বিশ্ব পানি দিবস

পানির জন্য বিরোধ নয় চাই সহযোগিতা

আজ ২২ মার্চ। বিশ্ব পানি দিবস। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ সভায় এই তারিখটিকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ বছরের পানি দিবসের উপপাদ্য হল “পানি সহযোগিতা” (Water Cooperation)। জাতিসংঘের হিসাবে সারাবিশ্বের প্রায় ১১০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারে না। প্রতিবছর ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে দূষিত পানির কারণে, মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন ৬ হাজার নিষ্পাপ শিশুর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ২০২৫ সাল নাগাদ ৪০০ কোটি মানুষ পানির অভাবে ভুগবে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরগুলোতে এখন পানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। ওয়াসার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরে ৩ মিটার বা ৯ ফুট করে নেমে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ফলে এক নতুন সঙ্কটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ১৯৯৫ সালে বিশ্বব্যাংকের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সুষ্পষ্ট আশংকা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, “এই শতাব্দীতে যুদ্ধ হয়েছে তেল নিয়ে, আগামীতে যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে”। ইতিমধ্যে সেই আশংকা ফলতে শুরু করেছে। বহ্মপুত্র নদীর পানি নিয়ে ভারত-চীনের মধ্যে চলছে ঠান্ডা লড়াই। চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে উত্পত্তি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এই নদী মরে যাচ্ছে বলে ভারত যে অভিযোগ তুলেছে তা অস্বীকার করছে চীন। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার নদীর পানি বন্টন নিয়ে চলছে বিরোধ। ইসরাইলের স্বাদু পানির সরবরাহ আসে জর্দান নদী থেকে। তুরস্কের তাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস নদীর পানির উপর নির্ভর করে সিরিয়া ও ইরাকের কৃষি। তুরস্ক এই দু’টো নদীতে বেশ কিছু বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে যা সিরিয়া ও ইরাককে রীতিমত ভাবিয়ে তুলেছে। অন্যদিকে মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়ার কৃষিখাতকে বাঁচিয়ে রেখেছে নীল নদীর পানি। উজানের দেশ সুদান কিংবা ইথিওপিয়া, পানির প্রবাহে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে চরম খাদ্য সঙ্কটে পড়বে মিসর। সম্প্রতি রুয়ান্ডার গণহত্যা, সুদানের দারফুরের যুদ্ধের সাথে পানি নিয়ে বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সার্ক অঞ্চলে পানি নিয়ে সম্ভাব্য বিরোধের ফ্লাস পয়েন্ট হল বাংলাদেশ। ফারাক্কা ব্যারেজ, তিস্তা নদীর পানি বন্টন, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার সম্পর্কে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ক’দিন আগে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বাংলাদেশ সফরে এসে তিস্তা পানি চুক্তির ব্যাপারে আশ্বাস দিয়ে গেছেন। তিস্তা চুক্তি কখন কার্যকর হবে সেই আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জনগণ। উল্লেখ্য, ১৯৯৬-এর ১২ ডিসেম্বর তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৩০ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি ১৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। চুক্তির পর বিগত বছরে বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য অংশ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পানি সঙ্কট আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো দুই পরাশক্তিকেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ করেছে। চাঁদ এবং মঙ্গল গ্রহে পানির সন্ধানে যৌথ গবেষণা চালানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এই দু’টো দেশ। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা তাই একান্ত জরুরি। প্রয়োজনে এশিয়া অঞ্চলের সার্ক, আসিয়ান এবং বিমসটেক-এর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। লেখক :সিডনী প্রবাসী প্রকৗশলী