[ স্ম র ণ ]
একজন অভিভাবকের বিদায়
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৩, ২১:৪১
লশানে এখন যেখানে বিশাল আইভি কনকর্ড এপার্টমেন্ট, আগে এটি ছিল একটি ছিমছাম দোতলা বাড়ি। সামনে অনেক বড় লন, সবুজ ঘাসে আবৃত। অনেকবার সেই সবুজ লন পেরিয়ে দেখা করেছি জিল্লুর রহমানের সংগে। একজন বড় রাজনীতিবিদ, কিন্তু অনেকটাই সাধারণ সহজ সরল। তখন তিনি দেশের বড় রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক আর আমি একজন নতুন রিপোর্টার, চেষ্টা করছি রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ে হাত পাকানোর জন্য। রাজপথে, রাজনীতির মাঠে প্রতিদিনের এসাইনমেন্ট করি। সব জায়গায় দেখা হয়, কথা বলি জিল্লুর রহমানের সংগে। বয়সের পার্থক্যটা বড় হয়ে দেখা দেয় না, কারণ নেতা-কর্মীদের মত সাংবাদিকদেরকেও স্নেহের চোখেই দেখতেন জিল্লুর রহমান। তাই সবার মত সাংবাদিকদের কাছে্ও তিনি ছিলেন “প্রিয় জিল্লুর ভাই।”
প্রায় এক দশকের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের অবসান হয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯১ সালে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের রাজপথ থেকে আমরা যারা সরাসরি পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম তারা মাঠের রিপোর্টিংয়ে যুক্ত হয়ে রাজনীতিকদের সারিতে পেয়েছিলাম জিল্লুর রহমানকে। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নানা ঘটনার সময়ই এমন একজন বড় মাপের রাজনীতিকের সংগে কথা বলতে হয়েছে। সেজন্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান যখন এবার অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুরে গেলেন তখন থেকেই ভয় তাড়া করছিল, কিছুদিন আগে জলিল ভাই যেমন চলে গেলেন তেমনিই হয়তো আমাদের মাঝে আর ফিরে আসবেন না প্রিয় জিল্লুর ভাইও। ১৯৯২ থেকে আমরা যারা অফিসের দায়িত্ব হিসেবে “আওয়ামী লীগ বিট” কাভার করতাম তাদের সবার কাছে সমান প্রিয় ছিলেন জিল্লুর ভাই। বন্ধু ওবায়দুল কবীর, পীর হাবিবুর রহমান, বায়েজিদ মিল্কী কিংবা বয়সে বড় শফিকুর রহমান, শাহজাহান সরদার, সাইফুল আলম, নঈম নিজাম সবাই মিলে আমরা নানা সময় নানা কারণে জিল্লুর রহমানের মুখোমুখি হয়েছি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সংবাদ সম্মেলন বা কোনো রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে। সাংবাদিক পেলেই অহরহ রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতেন না জিল্লুর রহমান কিন্তু হাসিমুখে সবাইকে স্বাগত জানাতেন। আর খুব ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলতেন রাজনীতিবিদদের কখন কথা বলতে হবে আর কখন চুপ থাকতে হবে। সেইরকম একজন প্রিয় মানুষ, যিনি বয়স আর রাজনীতির অভিজ্ঞতায় পিতার চেয়েও উচ্চাসনে, কিন্তু তিনিই ছিলেন আমাদের সবার প্রিয় জিল্লুর ভাই। বঙ্গভবনের প্রটোকল কি তাকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করেছিল গণমানুষ থেকে? আবার একদিক থেকে ভাগ্যবান জিল্লুর রহমান। সততাই হয়তো সবার অলক্ষে তাঁকে তেমন করে পুরস্কৃত করলো তাঁর নিজের অদৃষ্ট। কেননা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এই প্রথম একজন রাষ্ট্রপতির স্বাভাবিক মৃত্যু হলো। যিনি দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
