দিবস
খ্রিস্টের পুনরুত্থান ও তার তাত্পর্য
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৫
আজ রবিবার,পবিত্র পুনরুত্থান দিবস। পৃথিবীর সর্বত্র খ্রিস্টীয় সমাজ মহানন্দে যীশু খ্রিস্টের পুনরুত্থানকে কেন্দ্র করে পবিত্র উপাসনা, ধ্যান-প্রার্থনার মাধ্যমে এ দিনটি পালন করছে। আমাদের দেশেও খ্রিস্টভক্তরা একইভাবে দিনটি পালন করছে।
ঈশ্বর পবিত্র । কিন্তু তিনি পাপকে ঘৃণা করলেও পাপী মানুষকে তার স্বর্গীয় প্রেমে রক্ষা করতে চান। খ্রিস্টধর্মের বিষয়ে বলতে গেলে নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক ঈশপুত্র খ্রিস্টের ক্রুশীয় মৃত্যুর কথাটি প্রথমেই আসবে। এ জগতের জ্ঞানে যা ঘৃণ্য ও অপমানজনক ঈশ্বর কিন্তু তাকেই বেছে নিলেন। খ্রিস্ট তার ঈশ্বরত্বকে ধরে রাখার বিষয় জ্ঞান না করে মানুষের পাপজনিত সমস্ত দুঃখকে বরণ করে নেবার জন্য শুধু মানুষই হলেন না, তিনি জঘন্য অপরাধের কারণে কৃতদাসের জন্য নির্ধারিত সেকালের ভয়ঙ্কর ও অপমানজনক মৃত্যুদণ্ড- ক্রুশীয় মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অবহেলিত ও অপমানিত। দীনদরিদ্র, জীবনযুদ্ধে শ্রান্তক্লান্ত মানুষের সঙ্গে তার জীবনকে তিনি শনাক্ত করলেন এবং পাপীর পাপমুক্তির জন্য তিনি হলেন দস্যু-তস্করদের সাথে ক্রুশবিদ্ধ। পবিত্র ঈশ্বরের পবিত্রতা ও মহত্ত্ব এত ঠুনকো নয় যে পাপী মানুষের কাছে মানবরূপে এলে তার পবিত্রতার হানি হবে। বরং মানুষের বেশে এসে তিনি মানুষকে গৌরবান্বিত করেছেন। যা শাশ্বত সত্য ও সুন্দর তা মানুষের কোনও কারণে চলে যায় না, তার হানি হয় না।
যখন আমাদের জীবন ও অস্তিত্ব ঈশ্বরের পবিত্রতার স্পর্শ পায় তখনই আমরা নতুন মানুষ হতে পারি। তার পবিত্রতার অগ্নিস্পর্শে আমাদের হিংসা, লোভ ও অশুচিতার পাপরাশি যখন পুড়ে যায় তখনই আমরা তার আপন হতে পারি। পবিত্র ঈশ্বর মানুষের মধ্যে শয়তানের কাজের ভিত্তিমূল বিনাশ করেছেন যীশু খ্রিস্টের পুনরুত্থানে। মৃত্যুর সাধ্য ছিল না খ্রিস্টকে কবরের মধ্যে ধরে রাখার। মৃত্যু মানুষের সমস্ত ক্ষমতার শেষ করতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর এই মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। ঈশ্বর তার পুত্রকে পাতালে পরিত্যাগ করেননি। দূরাত্মা মানুষ তাদের সর্বশক্তি দিয়ে খ্রিস্টকে সংহার করেছিল; কিন্তু ন্যায়বান ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তার পবিত্র পুত্রকে মৃত্যুর রাজ্য থেকে এক রূপান্তরিত দেহে উঠিয়ে তাকে গৌরবান্বিত করেছেন। কালভেরীর ক্রুশে খ্রিস্ট আপাতত পরাজিত সৈন্যরূপে নিজেকে দেখিয়েছিলেন বটে, কিন্তু পুনরুত্থানে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী বীর ও কর্তৃত্বের ঊর্ধ্বে ত্রাণকর্তা প্রভুরূপে উদ্ভাসিত। খ্রিস্ট বিশ্বাসীদের বিশ্বাসের এটিই মূল কথা। বিখ্যাত প্রচারক বিলি গ্রাহাম যথাথর্ই বলেছেন, “খ্রিস্টের পুনরুত্থান হচ্ছে খ্রিস্টীয় ঈশ্বরতত্ত্বের নির্ভর-বিন্দু” (The resurection of Christ is the fulcrum of Christian Theology)।
আমাদের এই বাস্তবতার জীবনে খ্রিস্টের পুনরুত্থানের তাত্পর্যকে নিরীক্ষণ করে দেখার প্রয়োজন আছে বৈ কী! খ্রিস্টের পুনরুত্থান তার অনুসারীদের কেবল স্বর্গে যাবার কথাই বলে না; তা আমাদের জীবনকে ও দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করার আহ্বান জানায়। আজ বড়ই অশান্ত আমাদের পৃথিবী, অশান্ত ও উদ্বিগ্ন মানব মন। জগতে আজ অন্যায় ও অশান্তির রাজত্ব। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণি ও জাতিতে জাতিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা ও অশুভ প্রতিযোগিতার ছোবলে সাধারণ মানুষের জীবন আজ অতি ক্লীষ্ট ও সর্বস্বান্ত। শান্তির সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হচ্ছে ন্যায় বিচার। যেখানে মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে মানুষ বঞ্চিত হয় সেখানে শান্তির বাণী প্রচার নিরর্থক। মানুষের জীবনের যেন আজ মূল্য নেই। মানুষের সীমাহীন বৈষয়িক পরিবর্তন হয়েছে, উন্নতি হয়েছে বটে। তবে তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানুষের হূদয়ের পরিবর্তন। মানবীয় মূল্যবোধের চর্চা।
আজ সকলের জন্য আমাদের প্রার্থনা হোক যেন আমরা ঈশ্বরের সমস্ত সৃষ্টিকে ভালবাসতে পারি, সম্মান করতে পারি। ধর্মের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার কারণে পৃথিবীতে মানুষে মানুষে অনেক হানাহানি হয়েছে, মানুষ মানুষকে দূরে রেখেছে। কোন ধর্মেই কি আসলে তা শিক্ষা দেয়? আবার পৃথিবীতে কত অসংখ্য মানুষ আছেন যারা মানুষকে ভালবেসে মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজেদের জীবন পর্যন্ত অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। যীশু খ্রিস্ট পবিত্র ও প্রেমময় জীবন ও তার আত্মদানের শিক্ষা আমাদের আজ জীবন চলার পথে এগিয়ে দিক, সবার জন্য এ শুভ কামনা করি।
লেখক :খ্রিস্টীয় ঈশতত্ত্ব মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