[ রা জ নী তি ]

স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন

এটি একটি আনন্দের সংবাদ যে, স্থানীয় সরকার নিয়ে আমাদের দেশে আবার ‘হাই প্রোফাইল’ আলোচনা হচ্ছে। ২০ ও ২১ মার্চ ঢাকায় দু’দিনের ‘আন্তর্জাতিক স্থানীয় সরকার সম্মেলন-২০১৩’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলন উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। সমাপনী দিনে বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভাষণ দেয়ার কথা থাকলেও, সেদিন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে শোক দিবসের কর্মসূচি থাকায় তিনি সম্মেলনে গিয়ে বক্তৃতা করেননি। তবে প্রতিনিধিরা তাঁর সাথে দেখা করে তাঁর বক্তব্য জেনে নিয়েছেন। দেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ দণ্ড প্রদান ও জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধকরণের দাবিতে উত্তাল গণজাগরণ চলছে এবং তার বিরুদ্ধে বিএনপির মদতে জামাত-শিবিরের দানবীয় সন্ত্রাসী তাণ্ডব পরিচালিত হচ্ছে এবং এসব কারণে যখন মানুষের মনে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা ও ভবিষ্যত্ নিয়ে ভীতি দানা বেঁধেছে, তেমনি এক তালমাতাল ও অনিশ্চিত নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেও স্থানীয় সরকারের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে ‘হাই প্রোফাইল’ আলোচনা হতে পারাটা একটি খুবই শুভ ঘটনা। জনজীবনের সাথে সম্পৃক্ত ও জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে যুদ্ধাপরাধী ও জামাত-শিবির ইস্যুর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পেন্ডিং রাখা যেতে পারে না। বরঞ্চ একথাই সত্য যে, উভয় ধরনের ইস্যু পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত। প্রথম ধরনের ইস্যুর ইতিবাচক নিষ্পত্তির স্বার্থেই দ্বিতীয় ধরনের ইস্যুগুলো সমাধানের আন্দোলন সচল রাখা ও অগ্রসর করা অত্যাবশ্যক। যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও জামাত-শিবির নিষিদ্ধকরণের জন্য লড়াই এবং জনগণের ভাত-কাপড়, রুটি-রুজি, সাম্রাজ্যবাদের শোষণ থেকে মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনার জন্য সংগ্রাম—এ দু’টি হলো একই লড়াইয়ের এপিঠ আর ওপিঠ। বর্তমানে বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন— এগুলোই হলো স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠানগত সংস্থা ও কাঠামো। গ্রাম সরকার নামে একেবারে তৃণমূলে স্থানীয় সংস্থা করার সুপারিশও অনেকে দিয়ে থাকেন। অন্যরা বলেন যে, সে কাজটি ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার ওয়ার্ডের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই সম্পাদন করা সম্ভব। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা তিন স্তরের নাকি চার স্তরের হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আসল দ্বন্দ্ব হলো স্থানীয় সরকারের বাস্তব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কতটুকু থাকবে—সে বিষয়টি নিয়ে। সাধারণত আলোচনাটি আসে এদিক থেকে যে, ক্ষমতা তো থাকবে রাষ্ট্রের একক কেন্দ্রে, কারণ আমাদের দেশ একটি এককেন্দ্রিক (unitary) ক্ষমতা কাঠামোর দেশ (অর্থাত্, federative তথা যুক্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নয়)। সুতরাং কেন্দ্র তার ক্ষমতার কিয়দাংশকে স্থানীয় সরকারের হাতে প্রদান করলেও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকবে একক কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। কেন্দ্রের হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই অবশিষ্ট (residual) ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের হাতে অর্পণ করা যেতে পারে। এরূপ প্রস্তাবনার বিপরীতমুখী ধারণা হলো—ক্ষমতার ভিত্তি হবে তৃণমূলের স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার সংস্থাসমূহ। তারা তাদের বাস্তব প্রয়োজনে কিছু অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ (প্রতিরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা, জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি-খনিজ-বিদ্যুত্, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক সম্পর্ক ইত্যাদি) বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকারকে স্বেচ্ছায় প্রদান করবে। এরূপ ধারণায় কেন্দ্রীয় সরকার হলো স্থানীয় সরকার সংস্থাসমূহের কাজের সহায়ক ঊর্ধ্বতম সমন্বয় কর্তৃপক্ষ। এই ধারণাগত বিতর্কে না গিয়েও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক মতপার্থক্যটি হলো, কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা বাস্তবে কি হবে। স্থানীয় সরকারের বিষয়টি সরকার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের’ কর্তব্যের সাথে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি স্বৈরতান্ত্রিক হয়, সেক্ষেত্রে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মর্মার্থ হয়ে উঠবে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ও বৈরি স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীভূত