শিশু পরিবারে শিশুদের সহিত অমানবিক আচরণ

সরকার পরিচালিত শিশু পরিবারেই অমানবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হইতেছে শিশুদের। তাহাদের মাধ্যমেই চলিতেছে পরিবারভুক্ত ৫০টি শিশুর তিন বেলার রান্নার কাজ। এই কাজ করিতে গিয়া শিশুরা শুধু যে প্রতিনিয়ত চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হইতেছে তাহাই নহে, সেই সাথে ব্যাহত হইতেছে তাহাদের লেখাপড়াও। উদ্বেগজনক এই খবরটি প্রকাশিত হইয়াছে গত বুধবারের সংবাদপত্রে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, বেশিরভাগ সরকারি শিশু পরিবারের চিত্রই প্রায় অভিন্ন। উল্লেখ্য যে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় সারাদেশে ৮৫টি শিশু পরিবার রহিয়াছে। তন্মধ্যে শুধু মেয়েদের জন্যই আছে ৪২টি পরিবার। কমপক্ষে ৪০ জন এতিম শিশু লইয়া একেকটি পরিবার গঠিত হয়। ছয় বত্সর বয়স হইতে তাহারা এইখানে ভর্তির সুযোগ পায়। থাকিতে পারে ১৮ বত্সর বয়স অবধি। উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে অনাথ ও অসহায় এই শিশুগুলিকে কর্মক্ষম নাগরিক হিসাবে গড়িয়া তোলা হয়। এই ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রশংসনীয় সাফল্যও রহিয়াছে। তবে প্রায় অর্ধশত শিশুর জন্য নিয়মিত রান্না করিবার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে গুটিকয় শিশুকে নিয়োজিত করিবার বিষয়টি সংস্থাটির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করিয়া তুলিয়াছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান একটি শিশু পরিবার পরিদর্শন করিতে গিয়া শিশুদের দিয়া রান্না করাইবার বিষয়টিকে অমানবিক বলিয়া মন্তব্য করিয়াছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে এইসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বাবুর্চির পদও সৃষ্টি করা হইয়াছিল। পরিতাপের বিষয় হইল, ইতিমধ্যে তিন বত্সর অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় নাই। কেন হয় নাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই তাহা ভালো বলিতে পারিবেন। সমস্যাটি সংশ্লিষ্ট সকলেরই জানা। শিশুদের দিয়া এতো বিপুল পরিমাণ রান্নার কাজটি যে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক— সমাজসেবা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাহা অকপটে স্বীকার করিয়াছেন। এই ব্যাপারে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুনির্দিষ্ট সুপারিশও রহিয়াছে। তাহা সত্ত্বেও শিশু পরিবারগুলিতে দীর্ঘদিন যাবত্ বাবুর্চি নিয়োগ না হইবার বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনকই বলিতে হইবে। বিশেষ করিয়া শিশুদের নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্নে সরকারের সংকল্প ও সদিচ্ছার বিষয়টি কাহারো অজানা নহে। এই লক্ষ্যে শিশু অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের সহিত সঙ্গতি রাখিয়া নূতন একটি নীতিমালাও গৃহীত হইয়াছে সম্প্রতি। সর্বোপরি, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও শিশুশ্রম নিরসনসহ নানা ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হইয়াছে। শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর বিধি-নিষেধের বিষয়টি যেইখানে দীর্ঘদিন যাবত্ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও পালিত হইয়া আসিতেছে, সেইখানে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে দিনের পর দিন কিভাবে এমন একটি অগ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা বলবত্ আছে বা থাকিতে পারে— তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। আমরা আশা করি, অনতিবিলম্বে এই অমানবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হইতে এতিম শিশুদের নিষ্কৃতি দেওয়া হইবে। সেইসাথে সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গৃহীত হইবে যথাযথ ব্যবস্থা।