প্রেরণার নাম ‘অমি ভাই’!

তামিম ইকবালের অনুপ্রেরণা কে হতে পারেন? সেই ভিভ রিচার্ডস থেকে শুরু করে এই যুগের শেন ওয়াটসন; অনেকের কথাই কল্পনা করতে পারেন। এমনকি ভাবতে পারেন যে, তার অনুপ্রেরণা বুঝি নিজেরই দলের মোহাম্মদ আশরাফুল। কিন্তু, না। আপনার অনুমান শতভাগই ভুল হওয়ার কথা। কারণ প্রায় তিন বছর পর পাওয়া সেঞ্চুরির পেছনে তামিম ইকবালের অনুপ্রেরণা ছিলেন নাকি জহুরুল ইসলাম! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন; ব্যাটিং স্টাইলের এই ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’ পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ঠ মানুষ। আর সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে আগের রাতে দু’জনের কথোপকথনই নাকি তামিমকে এই সেঞ্চুরিটার পথে এগিয়ে দিয়েছে। ফলে সেঞ্চুরি করে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ‘অমি ভাই’কে। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস। তামিমের জন্যই প্রথম ওয়ানডেতে বাইরে বসে থাকতে হয়েছিল জহুরুলকে। আরও পরিহাস বাকী ছিল। তাই আজ সেই তামিমের বদলেই জহুরুলের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাঠে নামা একরকম নিশ্চিত! এখন জহুরুল যদি তামিমের শোককে শক্তিতে পরিণত করে একটা সেঞ্চুরি করতে পারেন; তাহলেই শোধবোধ হয়! তামিমের ব্যাপারটা আসলেই ‘শোক’-এ পরিণত হয়েছে। সেঞ্চুরি করে দলকে বেশ ভালো একটা পুঁজি এনে দিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিলকরত্নে দিলশানের দাপুটে সেঞ্চুরিতে ফ্লাড লাইট বিড়ম্বিত ম্যাচে শ্রীলঙ্কা আট উইকেটের জয় পেয়েছে। তারপরও বেশি দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে তামিমের ইনজুরি। আজ তামিমের জায়গা নিতে জহুরুলের দলে ঢোকা একরকম তাই নিশ্চিতই বলা যায়। কিন্তু গতকাল হাম্বানটোটায় ঐচ্ছিক অনুশীলনে এসে সাংবাদিকদের জহুরুল বললেন, তার আসলে ‘আরেকজন তামিম’ হওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। তিনি সুযোগ পেলে নিজের খেলাটা খেলতে চান, ‘তামিমের বিকল্প হওয়া আমাদের কারো পক্ষেই সম্ভব না। আমি সুযোগ পেলেও তামিমের মতো খেলার চেষ্টা করবো না। আমি নিজের খেলাটাই খেলতে চাই।’ তবে জহুরুল ব্যাটে তামিমের মতো হতে না পারলেও বুদ্ধি দেয়ার ক্ষেত্রে যে তার থেকেও ভালো; সেটা তামিমই আগেরদিন বলে গেছেন। সেঞ্চুরির পর প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে প্রথমেই জহুরুলকে স্মরণ করেছিলেন তামিম, ‘এই সেঞ্চুরির পেছনে অমি ভাইয়ের আসলে অনেক কৃতিত্ব আছে। কাল (ম্যাচের আগের দিন) রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত আমি আর অমি ভাই কথা বলেছি। উনি আমার ব্যাটিং নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট বলেছেন। মাঠে সেটা আসলেই খুব কাজে লেগেছে।’ শুধু ওই রাতেই নয়। পানি খাওয়াতে এসেও জহুরুল নাকি অনেক বুঝিয়েছেন। তামিম বর্ণনা করছিলেন, ‘উনি এসে আগের রাতের কথা মনে করিয়ে দিলেন। বললেন, ফিফটি নয়, সেঞ্চুরি করতে হবে। উনি বলছিলেন, ৪০ ওভার খেললে আমি সেঞ্চুরি পাবো। ফলে আমার সেটা করা উচিত। আসলে উনি যেমন কথাবার্তা বলেছেন; তাতে এই সেঞ্চুরির জন্য ওনারই ধন্যবাদ পাওয়া উচিত। তার প্রতিটা কথা কাজে লেগেছে।’ কাজে যে লেগেছে; তা তো দুনিয়াই সাক্ষী। কিভাবে কাজে লাগিয়েছেন, সেটাও বলে শুনিয়েছেন তামিম। ইনিংসটা কিভাবে সেঞ্চুরিতে পৌঁছালো, তা বর্ণনা করছিলেন, ‘ফিফটিতে পৌঁছানোর পর আমি প্রতিটা বল খেলার সময় নিজের সঙ্গে কথা বলেছি। শান্ত থাকতে চেয়েছি। কিন্তু এর মাঝে একটা বাউন্ডারি মারার পরই আমার শরীরে কেমন যেন বিদ্যুত্ বয়ে গেল। একটা ক্যাচ দিয়ে বেঁচে গেলাম। রিয়াদ ভাই এসে বললো, আগে সত্তর করে তারপর কী করবি, ভাব। এরপর নাসির এসেও খুব সাপোর্ট দিল।’ এই টুকরো টুকরো সমর্থনই তামিমকে পৌঁছে দিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আরেকটা সেঞ্চুরিতে। তামিমের দীর্ঘমেয়াদে যে লক্ষ্য, সেই পথে সেঞ্চুরিটার বড় দরকার ছিল। তামিম নিজেই লক্ষ্যটা বার বার মনে করিয়ে দেন, ‘আমি কাকে যেন একবার বলেছিলাম, বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানদের একজন হতে চাই। এখনও আমার লক্ষ্য তাই। সে জন্য এরকম ইনিংস খেলতে হবে।’ দুর্ভাগ্য তামিমের, দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই তামিমকেই আর পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এ নিয়ে বাংলাদেশ শিবির নিশ্চয়ই হতাশাগ্রস্ত। তবে দলটির কোচ শেন জার্গুনসেন বলছেন, এটা বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ম—ইনজুরির মহামারীতে মাঝে মাঝে পড়তেই হয়। আর জহুরুল বললেন, এতো কিছুর পরও শ্রীলঙ্কা জয় করে ফেরা এখনও সম্ভব, ‘হ্যাঁ ইনজুরি বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও আমরা যেমন খেলছি; একসঙ্গে সব ডিপার্টমেন্টে তেমন ভালো করতে পারলে পরের ম্যাচেই জয় পাওয়া সম্ভব।’ এখন সেই আশায় বুক বাধার তো বিকল্প নেই।