মনে পড়ে বেশ কয়েকবার গুলশানের বাসায় গিয়েছি। এমনও হয়েছে বারান্দায় বসে চুলে কলপ করছেন। সব সময় ধোপদুরস্ত পোশাকে থাকা জিল্লুর ভাই বসে আছেন বারান্দায় মেঝেতেই। আর পাশেই আইভি আপা। কোনোরকম বাধা না পেয়ে সরাসরি সেই বারান্দায় যখন পৌঁছে গেছি তখন অতি সরলভাবেই জিল্লুর ভাই ইশারায় মেঝেতেই বসতে বললেন। অনেকটা সম্মোহিত হয়ে বসে পড়েছি তার পাশেই। তারপর অনেক গল্প এবং এক ফাঁকে কাজের কথা। ছোট্ট একটু প্রতিক্রিয়া জানার ছিল। হাসিমুখে বললেন “আগে নাস্তা করো তারপর বক্তব্য।” চতুর্থবারের মত সাধারণ সম্পাদক হয়ে জিল্লুর রহমান কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধুর কবরে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। আমরা যারা তার সংগে ছিলাম, আরিচায় ফেরিতে গাড়ী ওঠার পর রিপোর্টারদের ডেকে নিলেন জিল্লুর রহমান। সেদিন কথায় কথায় জানিয়েছিলেন ভারত ভাগ হওয়ার সময় ১৯৪৭ সালে কিভাবে বঙ্গবন্ধুর সংগে দেখা হয়েছিল সিলেটে। সিলেট তখন ভারতে অন্তর্ভুক্ত হবে নাকি পাকিস্তানে থাকবে তাই নিয়ে একটি গণভোট হয়েছিল। সেই গণভোটে সিলেট যেন পাকিস্তানের দিকে থাকে, সেই প্রচারে কলকাতা থেকে সিলেট এসেছিলেন তখনকার তুখোড় ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। জিল্লুর রহমানও গিয়েছিলেন সেখানে। সেই দেখা থেকে দুজনের পথচলা শুরু। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে জিল্লুর রহমানকেই সাধারণ সম্পাদক করেছিলেন জাতির জনক। এরপর আরো তিনবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও কারো বিরাগভাজন হননি জিল্লুর রহমান।
আর রাজনীতির শেষ পর্বে ২০০৪ সালে কালো আগস্টে প্রিয়তম স্ত্রী এবং দলের নেত্রী আইভি রহমানকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। তিনবছরে সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আঘাত এসেছিল ২০০৭ সালে। সভানেত্রী শেখ হাসিনা কারাগারে, “সুগার কোটেড মার্শাল ল” এর ধাক্কায় অনেক আওয়ামী লীগ নেতা যখন বিতর্কিত আচরণ করেছেন তখনও শক্ত হাতেই দলের হাল ধরেছিলেন জিল্লুর রহমান। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া জিল্লুর রহমান ১৯৭৫ সালেও কারা নির্যাতন ভোগ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর। আওয়ামী লীগ সেদিন প্রায় ২১ বছরের জন্য ক্ষমতা থেকে নির্বাসিত হয়েছিল। তাই ২০০৭ সালে অনেক বেশি কৌশলী ছিলেন জিল্লুর রহমান। যেমন ছিলেন বিতর্কের বাইরে তেমনি হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগের অভিভাবক। শুধু নিজের দল নয়, আপন প্রজ্ঞা আর সর্বজন শ্রদ্ধেয় হওয়ায় তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল আওয়ামী লীগের চিরবিরোধী বিএনপি নেতাদের বঙ্গভবনের সংলাপে নেয়া। রাজনীতিবিদ হয়ে রাষ্ট্রপতি, মানে রাষ্ট্রের অভিভাবক, আর হয়তো সেজন্যই তার প্রয়াণে জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম হয়েছে ‘অভিভাবকের বিদায়’।
লেখক : এডিটর (আউটপুট), এটিএন নিউজ