আরও দুইটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৩, ২১:০৯
অকালে ঝরিয়া পড়িয়াছে আরও দুইটি নিষ্পাপ নিরপরাধ শিশুর জীবন। বড়ো করুণ, বড়োই মর্মান্তিক এই মৃত্যু। কোনো পাষাণহূদয় মানুষের পক্ষেও এই মৃত্যু সহ্য করা সম্ভব নহে। চার বত্সর বয়সী শিশু রিয়া তাহার আট বত্সর বয়সী খালা কুলসুমের সাথে বাসার সিঁড়িতে খেলা করিতেছিল। আচমকা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় দুইটি ককটেল। স্প্লিন্টারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হইয়া যায় শিশু দুইটির কচি দেহ। প্রায় বিচ্ছিন্ন হইয়া যায় তাহাদের হাতের কবজি। হূদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটিয়াছে গত রবিবার মিরপুর ১৩ নম্বর সেক্টরে। ঘটনাস্থলে একটি বাজারের ব্যাগ এবং ককটেলের কিছু আলামত পাওয়া গিয়াছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, নাশকতায় ব্যবহারের জন্য সেইখানে ককটেল লুকাইয়া রাখা হইয়াছিল। অবুঝ শিশুরা সেই ককটেল লইয়া খেলার সময়ে তাহা বিস্ফোরিত হইয়াছে। ককটেলগুলির উত্স জানা না গেলেও শিশু দুইটিও যে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হইয়াছে তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। প্রতিকার তো দূরের কথা, সামান্য সান্ত্বনাটুকু পর্যন্ত নাই এই মৃত্যুর। হতভাগ্য পিতামাতার হূদয়ের অন্তহীন রক্তক্ষরণ থামাইবার ক্ষমতা আমাদের নাই। নাই নিন্দা প্রকাশের মতো যথোপযুক্ত ভাষাও।
অনভিপ্রেত এই মৃত্যু আমাদেরকে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো রাজনৈতিক সহিংসতাকবলিত দেশগুলির কথা মনে করাইয়া দেয়। মাইন কিংবা বোমার বিস্ফোরণ সেইখানে নৈমিত্তিক ঘটনা। মাইন বিস্ফোরণে কতো শিশুর প্রাণহানি ঘটিয়াছে কিংবা কতো শিশু বিকলাঙ্গ হইয়া পড়িয়াছে—তাহা লইয়া এখন আর কেহ মাথাও ঘামায় না। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই অসহনীয় অবস্থা চলিয়া আসিতেছে। লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার সামপ্রতিক চিত্রও ভিন্ন নহে। বাস্তবতা হইল, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণ যাহাই হউক না কেন—শিশু ও নারীরাই যে ইহার সবচাইতে বড়ো ভিকটিম বা ভুক্তভোগী তাহা সর্বজনস্বীকৃত। সহিংসতার সাথে শিশুদের সামান্যতম সম্পর্ক না থাকিলেও তাহাদেরকেই ইহার কুফল ভোগ করিতে হয়। সহিংসতার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যাহারা দায়ী, তাহারা যে বিষয়টি বোঝেন না তাহা নহে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, রাজনৈতিক সহিংস পরিস্থিতি আপনাআপনি সৃষ্টি হয় না। সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যখন তাহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিস্মৃত হইয়া সংকীর্ণ স্বার্থের জালে জড়াইয়া পড়েন তখনই এই ধরনের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাহারা ভুলিয়া যান যে, শিশুদের জন্য দেশকে নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য রাখা তাহাদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।
অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, আমরাও যেন সজ্ঞানেই রাজনৈতিক সহিংসতার সেই আত্মঘাতী পথেই পা বাড়াইয়াছি। সংশ্লিষ্ট সকলেরই সংঘাতকবলিত দেশগুলির অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। অন্যথায় অসহায়ভাবে অনুরূপ বেদনাদায়ক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করা ছাড়া তাহাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকিবে বলিয়া তো মনে হয় না।