স্বাধীনতার মাস :এরকম গণতন্ত্রের প্রত্যাশা করিনি
প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৩, ২১:২১
স্বাধীনতা ও বিশ্বায়ন এখন সমার্থক। বিশ্বায়ন নামের উদার হাওয়ায় খুলে যাওয়া পৃথিবী বাংলাদেশকে নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা তা টের পাচ্ছি। দেখছিও। আজকাল তথ্যের অবাধ প্রবাহ মানুষকে দৃষ্টির গভীরতা না দিতে পারলেও প্রসারতা দিয়েছে। প্রসারিত সে জগতে স্বাধীনতা কোন ফেলনা বস্তু নয়। সে যেমন মহার্ঘ্য তেমনি তার দায়-দায়িত্বও কম কিছু নয়। ২০০০ সালের নোবেল জয়ী সাহিত্যিক জাও হিন্ধিয়ান দীর্ঘকাল যাবত্ ফরাসি নাগরিক হলেও জন্মসূত্রে চৈনিক।
সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী জাও তার নোবেল বক্তৃতায় বলেছেন, স্বাধীনতা থাকে হূদয়ে এবং স্বাধীনতা নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। যদি কেউ কোন প্রাপ্তির জন্য স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেয় তাহলে সে স্বাধীনতা পাখি হয়ে উড়ে যাবে এবং এটাই স্বাধীনতার মূল্য। মিলিয়ে দেখুন আমাদের হূদয়ে যে স্বাধীনতা ও মুক্তি আকাঙ্ক্ষা তার সঠিক ব্যবহার হয়েছিল বলেই একাত্তরে পাকিস্তানের নাগপাশ ছিঁড়ে স্বাধীন হয়েছিলাম আমরা। হূদয়ের লালিত বাণী ও চেতনার ধারক হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। দীর্ঘকাল পর পরিবর্তিত দেশজ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটে সে স্বাধীনতা বা তার রূপ আগের মত নেই, সংবিধান ও অন্যান্য পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় আজ তার চেহারা অনেকটাই অন্য ধরনের। জাও হিন্ধিয়ানের বক্তব্যমতে, রাজনৈতিক বা ক্ষমতাসীন দলগুলোর ব্যবহারের কারণে আসলে তার চেহারাটাই গেছে পাল্টে।
এই পরিবর্তিত আদলটি যখন দ্বন্দ্ব আর বাস্তবতার কঠিন শৃঙ্খলে পড়ে অসহায় হয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না, তখনই বিশ্বায়ন নামের নতুন হাওয়া তাকে আরেক ধরনের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল। বিশ্বাস না হয় তো নিজেই দেখুন, কোন কালে আমরা এমন গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে গলা ফাটিয়েছি? এই দেশ যখন পূর্ব পাকিস্তান, সে আমলের লৌহকঠিন শাসক আইয়ুব খান বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটি বিষয় চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাঙালি তা খায়নি। তারপর একাত্তরপরবর্তী বাস্তবতায়ও পুরোটা গণতান্ত্রিক বলে কিছু ছিল না। যে দেশ যেমন যে তার মত করেই ধর্ম, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ সব মিলিয়ে দেশ শাসন করতো।
আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধে শাসিত সমাজ ও দেশে মিশ্র অর্থনীতিই ছিল বরাবর প্রধান ভূমিকায়। বাংলার মানুষ পুঁজিবাদী নয় আবার, সমাজতন্ত্রও মেনে নেয়নি। অর্থনীতির এই দ্বৈত সত্তার পাশাপাশি দেশ চলছিল পুরনো ধাঁচে। যদ্দিন না গণতন্ত্র নামের নতুন হাওয়া এসে দোলা দিয়ে গেল আমাদের। এই হাওয়ার দোলা সবচেয়ে বেশি লাগল আমাদের তারুণ্যে, যাদের আমরা মূলত ফেসবুকনির্ভর, মোবাইলনির্ভর বলে পাশ কাটিয়ে চলি।
আমাদের ধারণা ছিল তারা জাগতিক বিষয়ে উদাসীন। স্বাধীনতা, চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ নামের বিষয়ে তাদের টানে না। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ তারুণ্যের জয়-জয়কার সে ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। এটা যেমন সত্য, তেমনি স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী নামেও এক শ্রেণির তারুণ্যকে রাজপথে দেখছি আমরা। আমাদের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম মার্চ মাসটি আজ আত্মকলহে দীর্ণ। এমনই এক অবস্থা, বিশ্বায়ন, গণতন্ত্র আর নতুন জগতের চ্যালেঞ্জও প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ার পথে। আমাদের দেশের মেধা ও শ্রম যেভাবে জেগে উঠেছিল, যেভাবে উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল তাও কি থেমে যাবে?
বিশ্বায়ন ও নতুন দিনের যে ডাক, যে সম্ভাবনা তার সাথেই আছে ভয়। দুনিয়া খুলে যাবার কালে সবাই সবার হাঁড়ির খবর রাখে। যখন তখন ঢুকে পড়তে পারে। জুলিয়াস এ্যাসেঞ্জকে দেখুন, হাটে হাঁড়িভাঙ্গা কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। ফাঁক-ফোকর গলে ঢুকে পড়া মুরুব্বী ও বৃহত্ প্রতিবেশীও আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ। ভারত তার নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আমাদের উপকার করবে না। বরং আমাদের যে কোন উত্থানকেই ভয়ের চোখে দেখবে। আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি তার কাছে ঝুিঁকপূর্ণ মনে হলে ছেড়ে কথা বলবে না। বিশ্বায়নের এই দিকটি আমরা মনে রাখিনি। মনে রাখিনি প্রতিবেশী মিয়ানমারের চাপিয়ে দেয়া রোহিঙ্গা সমস্যা ও অমীমাংসিত বিষয়গুলো। আজ এর সব ক’টাই মুখ ব্যদান করে আমাদের প্রগতিকে গিলতে এসেছে।
স্বাধীনতার মাস, গর্বের মাস বললেও মার্চ আজ অসহায় এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি শুধু দেশের ভেতর বসবাসরত মানুষদের জন্য নয়, বহির্বিশ্বের বাংলাদেশিদের জন্যও প্রয়োজনীয়। দেশের প্রগতিশীল, ধর্মান্ধ, ধর্মীয় উদার-অনুদার, গণতন্ত্রী-অগণতন্ত্রী সব ধারাই বিদেশে সচল। এরও একটা সীমারেখা থাকা জরুরি। যেমন জরুরি শান্তি ও প্রগতির জন্য সকল উন্মাদনার কবর রচনা, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত দেশটির বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া তখনই সার্থক হবে যখন তার স্বাধীনতা সুরক্ষিত ও অর্থবহ হয়ে উঠবে। তারুণ্যকে সে ভাবনায় জাগিয়ে তোলাই গণতন্ত্র। অন্য কিছুতে নয়।
(সিডনি থেকে)