প্র জ ন্মে র এ ক জ ন
লিন্ডসের বেহালার জাদু
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪২
নিস্তব্ধ রাত, আজ হয়তো মনটাও একটু খারাপ। দিনের সব ব্যস্ততা শেষে রাতটাই যেন অনেকটা আপন। একাকী বসে আছেন চুপচাপ। হঠাত্ রাতের এই স্তব্ধতা ভেদ করে কোথাও বেজে উঠল বেহালার সুর। শুনতে শুনতে কখন যে হারিয়ে যাবেন চেনা এই জগত্ ছেড়ে অন্য কোথাও, টেরই পাবেন না। বেহালা বা ভায়োলিন নিয়ে এমন মুগ্ধতা আছে সবার। আর যারা এই ভায়োলিনের জাদুকর তাদের প্রতিও আমাদের ভালোলাগা কম নয়। এমনই এক জাদুকরের নাম লিন্ডসে স্টারলিং। তিনি ভায়োলিনের সুরের জাদু দিয়ে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে চলেছেন হাজারো শ্রোতাদের। ভায়োলিনের এই জাদুকরীকে নিয়ে লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
অ্যারিজোনার ছোট্ট সহর গিলবার্ট। শহরের অলিগলিতে দৌড়ে বেড়াত ছোট্ট একটা মেয়ে, লিন্ডসে স্টারলিং। শহরের পরিবেশটা ছিল খুবই মনোরম, ঠিক যেন রূপকথার গল্পের কোনো নগরী! গান-বাজনা আর সুরের মুর্ছনায় মেতে থাকত নগরবাসী। ছোট্ট লিন্ডসের সাথে তার বাবার সখ্যতাটা ছিল ঠিক বন্ধুর মতো। তারা একসাথে অনেকটা সময় কাটাতেন। তার বাবা একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন। খুব সকালে তিনি যখন ঘুম থেকে উঠতেন, ছোট্ট লিন্ডসেও তার সাথে বসে যেত সুরের সাধনায়। ধীরে ধীরে মায়াবী এই সুরের সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন লিন্ডসে। একসময় এই সুর যেন তার সাথে মিশে যায়। কখন যে নিজেও এই সুরের প্রেমিকা হয়ে গেছেন নিজেও ঠিক বলতে পারেন না। তিনি যখন গাইতেন, আশপাশের সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত তার সুরের জাদুতে। তার বয়স যখন মাত্র ৫ বছর, তার বাবা তার জন্মদিনে তাকে একটা বেহালা কিনে দিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু। আজ বেহালা তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। তিনি তার বাবার কাছে বেহালা শেখেন। ১৬ বছর বয়সে একটা ব্যান্ডের সাথে কাজ শেখার সুযোগ পান তিনি। তিনি ও তার চার বন্ধু মিলে ‘স্টর্ম অন মেলভিন’ নামের একটি ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ব্যান্ডের জন্য তিনি রক মিউজিক লেখা শুরু করেন। অংশ নেন অ্যারিজোনার জুনিয়ার মিউজিক্যাল ফেস্টিভ্যালে। তার সুরের জাদু দিয়ে এখানেও ছিনিয়ে আনেন জয়। এই প্রতিযোগিতার সেরা পুরস্কারটি জিতে নিয়েছিল তাদের ব্যান্ড। পরবর্তীতে তিনি অবশ্য নিজের এই ব্যান্ড ছাড়াও ‘চার্লি জেনকিনস’ নামের একটি ব্যান্ডে বাজাতেন।
ক্যারিয়ারের জন্য তিনি ও তার বন্ধুরা পাড়ি জমান আমেরিকাতে। সেখানেও তার জাদুতে মুগ্ধ করেন সবাইকে। সুযোগ পেয়ে যান সেখানকার এক মিউজিক কোম্পানিতে। বর্তমানে তিনি একাধারে একজন বেহালা বাদক, সুরকার ও সংগীতায়োজক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সুরের জাদু দিয়ে সবাইকে খুব সহজেই মাতিয়ে রাখতে পারেন তিনি। তার এই প্রতিভা নিয়ে ২০০৭ সালে বের হয় তার প্রথম অ্যালবাম ‘লিন্ডসে’স স্টম্প’। ইউটিউবে প্রথম মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তার এই অ্যালবামটি। এই অ্যালবাম দিয়েই প্রথম তিনি আমেরিকার মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে আত্মপ্রকাশ করেন। অ্যালবামটির জন্য কিছু মিউজিক ভিডিওর কাজও করেন তিনি।
২০১০ সাল, জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে গেছেন লিন্ডসে ও তার দল। আমেরিকা’স গট ট্যালেন্ট নামের একটি রিয়েলিটি শোয়ে পারফর্ম করার সুযোগ পান তিনি। সেখানে কোয়ার্টার ফাইনাল রাউন্ডে উঠে আসেন খুব সহজেই। সেখানে তিনি হিপ হপ ভায়োলিন বাদক হিসেবে খ্যাতি পান। এরপর সেই বছরই বেশ কিছু সিঙ্গেল গানও বের করেন তিনি। তার মিউজিক্যাল স্টাইলের মধ্যে ক্লাসিক্যাল, পপ ও হিপ হপও রয়েছে। এ ছাড়াও তিনি বেশ কিছু বড় শিল্পীদের গানের ট্র্যাক নিজের মতো করে গাইতেন। ‘ইলেক্ট্রিফাইয়িং’ নামের একটি অ্যালবামে গান গাওয়ার জন্য বেশ ভালো সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। তবে ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে পিয়ার মর্গান নামের এক জাজ তাকে বলেছিলেন, ‘তোমার মধ্যে ট্যালেন্ট নেই কিন্তু তুমি ভায়োলিন হাতে তোমার সুর দিয়ে যে কাউকে নিয়ে যেতে পারও অন্য এক ভুবনে।’ তিনি আশা করেছিলেন ট্যালেন্ট হান্টের এই প্রোগ্রামে তিনি সফলতা পাবেন। তবে জিততে না পারায় অনেক বেশিই হতাশ হয়েছিলেন তিনি। একবার এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘অনেকে আমাকে আশাহত করেছিল। নির্দেশনা দিয়েছিল পথ চলার, তাদের মতো করে কাজ করার। কিন্তু আমি তাদের কথায় হতাশ হলেও থেমে যাইনি কখনোই। আজ আমি সফল তার পেছনে মূল কারণ আমার ভালোবাসা। নিজের ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস ছিল আমার।’
এরপর দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল আরও কয়েক বছর। ২০১২ সাল, এর মধ্যে তার আরও কিছু অ্যালবাম বের হয়। সেগুলো বেশ ভালোই জনপ্রিয়তা পায়। কয়েকবার টপচার্টেও উঠে আসে তার অ্যালবামগুলো।
২০১৩ সাল, তিনি এখনও তার জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সুরের জাদু দিয়ে মুগ্ধ করে যাচ্ছেন সবাইকে। সম্প্রতি, রাশিয়া, কানাডাসহ আরও কয়েকটি দেশে কনসার্ট ট্যুরের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তার অন্যান্য নিয়মিত ট্যুরগুলোও রয়েছে অব্যাহত।