ব্রিক্স জোটের ‘উন্নয়ন ব্যাংক’ এর শুভ সূচনা হউক
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৫
সাম্প্রতিক খবরে প্রকাশ-ব্রিক্স (বিআরআইসিএস) অর্থনৈতিক জোটের সদস্য দেশসমূহ-ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা— একটি নূতন ‘উন্নয়ন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠায় ঐকমত্যে পৌঁছিয়াছে। জানা গিয়াছে এই ব্যাংকটির মূল লক্ষ্য অবকাঠামো খাতের বরাদ্দ নিশ্চিত করিয়া উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হইলে বিশ্ব ব্যাংক নূতন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হইবে বলিয়া বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করিয়াছেন। অবশ্যই এই মতামতের সপক্ষে যথেষ্ট জোরালো কারণ রহিয়াছে। অন্যতম সদস্য দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, বিশ্ব ব্যাংকের মত পশ্চিমা সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবেই এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হইতেছে। ব্রিকেসর দেশগুলির জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে তাহারা যথেষ্ট গুরুত্ব পাইতেছে না এমন ধারণার ভিত্তিতেই সদস্য দেশসমূহ এই জোট গঠনে উদ্যোগী হইয়াছিল। বৈশ্বিক উত্পাদনের ২৫ শতাংশের মালিক এই দেশগুলি হইলেও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইহার সহ-নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় তাহাদের অবতীর্ণ না করার কারণ হিসাবে তাহারা পশ্চিমা দেশগুলির একচ্ছত্র আধিপত্যকেই দায়ী করিয়াছেন। উদাহরণ স্বরূপ বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও আইএমএফ-এর প্রধান ইউরোপের হওয়ার প্রচলিত বিধান তাহা মনে করাইয়া দেয়। প্রশ্ন হইল, এই নূতন ব্যাংকের আবির্ভাবের কি প্রভাব পড়িতে পারে বাংলাদেশের মত অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর।
নূতন একটি উন্নয়ন সহযোগী ব্যাংক হইলে উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবশ্যই তাহা ইতিবাচক ফল বহিয়া আনিবে। বিশ্ব ব্যাংকের দর্শন অনুযায়ী অধিকতর প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক আবহ অকল্যাণকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিযোগী কোন উন্নয়ন ব্যাংক, যে কিনা সদস্য দেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে ঋণ সহায়তা দিবে, তাহার একটা বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়িতে পারে সার্বিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর। পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে ঋণ সহায়তা নিয়া বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের যে টানাপোড়েন হইয়াছিল তাহার প্রভাব হইতে বাহির হওয়ার কোন সহজসাধ্য পথ নাই বাংলাদেশের নিকট বৈশ্বিক পর্যায়ে বিকল্প না থাকায়। তবে নূতন এই উন্নয়ন ব্যাংক সত্যিকার অর্থে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখিতে পারিবে তাহা নির্ভর করিবে সদস্যদেশগুলির দূরবর্তী লক্ষ্যসমূহের উপর। যদি বিশ্বায়নের যুগে পশ্চিমা দেশগুলির আধিপত্যকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে শুধু তাহাদের জোট পরিচালিত হয় এবং উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক দক্ষতার বিপরীতে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক লক্ষ্য দ্বারা পরিচালিত হয় তবে এই ব্যাংকের বিশ্বব্যাংকের মতো ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকিবে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে এই দেশসমূহের সামর্থ্যের কোন ঘাটতি নাই। বর্তমানে এই দেশগুলির বৈদেশিক মুদ্রার এক বিরাট রিজার্ভ রহিয়াছে, যাহার একটা অংশ তাহারা অবকাঠামো খাতে ঋণদানে ব্যবহার করিতে পারিবে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় তাহাদের রহিয়াছে বিশাল উদ্বৃত্ত সঞ্চয়, যাহা তাহারা তাহাদের আভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করিয়া শেষ করিতে পারিতেছেন না। এই উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের বিনিয়োগ হইতেছে পশ্চিমা দুনিয়ায় অত্যন্ত কম সুদে। ফলে এই ব্যাংকের মাধ্যমে তাহারা তাহাদের বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়নের পাশাপাশি বৈশ্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখিতে পারিবে। ফলে এই উন্নয়ন ব্যাংকের সফল সূচনার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলি আগ্রহভরে অপেক্ষায় থাকিবে।