নিশ্ছিদ্র
চৌবাচ্চাটি
কে বানাবেন?
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৩, ২১:১০
আমার ছোট ছেলেটি বেকার। পড়াশোনায় তেমন আগ্রহী না হলেও কম্পিউটারের হাত ভালো। বাস্তব অভিজ্ঞতায় একজন পাস করা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের অনেক যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু চাকরি জুটছে না। অবশ্য চাকরির জন্য এখনো অবধি তেমন উঠেপড়ে লেগে দরখাস্তই করেনি। দরখাস্ত করতে বললেই বলে, ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি হয় না, হবে না। ঘুষ না দিলে কোথাও চাকরি হবে না। তাই শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনে কিছুটা নিরুত্সাহীও বটে। শারীরিক যোগ্যতায় পুলিশে বা রেলওয়ের চাকরির কথা বললে ঐ একই কথা বলে—দাও ৫ লাখ টাকা, দেখ চাকরি পাই কিনা। সার্টিফিকেট অনুযায়ী বেশ কিছু ক্ষেত্রে ওর দরখাস্ত করারই যোগ্যতা নেই। তাহলে ওর যোগ্যতা কোথায় প্রয়োগ করার সুযোগ পাবে?
বন্ধুদের মুখেও শুনি, ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় না। রিটেনে ভালো করা কত প্রার্থী ঘুষ দিতে না পেরে ‘ভাইভা’ নামক বৈতরণীতে পিছিয়ে পড়ছে। অথচ কে ঘুষ খায়? খুঁজে বের করতে পারবেন দু-একজন? কোনদিনই পারবেন না। তবু এ কথা আজ ‘ওপেন সিক্রেট’ অমুক অধিদপ্তর, তমুক অধিদপ্তরের চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত ঘুষ খায়। নাম প্রকাশে অক্ষম দু-একজন বন্ধু তাদের পুত্রদের জন্য লাখ তিনেক টাকার বিনিময়ে চাকরি নামক সোনার হরিণ ধরে ফেলেছেন—এমনও শুনি। তাহলে এ প্রজন্ম জাতিকে কি উপহার দেবে? তারা কি এ প্রতিজ্ঞা নিয়েই চাকরিতে অনুপ্রবেশ করছে না যে, যত টাকা দিয়ে চাকরিতে ঢুকছি দু’বছরেই তা সুদে-আসলে দ্বিগুণ কি চতুর্গুণ করে তুলে আনতে হবে এবং সেভাবেই তারা টাকার ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটাবে। ঘুষ বীজ বপন করে কর্মক্ষেত্রে তো ঘুষ শস্যই উত্পাদিত হবে—এ শতভাগ সত্য। ঘুষ গ্রহণকারী হয়তো ভাবছেন, তার ব্যক্তিগত ক্ষতি কি? বরং আর্থিক লাভই হচ্ছে। কিন্তু দেশ? দেশ নিয়ে ভাববার অবকাশ তাদের কোথায়?
কোন কোন ক্ষেত্রে ঘুষ চাইতে হয় না, চেনা-চামুণ্ডাদের মাধ্যমে বড় কর্তার একাউন্টে তা আপসেই জমা হয়ে যাচ্ছে। শুনতে পাই, জনৈক সাব-রেজিস্ট্রার টাকা ছাড়া দলিলে সিগনেচার করেন না। তার বক্তব্য ৫ লাখ টাকা দিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকায় এসেছি কি এমনি এমনি? ঢাকায় এসেছি টাকা কামাতে। ৫ বছরে ৫ লাখকে ২৫ লাখ করতেই হবে। হতে পারে এটা মন্দলোকের বানানো মুখরোচক গল্প। কিন্তু আসল চিত্রটা তাহলে কি?
সরকারি-বেসরকারি এমনকি স্বায়ত্তশাসিত- আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং গার্মেন্টস ক্ষেত্রেও এখন সেলামি ছাড়া চাকরি জুটে না। গরিব নিঃস্ব দিনমজুরের একমাত্র বালিকা কন্যাটিকে ঠেলেঠুলে ঘুষ দিয়ে হলেও চাকরিতে পাঠাচ্ছে বহুবিধ কারণে। পরিশ্রম করে খাতা দেখবেন? সেখানেও খাতা আনতে উেকাচ না দিলে এক সময় খাতা মিলত না। সেক্ষেত্রে দু’বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও খাতা মিলত। তাহলে এই অনভিজ্ঞ শিক্ষক কতটুকু মূল্যায়ন করবেন ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তরপত্রের?
আচ্ছা বেশ, ঘুষ না দিন, যথাযোগ্য অভিজ্ঞতা তো চাই? সে কথা ঠিক। কিন্তু চাকরি না করলে অভিজ্ঞতা অর্জন হবে কিভাবে? সেক্ষেত্রে তো দেখছি অভিজ্ঞতার স্কুল খুলতে হচ্ছে সবার আগে। তাই প্রচলিত স্কুলগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামটাই বদলে কর্মমুখী শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করাটা কি জরুরি নয়? কেন এত যত্ন করে সারমর্ম, সারাংশ, ভাবসম্প্রসারণ, ব্যাখ্যা, শূন্যস্থান পূরণ, টেবিল মিলানো, চৌবাচ্চার অংক, বাঁশ-বানরের অংক কষা? ওদের মতো আমাকেও যে বলতে ইচ্ছে করছে, নিছক বাঁশে তেল না মেখে বানরকে উঠতে দিন, চৌবাচ্চায় ছিদ্র না করে নিশ্ছিদ্র চৌবাচ্চা বানাবার কারিগর তৈরি করুন। আছেন কি এমন প্রতিষ্ঠা, সত্ভাবে সত্কর্মী নিয়োগ করে দেশকে একটি সত্ আগামী উপহার দিতে, এ প্রজন্মকে কর্মে বহাল করে সত্ভাবে জীবিকা উপার্জনের সুযোগ করে দিতে এগিয়ে আসার? আমার মতো হাজার হাজার বেকার ছেলের বাবার দীর্ঘশ্বাসকে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ- বর্জনের এতটুকু সুযোগদাতার? আছেন কি তেলমসৃণ বাঁশের পরিবর্তে ঘন কোয়াবিশিষ্ট মই আর নিশ্ছিদ্র চৌবাচ্চার বন্দোবস্তকারী?
লেখক:সহযোগী অধ্যাপক ভালুম আতাউর রহমান খান কলেজ, কালামপুর, ধামরাই, ঢাকা