সম্প্রসারণ। সে ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী ক্ষমতা- কেন্দ্রের ভিত্তিটি তার প্রসারিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে জোরদার হবে, জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন অগ্রসর না হয়ে বরঞ্চ তা আরো সংকুচিত হবে। সে কারণেই ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের’ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অপরিহার্য শর্ত হলো, প্রথমতঃ নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা সংস্থা পরিচালিত হবে সে বিষয়ে নিশ্চয়তা এবং দ্বিতীয়তঃ গোটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক শাসনের ধারার উপস্থিতি। স্থানীয় সরকার যেহেতু একদিকে ‘স্বশাসিত’ তথা নির্বাচিত এবং অন্যদিকে ‘সরকার’। তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিষয়টি সে কারণে এই উভয়দিক থেকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। একদিকে, নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও ‘অধিকতর মর্যাদাসম্পন্ন নির্বাচিত প্রতিনিধি’ বলে দাবিদার জাতীয় সংসদের মাননীয় সাংসদদের নিকট থেকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সরকারের ঊর্ধ্বতন স্তরের ‘বড় কর্তাদের’ দ্বারা পরিচালিত আমলাতান্ত্রিক কৌলিন্য ব্যবস্থা ও তার নিয়ন্ত্রিত তৃণমূলের আমলা ব্যবস্থার ‘ছোট কর্তাদের’ থেকে চ্যালেঞ্জ। এক পক্ষ ভেবে থাকে যে, আমরাই তো ‘আসল’ নির্বাচিত প্রতিনিধি, তোমরা আবার কে? হ্যাঁ, তোমরা নির্বাচিত হয়ে থাকলেও সেই নির্বাচন ‘কম দামের’, তাই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তোমরা জাতীয় সংসদ সদস্যদের অধীনস্থ জুনিয়র পার্টনার মাত্র। অপরপক্ষ ভাবে যে, তোমরা যেহেতু ‘সরকার’ তাই তোমরা দেশের ইউনিটারি সরকার ব্যবস্থার কর্তৃত্বের একটি তৃণমূলের অংশ মাত্র। তোমাদেরকে ‘আসল’ সরকারের নির্দেশ, যা কিনা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে উপর থেকে নিচ বরাবর প্রবাহিত হয়, মেনে চলতে হবে। তাই একথা বলা যায় যে, দুই গালে তুই তরফের বিরাশি সিক্কা ওজনের চপেটাঘাত খেয়ে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আজ চিত্পটাং হওয়ার অবস্থা হয়েছে। একদিক থেকে ‘এমপিতন্ত্রের’ দড়াম্ ঘুষি, অন্যদিকে ‘আমলাতন্ত্রের’ শক্তিশেল। এমপিতন্ত্র ও আমলাতন্ত্র এই দু’তরফের দ্বিমুখী আক্রমণের মুখে পড়ে স্থানীয় সরকারের এখন মরণ দশা উপস্থিত হয়েছে। গত বুধবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক স্থানীয় সরকার সম্মেলন-২০১৩’ উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক কথার মধ্যে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ যে কথাটি বলেছেন তা হলো, ‘সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারকে নীতি প্রণয়ন, তদারকি বা বাজেট প্রণয়নে সম্পৃক্ত রাখা। অপরদিকে সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করবে স্থানীয় সরকার। কিন্তু এ জন্য গণতন্ত্রের স্থায়ী ধারার প্রয়োজন রয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী একেবারে সঠিক কথাগুলোই বলেছেন। স্থানীয় সরকারের প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্পর্কে ধারণাটি আরো সুনির্দিষ্ট করতে হলে তাকে তাঁর বক্তব্যের সাথে যোগ করতে হতো, (১) পার্লামেন্টের দায়িত্ব হলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ তদারকী করা ও দেশের জন্য আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা, (২) আমলাতন্ত্রের কাজ হলো রাজনৈতিক সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা এবং (৩) সব ক্ষেত্রেই আমলাতন্ত্রের কর্তব্য হলো স্ব স্ব স্তরের নির্বাচিত কেন্দ্রীয় অথবা সংশ্লিষ্ট নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা, সেই সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট প্রণয়নের অধিকারের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের জন্য সংবিধিবদ্ধভাবে ৩৩%-৫০% বরাদ্দ বাধ্যতামূলক করার শর্তের উল্লেখ করলে প্রধানমন্ত্রী আরো ভাল করতেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পর্কে সবচেয়ে মূল্যবান ফর্মুলাটি উল্লেখ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাতে হয়। স্থানীয় সরকার সম্পর্কে অথবা অন্যান্য অনেক বিষয় সম্পর্কে অনেক ভালো-ভালো কথাই হর-হামেশা বলা হয়ে থাকে। এগুলোর বাস্তবায়ন অবশ্য তেমন হয় না। দেশের মানুষ সেগুলো শুধু শুনে শুনে বিরক্ত হতে হতে আস্থাহীন-হতাশ হয়ে পড়েছে। আসলে সবগুলো বিষয়ের ক্ষেত্রেই সেগুলো বাস্তবায়নের সাথে শ্রেণিস্বার্থ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত। স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। তাই আকাঙ্ক্ষিত পথে যদি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়, অথবা যদি অন্যান্য প্রকৃত কোনো গণমুখী ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হয়, তাহলে কায়েমী স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে তীব্র শ্রেণিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন ব্যতীত তা সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার সম্পর্কে দেশের সংবিধানেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। কিন্তু তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি, হয় না। অবস্থাটি যেন এমন যে, বাস্তবায়ন হলে হোক না হলে না হোক, কথা যখন বলবো তখন ‘সেরা’ কথাগুলো বলবো না কেন? ‘মারি তো হাতি, লুটি তো ভাণ্ডার!’ ভাবটা অনেকটা সেরকম। স্থানীয় সরকার সম্পর্কে সংবিধানে কি আছে সেদিক একটু নজর দেয়া যাক। প্রথমেই দেখা যাক, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি শিরোনামে এ বিষয়ে কী লেখা আছে? এখানে ৯ নং ধারায় লেখা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উত্সাহ দান করিবেন...’। এখানে ‘সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি’ এবং তাদের ‘সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান’ শব্দগুলো থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে এ বিষয়ে মর্মকথা স্পষ্ট হয়ে যায়। তার পরে ১১ নং ধারায় গণতন্ত্র প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ‘... এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ এখানে বিষয়টি আরো সুনির্দিষ্ট হয়েছে ‘সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে’ শব্দগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে। অবশ্য সংবিধানের এসব বয়ান সম্পর্কে কেউ বলার চেষ্টা করতে পারেন যে, এগুলো তো রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কিত কথা। এসবই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এসব এখনই অনুসরণ করতে হবে, সংবিধানে তেমন কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। কথা সত্য। তা হলে দেখা যাক, সংবিধানের অন্যত্র কী বলা আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবিধানের চতুর্থ ভাগের (নির্বাহী বিভাগ সংক্রান্ত ভাগ) তৃতীয় পরিচ্ছেদে ‘স্থানীয় শাসন’ শিরোনামে যে কথাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে যা বলা হয়েছে, তা আইনত বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণীয়। এখানে ৫৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনভার প্রদান করা হইবে।’ এখানে ‘প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসন ভার’ শব্দের দ্বারা স্পষ্টতই স্ব-স্ব ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌর এলাকা ইত্যাদির কথাই বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় শাসনের ভার কার ওপর অর্পণের কথা বলা হয়েছে? সে সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর’। অর্থাত্ ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ইত্যাদি সংস্থাগুলো নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হতে হবে। এসব থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, ইউনিয়ন স্তরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্য, উপজেলা স্তরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য, জেলা স্তরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ পরিষদের সদস্যবৃন্দ ইত্যাদির ওপর সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় শাসনভার অর্পিত হবে। এসব কোনো স্তরের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেই সংসদ সদস্য অথবা ইউএনও-কে কর্তৃত্ব প্রদানের প্রশ্ন কোনোক্রমেই আসতে পারে না। স্থানীয় সকারের কর্তৃত্ব সম্পর্কিত সংবিধানে উল্লিখিত বিধান দেশের বুর্জোয়া দলগুলো বাস্তবায়ন করেনি। তারা তা করবে না, কারণ তা বাস্তবায়নের যোগ্যতা তারা রাখে না। লুটেরা ধনতন্ত্রের যে ধারায় তারা দেশ চালাচ্ছে তার সাথে জনগণের স্বার্থের মৌলিক দ্বন্দ্ব বিরাজ করে। তাই, জনগণের ক্ষমতায়ন ও সেই লক্ষ্যে ক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ বুর্জোয়া দলগুলোর মৌলিক স্বার্থ হানিকর। লুটেরা ধনবাদের ধারায় বুর্জোয়া দলগুলোর শাসন এবং স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন— এ দু’টি বিষয় হলো পরস্পর বৈরী, তথা এ্যান্টিথিসিস। স্থানীয় সরকারের ইস্যুটি তাই স্পষ্টতই লুটেরা ধনতন্ত্রের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সমাজ বিপ্লব সংগঠিত করার কর্তব্যের সাথে জড়িত। সমাজ বিপ্লবের কর্তব্য সম্পাদনের জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রশ্নটি একটি নির্ধারক ইস্যু। রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অন্য অনেক বিষয়ের সাথে সাথে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের ইস্যুতে সমাজবিপ্লবীদেরকে তাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সংগ্রাম করতে হবে। সমাজ বিপ্লবের জন্য যেটুকু পার্লামেন্টারি সংগ্রাম চালানোর সুযোগ আছে তা করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রকের অবস্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য ও সেগুলোর প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য প্রচেষ্টার প্রতি সমাজ বিপ্লবের কর্মীদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : selimcpb@yahoo.com