কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৩, ২১:০৯
বলিউডের জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান অভিনেতা সঞ্জয় দত্তকে পাঁচ বত্সরের কারাদণ্ড প্রদান করিয়াছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। সন্ত্রাসীদের নিকট হইতে অস্ত্র ক্রয় এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে তাঁহাকে এই সাজা প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য যে, ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে মুম্বাইয়ে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি স্থানে ১২টি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণে ২৫৭ ব্যক্তি নিহত হয়। আহত হয় আরও ৭ শতাধিক মানুষ। তখন এই হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে টাডা আইনে (টেরোরিস্ট অ্যান্ড ডিসরাপটিভ অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাক্ট) সঞ্জয় দত্তকে গ্রেফতার করা হইয়াছিল। তাঁহার বাড়ি তল্লাশি করিয়া লাইসেন্সবিহীন দুইটি অস্ত্রও পাওয়া গিয়াছিল। অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে টাডা আদালত তাঁহাকে ছয় বত্সরের কারাদণ্ড দিয়াছিলেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে সঞ্জয় দত্ত সুপ্রিম কোর্টে আপিল করিলে ১৮ মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনও পাইয়াছিলেন। তবে চূড়ান্ত রায়ে পাঁচ বত্সরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি চার সপ্তাহের মধ্যে আদালতে আত্মসমর্পণেরও নির্দেশ দিয়াছেন সুপ্রিম কোর্ট। একই দিনে আরও একটি চমকপ্রদ খবর প্রকাশিত হইয়াছে সংবাদপত্রে। সেইটি হইল, ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকাকালে বড়ো ধরনের একটি অর্থসংক্রান্ত মামলায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টিন ল্যার্গাডের প্যারিসের বাসায় তল্লাশি চালাইয়াছে সেই দেশের পুলিশ। লক্ষণীয় যে, দুইটি খবরের একটি হইল উন্নত দুনিয়ার, অপরটি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের। দেশ ও অবস্থানগত এই ভিন্নতা সত্ত্বেও খবর দুইটির অন্তর্নিহিত বার্তাটি অভিন্ন। সেইটি হইল, পেশাগত ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে। বলা বাহুল্য, আইনের শাসনের প্রতি এই অবিচল আস্থার কারণে ফ্রান্স যেমন উন্নতির শিখরে আরোহণ করিয়াছে, তেমনি নানা ঝড়ঝঞ্ঝা সত্ত্বেও দৃঢ়ভাবে আগাইয়া চলিয়াছে ভারত।
কেহই যে আইনের ঊর্ধ্বে নহে এবং আইনের শাসনের যে কোনো বিকল্প নাই—তাহা উন্নয়নশীল দেশগুলির শাসক ও নীতিনির্ধারকগণ ভালো করিয়াই জানেন। সভা-সমাবেশে প্রায়শ এইসব কথা বলিয়াও থাকেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাহাদের আচার-আচরণে ইহার সামান্যতম প্রতিফলনও খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। পরিহাসের বিষয় হইল, এইসব দেশে ক্ষমতার বাহিরে থাকা অবস্থায় সকলেই ব্যতিক্রমহীনভাবে জোরগলায় আইনের শাসনের দাবি তোলেন। ন্যায়বিচারের কথা বলেন। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেন। বিস্তর প্রতিশ্রুতিও দেন জনগণকে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তাহারা ভিন্নরূপ ধারণ করেন। বিগত শতকে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙিয়া স্বাধীনতাপ্রাপ্ত প্রতিটি দেশের চিত্রই কমবেশি অভিন্নই বলা চলে। সংবিধানে যতো ভালো ভালো কথাই লিপিবদ্ধ থাকুক না কেন, এইসব দেশে আইন চলে শাসকদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী। বাস্তবে এইখানে আইন অন্ধ নহে। সকলে সমান নহে আইনের চোখে। ক্ষমতাবানদের আইন যেই চোখে দেখে, ক্ষমতাহীনদের সেই চোখে দেখে না। ফলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি অকার্যকর হইয়া পড়ে। দেখা দেয় আস্থার সংকট। মাথা চাড়া দিয়া ওঠে অসহিষ্ণুতা। ইহাতে শুধু যে স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি ব্যাহত হয় তাহাই নহে, একই সাথে সংকটাপন্ন হইয়া পড়ে দেশের অস্তিত্বও। ইহা অনস্বীকার্য যে, উন্নয়নশীল দেশগুলি নানা সংকটে জর্জরিত। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই যে তাহাদের জন্য সর্বাপেক্ষা বড়ো চ্যালেঞ্জ তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। আইনের শাসনের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন উভয়ের অবস্থাই অত্যন্ত নাজুক। উন্নয়নশীল দেশের নেতৃবৃন্দ সময়োচিত প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হইলে পরিণাম যে কাহারো জন্য সুখকর হইবে না তাহা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।