তারুণ্য স্বাধীনতারই প্রতিচ্ছবি
প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৩, ১৬:২৬
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক ভাস্কর্যের কথা বললেই সবার প্রথমে যে দৃশ্যটি ভেসে উঠে চোখের সামনে তা হলো তিনটি নিশ্চল মূর্তি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত এই ভাস্কর্যটির নাম অপরাজেয় বাংলা। এই তিনজন তরুণের দুজন পুরুষ, একজন নারী। পুরুষের একজনের কাঁধে রাইফেল, লম্বা এই তরুণের পরনে কাছা দেওয়া লুঙ্গি, ডান হাতের মুঠোয় একটি গ্রেনেড। তার বামদিকে অপেক্ষাকৃত খর্বকায় আরেক তরুণ, তার পরনের জিন্সপ্যান্ট বুঝিয়ে দেয়। সে একজন শহুরে, এর রাইফেলটি হাতে ধরা। লম্বা তরুণের ডানপাশে কুচি দিয়ে শাড়ি পরিহিতা এক তরুণী, এর কাঁধে একটি ফার্স্ট এইড বক্স। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতিরোধ, মুক্তি ও সাফল্যের প্রতিকৃতি এই অপরাজেয় বাংলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর। স্বাধীনতায় উজ্জীবিত তারুণ্যের প্রতীক এই ভাস্কর্য বারবার মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার উত্তাল দিনগুলোতে তারুণ্যের বিজয়োল্লাসের কথা। বছর ঘুরে মার্চ মাস আসতেই এই প্রজন্মের তরুণেরা ১৯৭১-এর মার্চ মাসে ফিরে যায়। যত দিন বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবে, তত দিন মার্চ মাসের অন্য কোনো অর্থ বা তাত্পর্য তারুণ্যের কাছে থাকবে না। ১৯৭১-এর পর থেকে প্রতি বছরই মার্চ মাস আসে। কিন্তু কোনো মার্চ মাসই আমাদের ১৯৭১-এর চেয়ে বেশি আন্দোলিত বা আলোড়িত করেনি। আলোড়িত করার কোনো কারণ আমরা দেখি না। কেননা ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে সাড়ে সাত কোটি মানুষ যেভাবে গর্জে উঠেছিল, যেভাবে প্রতিটি দিনকে স্বাধীনতা লাভের জন্য বিশেষভাবে মূল্যবান করে তুলেছিল, নিজেরা গড়ে উঠছিল, ২৬ মার্চের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করে যেভাবে মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত ও ঘোষিত মন্ত্রে মেতে উঠেছিল। এর কি কোনো তুলনা কখনো করা যায়?
যারা তরুণ তাদের দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ অন্য যে কারও চেয়ে আলাদা, স্বতন্ত্র। দেশের প্রতি এই স্বতন্ত্র প্রেম আর ভালোবাসার প্রমাণ তারা দিয়ে আসছে সেই ১৯৭১ সাল থেকে। মৃত্যুকে সঙ্গী করে তারা এগিয়ে গেছে লাল-সবুজের পতাকাকে ছিনিয়ে আনতে। এনেছেও। সেই পতাকা এখন পতপত করে ওড়ে মুক্ত বাতাসে। আর এর ধারক বাহক আজকের তরুণেরা। যারা দেশপ্রেমের দৃপ্ত অঙ্গীকারে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাদের ভেতর-বাহির সবই নিবেদিত দেশের জন্যে। তাদের ভেতরটা জুড়ে যে কেবল দেশের ছবিই আঁকা তার প্রমাণ মেলে যখন তারা উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে গেয়ে ওঠে দেশের গান—‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে’ কিংবা ‘মাগো ভাবনা কেন আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে...’। এই যে দেশের গান, দেশাত্মবোধক গান, এই গানগুলো জনপ্রিয় করেছে মূলত তরুণরা। কারণ গানগুলো কেবল তাদেরকেই মানায়, তাদের দুরন্তপনার সঙ্গেই খাপ খায়। তারা হয়তো ইচ্ছে করলেই ভিনদেশি গানে ডুবে থাকতে পারত, কিন্তু তারা তা করে না। দেশের প্রতি মমত্ববোধ তাদেরকে তা করতে দেয় না। এফএম রেডিওগুলোতে প্রায় সব সময়ই দেশীয় গান বাজে। আর দেশীয় গান বাজানো হয় তরুণরা এটি পছন্দ করে বলেই। তরুণরা পছন্দ না করলে হয়তো কর্তৃপক্ষের পক্ষেও বাজানো সম্ভব হতো না। