পোলিও টিকা কর্মসূচি প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৮
প্রায় ষাট বত্সর ধরিয়া চলিয়া আসা পোলিও টিকা কর্মসূচি মুখ থুবড়াইয়া পড়িবার উপক্রম হইয়াছে। ছয় দশকের ব্যবধানে বিশ্বের অনেক দেশেই এই রোগ নির্মূল হইয়া গিয়াছিল। বত্সর দুয়েক আগে পর্যন্ত ভারতে নূতন করিয়া কাহাকেও এই রোগের শিকার হইতে শোনা যায় নাই। সেই অর্থে বলা যায় রোগটি নির্মূল করা সম্ভবপর হইয়াছিল। অন্য আরও অনেক দেশে পোলিও পুরাপুরি উচ্ছেদ করা সম্ভব না হইলেও ইহার প্রকোপ হ্রাস পাইয়া ছিল। কিন্তু গত দুই বত্সর ধরিয়া পরিস্থিতির অবনতি ঘটিতে শুরু করিয়াছে। ইহার একটি বড় কারণ তহবিল সংকট। অবশ্য এই সমস্যার স্বরূপটি কি রকম, সে সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় নাই। তবে অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও আরও কিছু পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতা পোলিও টিকা কর্মসূচির স্বাভাবিক গতি রোধ করিয়া দিয়াছে বলিয়া সংবাদসূত্রে দাবি করা হইয়াছে। কোনো কোনো মহল ইহার মধ্যে দেখিতে পাইতেছেন ষড়যন্ত্রের আলামত। পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ায় নাকি এই মর্মে প্রচারণা চালান হইয়াছে যে, পোলিও টিকার নামে মুসলমানদের বন্ধ্যা করিয়া দেওয়া হইতেছে। এইরূপ সন্দেহের বশবর্তী হইয়া কোনো কোনো অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির কর্মীদের উপর হামলা চালাইবার ঘটনা ঘটিয়াছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক হইলেও এই ধরনের প্রচারণার পিছনে কোনো কার্যকারণ নিহিত নাই, তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা কঠিন। তবে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি অনভিপ্রেত এবং হতাশাব্যঞ্জক।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পোলিও কর্মসূচির মুখপাত্র ওলিভার রোজেনবুয়ের বলেন, ভারতের সফলতা বিবেচনায় নিলে এই কথা বলা যায় যে, পোলিও নির্মূল করা সম্ভব। এই রোগের ভাইরাসটি সমূলে উত্পাটন করা না গেলে ভবিষ্যতে রোগটি আবারও মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। প্রসঙ্গত বলা বাঞ্ছনীয় যে, পোলিও এমন একটি রোগ যাহা হঠাত্ করিয়া মানুষের কর্মক্ষমতা কাড়িয়া নেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁটাচলার ক্ষমতা হারাইয়া ফেলেন। প্রকৃতপক্ষে এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি নিপতিত হন অলঙ্ঘনীয় অসহায় অবস্থায় । ভাইরাসে আক্রান্ত হইবার পর এই রোগের কোনো চিকিত্সাও নাই। কিন্তু শৈশবে পোলিও টিকা নেওয়া হইলে এই রোগে আক্রমণের আশংকা থাকে না বলিলেই চলে। ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রোধ করা যায়। আমাদের দেশে ষাটের দশকে ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ করা সম্ভব হইয়াছিল । ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ অভিযান নামে একটি প্রকল্পও চালু ছিল তখন। বাড়ি বাড়ি গিয়া কর্মিগণ রক্ত সংগ্রহ করিতেন, নিয়মিত পরীক্ষা করিয়া রিপোর্ট দেওয়া হইত। পাশাপাশি চালু ছিল মশক নিধন অভিযান। এই প্রক্রিয়ায় তখন ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ করা গেলেও এখন আবার ফিরিয়া আসিয়াছে। গুটিবসন্তও এখন আর সেইভাবে নাই। আছে চিকেন পক্স। পলিও আক্রান্তের হারও বাংলাদেশে হ্রাস পাইয়াছে। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়াছে তাহাতে বিচলিতবোধ না করিয়া পারা যায় না। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়া কোনোরূপ অপপ্রচার কাম্য নয়। এই ব্যাপারে জনসাধারণেরও সচেতনতা প্রয়োজন। পোলিও টিকা কর্মসূচি অব্যাহত রাখিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করিতে হইবে। প্রতিটি দেশের সরকারকেও কর্মসূচি চালু রাখার সাথে সাথে জনসচেতনতা সৃষ্টির নিমিত্ত কার্যক্রম চালাইয়া যাইতে হইবে।