার বিদ্রোহীদের মধ্যে ইসলামপন্থিদের উত্থানে উদ্বিগ্ন। জর্ডানে রাজনৈতিক সংস্কারের ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন ও একই সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থান ঠেকানো সম্ভব হইলেও ইসরাইল সামগ্রিকভাবে সন্তুষ্ট নহে। মিসরের সহিত দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি নিয়াও কথা উঠিতেছে। বস্তুত ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থে প্রতিশ্রুত ও পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের ফয়সালা, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন, ইসরাইলি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইত্যাদি ইস্যুতে ঘুরপাক খাইতেছে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া। তাই শুধু ইসরাইলের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করিলে চলিবে না, ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলির নিরাপত্তা লইয়াও ভাবিতে হইবে।