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান নিয়ে বিভিন্ন সময় বাজারে আসে বিভিন্ন অ্যালবাম। সব অ্যালবামে গান মোটামুটি একই থাকে, তবু তরুণরা সেগুলো কেনে এবং শোনে। কারণ গান এক হলেও সংগীতয়োজনে ভিন্নতা থাকে। আর এই ভিন্ন সংগীতায়োজনটাও করে থাকে কোনো প্রতিভাবান তরুণ সংগীতায়োজক। টিভি চ্যানেলগুলো তরুণদের পছন্দের কথা বিবেচনা করে নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এইসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ইতিহাস আর ঐতিহ্য সম্বলিত এসব অনুষ্ঠানের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বিস্তর। দেশীয় পণ্য ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে অন্যরকম এক দেশপ্রেম। আর এই দেশপ্রেমের চিত্র দেখা যায় তরুণদের পোশাকে-আশাকে। ফেব্রুয়ারিতে সাদা-কালো, মার্চে লাল-সবুজ, বৈশাখে লাল-সাদা আবার ডিসেম্বরে লাল-সবুজ। তরুণরা তাদের পোশাকে এসব রঙের বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলে দেশপ্রেমের চেতনা থেকে। জাতীয় দিবসগুলোকে সামনে রেখে যেসব দেশি পণ্য বিক্রি হয় যেমন পিঠাপুলি, হাতপাখা, মাটির পুতুল—এসব পণ্যের সিংহভাগ ক্রেতা তরুণ। তারা এগুলো কিনে নিজেরা তো ব্যবহার করেই, ব্যবহার করতে দেয় তাদের ছোট ভাইবোনদেরও। যাতে পরবর্তী প্রজন্মও বেড়ে ওঠে দেশপ্রেমের প্রেরণায়। আমাদের দেশের বুটিক হাউসগুলোও এখন পরিচালনা করছে তরুণরা। যে কারণে তাদের তৈরি পোশাক-আশাকে দেশপ্রেমের একটা ছাপ থেকেই যায়। এতে দিবসভিত্তিক পোশাকে একটা বিপ্লব এসেছে বলা যায়। ডিসেম্বর মাসে এমন তরুণ খুব কম পাওয়া যাবে যাদের মোবাইল ফোনের ওয়েলকাম টিউনে দেশের গান কিংবা ফেসবুকের প্রোফাইল ছবিতে জাতীয় পতাকা নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী নিশি। নিশির ভাষায়, ‘শুধু বিজয় কিংবা স্বাধীনতার মাসে আমরা আমাদের মোবাইল ফোনে দেশের গান সেট করি, ফেসবুকে প্রোফাইল ছবিতে জাতীয় পতাকার ছবি দিই বলে আমাদের দেশপ্রেমটা যে শুধু দিবস কিংবা মাসভিত্তিক তা কিন্তু না। হয়তো বৈচিত্র্য আনার জন্যে অন্যসময় অন্যান্য গান অথবা ছবি রাখি, তবে আমাদের মনে দেশের গানের সুর আর চোখের পাতায় লাল-সবুজ পতাকার ছবি সব সময়ই থাকে। আজীবন থাকবে। এ সুর আর ছবি কখনোই মুছে যাওয়ার নয়।’
সমাজ বিজ্ঞানী ব্রুস বাটন বলেন, ‘এটা একটি অদ্ভুত বিষয় যে, আপনি এমন অনেক মানুষ পাবেন বিশ্বে যারা স্বাধীনতার জন্য জীবন পর্যন্ত দান করতে পারেন। কিন্তু, তারা অতিসামান্য আত্মত্যাগ করতেও পারে না, যাতে তারা নিজেরা নিজেদের যে সংকীর্ণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে মুক্ত হতে পারে। আমার তো মনে হয়, নিজেদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে পারাটাই এক ধরনের স্বাধীনতা।’ মূলত আমরা যদি প্রচলিত ধ্যান-ধারণার দিকে লক্ষ্য করি তা হলে দেখতে পাব স্বাধীনতা কথাটির অর্থ, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সর্বময় ক্ষমতা অর্জন করা। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রত্যাশিত স্বাধীনতা আমরা কতটুকু লাভ করতে পেরেছি। তাই তরুণরাই স্বাধীনতার প্রকৃত ধারক হিসেবে কাজ করতে পারে। ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’ নজরুলের তরুণদের প্রতি এই আহ্বানে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তবেই, তরুণদের হাত ধরেই আসবে স্বাধীনতার প্রকৃত প্রসন্নতা।
ছবি সৌজন্যে রঙ