চতুর্দিকে কেন এই সহিংসতা
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৪
জাতীয় জীবনের চারিদিকেই কেমন যেন এক অস্বস্তিকর ও অনিশ্চিত অবস্থা। জনমনে এ কারণে নানান শংকা-আশংকা এবং নানাবিধ প্রশ্নের উদ্রেক হইতেছে। বিশেষত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে মানুষের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বাড়িতেছে। প্রতিদিনই আমরা বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে কিংবা পত্র-পত্রিকায় এমন সব নির্মম-নিষ্ঠুর সামাজিক অপরাধের চিত্র দেখিতে পাইতেছি যে উহাতে বিচলিত বোধ না করিয়া পারা যায় না। সামাজিক অস্থিরতা কম-বেশি সব আমলেই ছিল এবং থাকে। কিন্তু ঐ অস্থিরতার সহিত যখন কিনা রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হয় তখনই ঘটে যত বিপত্তি। কেননা রাজনৈতিক তাপ-উত্তাপ-উত্তেজনা ও অস্থিরতা ক্রমান্বয়েই সমাজ দেহে নানান ক্ষতের সৃষ্টি করে, ফলে পরিস্থিতি নৈরাজ্যকর হইয়া পড়ে বৈকি!
দেশে বর্তমানে এমনই এক নৈরাজ্যেরই যেন পদধ্বনি শোনা যাইতেছে। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার জঘন্য খেলায় যেন অনেকে মাতিয়া উঠিতেছে। একেবারেই যাহা আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় বা ঘটনা উহা লইয়াও নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটাইবার বিকারগ্রস্ত মানসিকতা প্রবল হইয়া উঠিতেছে। সংখ্যালঘুদের উপর হামলা-মামলা এখনতো অতি সাধারণ ঘটনায় পর্যবসিত হইতেছে। ইহাতো কোন সভ্য সমাজের চিত্র হইতে পারে না। গণতান্ত্রিক সমাজের রক্ষাকবচই হইতেছে আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য আমরা মুখে আইনের শাসন বিষয়ে বাগাড়ম্বর করি বটে কিন্তু শাসন ক্ষমতা হাতে পাইবার পর সকলেই বা সকলপক্ষই আইনের শাসনকে জলাঞ্জলি দিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগি। সংকীর্ণ ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিতে গিয়া আমরা গোটা দেশের জন্য এক ঘোরতর অনিশ্চয়তা ডাকিয়া আনিয়াছি। ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, ন্যায়-নীতি-নিষ্ঠার নিদারুণ অভাব, আইনের শাসন ও সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞার নতিজা যে কি ভয়াবহ রূপ ধারণ করিতে পারে উহার বুঝিবা খানিক আলামত আমাদের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন দিকে ফুটিয়া উঠিতেছে।
নিষ্পাপ শিশুকে শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বার্থোদ্ধারে কিংবা শত্রুতা চরিতার্থ করিতে নির্মমভাবে হত্যা করিতে কাহারও বাধিতেছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা এ সমাজে যেন দৈনন্দিন বিনোদনেরই নামান্তর হইয়া দাঁড়াইতেছে। আবার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যানবাহন ইত্যাদি ধ্বংস করা হইতেছে রাজনীতির নামে। অন্যদিকে, বিরোধীপক্ষের দাবি-দাওয়া বক্তব্য শুনিবার ও উহাকে আমলে লইবার মানসিকতাও দিনকে দিন উবিয়া যাইতেছে। গণতান্ত্রিক সমাজে যেখানে জনগণের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার উপরই টিকিয়া থাকে সেখানে আমরা সকলেই এমন ধৈর্যহারা ও অসহিষ্ণু হইয়া পড়িতেছি যাহা ভাবিতেও গা শিহরিয়া ওঠে!
বিগত কয়েক দিনের পত্র-পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাইলেই সারাদেশে বিক্ষিপ্তভাবে যে সকল সহিংস ঘটনার চিত্র দেখিতে পাওয়া যায় উহা আমাদের আগামী দিনগুলির ব্যাপারে শংকিত না করিয়া পারে না। এত হানাহানি, এত হিংসা-দ্বেষ আর অন্যায়-অত্যাচার চলিতে থাকিলে আমরা যেকোন অমানিশার গহীন অন্ধকারে তলাইয়া যাইব একথাটি কি কেহ মাথা ঠাণ্ডা করিয়া একটিবারের জন্যও ভাবিয়া দেখিতেছি? বর্তমান পরিস্থিতিতে কে কাহাকে ঘায়েল করিতে আস্তিনের নিচে ছুরি লইয়া ঘুরিতেছে উহা নির্ণয় করাও দুঃসাধ্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে? উহা কিসের আলামত? এই অবস্থা সমাজে কখন সৃষ্টি হয়? আমরা কি বিশ্ব ইতিহাসের দিকে একবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতে সচেষ্ট হইব নাকি যথারীতি গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাইয়া দিয়া তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলিতে থাকিব! আমরা শুধু বলিতে চাই যে, এমন অবস্থায় সকল প্রকার হঠকারিতা পরিহারপূর্বক সুস্থ ও ঠাণ্ডা মাথায় বসিয়া আমাদের সকলকে একটি উপায় বাহির করিতে সচেষ্ট হইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে যে, সময় কিন্তু আমাদের জন্য বসিয়া থাকিবে না।