ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে একাত্ম শিশু-কিশোর

২০১৩ সালে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে ঢল নেমেছে তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোর বৃদ্ধার। সকলের মুখে একটাই দাবি, রাজাকারের ফাঁসি চাই। যারা চায়নি সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা এই স্বাধীন বাংলাদেশ, যারা চায়নি আমাদের এই মাতৃভাষা, বাঙালি হয়েও যারা চেয়েছিল এই জাতিকে দাবিয়ে রাখতে, যারা নির্বিচারে এ দেশের মানুষকে হত্যা করেছে আজ তাদের বিচার করতে আমরা সবাই এক হয়েছি। তাই তুমি সকল অভিমান ভুলে গিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসো সোনার বাংলা গড়ার জন্য, যেমনটা গড়েছিলেন ১৯৭১ সালে।’ ঢাকার কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এভাবেই ফিরে আসার আহ্বান জানান। মেহেদী হাসানের মতো সহস্রাধিক শিক্ষার্থী বঙ্গবন্ধুর ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুকে চিঠি লেখে। তাদের প্রত্যেকের চিঠিতেই ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি। শিশু-কিশোররাও একাত্তরের ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে একাত্ব। এ সকল চিঠি থেকে বাছাইকৃত ৭১টি চিঠি নিয়ে বৃত্তান্ত একাত্তর গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে ‘প্রতি জাতির পিতা’ শীর্ষক চিঠি সংকলন। গতকাল শিল্পকলা একাডেমীর চিত্রশালায় অনুষ্ঠিত হয় এর মোড়ক উন্মোচন ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ, শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকি, নাট্যব্যক্তিত্ব বাসার উদ্দীন কবির। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বৃত্তান্ত একাত্তরের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ তানভীর। মাহবুব উল আলম হানিফ ফরিদপুরের সাদিয়া জামানের চিঠির কথা উল্লেখ করে বলেন, এই মেয়েটির বাবা বেকার। মুুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার বাবা যে ২০০০ টাকা ভাতা পান তা দিয়েই তাদের সংসার চলে। আর নিজেদের এই দরিদ্রতা নিয়ে মুখ না লুকিয়ে সে গর্ব করে। তাই বঙ্গবন্ধুর কাছে লিখেছে। এদের চিঠিগুলো এমন সব দিক স্পর্শ করে যা আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম সম্পর্কে আশান্বিত করে। তিনি আরো বলেন, শাহবাগের তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতো ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে পুরো জাতির স্লোগানে রূপান্তরিত করেছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয় ক্রান্তিকালীন এই সময়ে শিশু-কিশোররা বঙ্গবন্ধু এবং দেশ নিয়ে কী ভাবছে তা জানার জন্য আমাদের এই প্রয়াস। তাদের চাওয়া-পাওয়া, অভিযোগগুলো তারা কীভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে উপস্থাপন করে আমরা তা দেখতে চেয়েছি এবং চিঠিগুলো পড়ে বুঝতে পেরেছি তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে একমত এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আর তাদের দেখতে চায় না। চিঠি বাছাইয়ের সাথে জড়িত কামাল উদ্দীন কবির বলেন, প্রত্যেকটি চিঠি দেশ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। এজন্য তিনি শিশু এবং তাদের অভিভাবকদের ধন্যবাদ জানান। তিনি শিশুদের শুদ্ধ বানান শেখানোর ব্যাপারে শিক্ষক এবং অভিভাবকদের আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন। লিয়াকত আলী লাকি বলেন, জামায়াত ইসলামের নামে ধর্মকে ব্যবহার করছে, মানুষকে নাস্তিক বলছে। কিন্তু মানুষকে নাস্তিক বলার অধিকার কারো নেই। শাহবাগের আন্দোলনের তরুণদের নষ্ট ছেলে বলে আখ্যা দিচ্ছে জামায়াত। কিন্তু এই তরুণরাই দেশকে স্বাধীনতার চেতনায় জাগিয়ে তুলেছে। নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, শাহবাগ আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন। কারণ তা না হলে এই আন্দোলন অন্য রকম মোড় নিতে পারে। এই তরুণ প্রজন্মের উপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ইতিহাস। তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান’ এটাই আমাদের ঐতিহ্য। ইয়াফেস ওসমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে বলেন, আজকের শাহবাগ আন্দোলন প্রযুক্তির ফসল। প্রযুক্তির বলে তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে একত্রিত হয়েছে। এই প্রজন্ম চেষ্টা করলে সব কিছুই সম্ভব করতে পারে। পরে ৭১ জন চিঠি লেখকের মধ্যে চিঠি সংকলন ও ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়।