আলোকপাত

একটি মুখের হাসির জন্য

সম্প্রতি বরিশাল থেকে ফেরার পর ক্ষমতাহীনতার এক চিত্র কল্পনা করে আমি প্রায়ই শিউরে উঠি। সামাজিক ও মানসিক উত্পীড়নের অস্পষ্টতার মধ্যে থেকে একটি মুখাবয়ব আমার মনে গেঁথে গেছে— সে হচ্ছে মাসুদা, ১৭ বছর বয়সী একটি মেয়ে, যে তার ভাইয়ের পরিবারের সাথে থাকে। তাদের পিতা-মাতা দু’বছর আগে মারা যায়। আমরা যখন তাকে দেখতে গিয়েছিলাম, তখন তার ভাই তাকে কথাই বলতে দিচ্ছিল না, বার বার থামিয়ে দিচ্ছিল। তার চোখে যা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তা বলার সাহস তার ছিল না। মাসুদার চোখ আমাকে যে গল্প বলতে চাইছিলো, তা তার কণ্ঠে উচ্চারিত হতে পারছিল না- নৈরাশ্য, পরাভব এবং একটি জীবনকাল উত্সর্গের গল্প। সমাজের শৃঙ্খল তার ভাষা দমন করেছে কিন্তু তার চোখের যন্ত্রণার ছায়া ঢাকতে পারেনি। বাস্তব উপলব্ধি আমার বিবেককে বিদ্ধ করেছে, আমরা এমন এক যুগে বাস করি যেখানে নারীরা তাদের বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে তা প্রত্যাশিত নয়; নারী স্বাধীনতা ও বাকশক্তির অধিকার বিশেষ উত্সাহের সাথে প্রায়শই জোর দিয়ে বলা হয়। তথাপি, বাংলাদেশের গ্রামের ভাঙ্গা, কাদামাখা পথ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস ও অযৌক্তিক সামাজিক বাধায় গঠিত সমাজের লৌহ মুষ্ঠি থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল, যেখানে কিশোরী মেয়েরা কেবলই দায় বলে গণ্য হয় সেখানকার হাজারও মুখের একটি তার মুখাবয়ব, যাতে প্রতিফলিত হয় সাহায্যের জন্য নীরব সনির্বন্ধ অনুরোধ। এটা স্পষ্ট ছিল যে, তার ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের অসহযোগিতা এই মেয়েটির বেড়ে উঠার আগ্রহকে দমন করেছে এবং তার প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনাসমূহ দৃঢ় ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার বেষ্টনি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যেখান থেকে সে মুক্ত হতে পারেনি। সমাজ ও পরিস্থিতি তার সুন্দর ভবিষ্যতের আশা শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলেছে। তাকে তৈরি করা হয়েছে নিজেকে বোঝার মত ভাবতে, স ষ্টার এক অলৌকিক সৃষ্টির মত নয়। বিদ্রূপাত্মকভাবে, সমাজের চেয়ে তার পরিবারের রক্ষণশীলা এবং ধর্মীয় মনোভাব অধিকতর প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল। আমাদের সমাজের রীতিনীতি যেগুলো আমাদের জীবনযাত্রা উন্নয়নে সহায়তা করে বলে বোঝানো হয় বাস্তবে বিষয়সমূহ উন্নয়ন ও প্রগতির পথে প্রাণঘাতী কাঁটার মত আবির্ভূত হয়। কিশোরী মেয়েদের মধ্যে যারা চরম দরিদ্রতার অন্ধকার সমুদ্রে সংগ্রাম করে তাদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। পরিবার ও সম্প্রদায়সমূহ এসব মেয়েদের জীবিকা নির্বাহের উপায়ের কথা না ভেবে সমাজের রীতিনীতি ও বিধিমালার প্রতিবন্ধকতা তাদের মনের মধ্যে প্রবেশ করায়। এনজিও মাঠকর্মী, যারা কিশোরী মেয়েদের নিয়ে কাজ করে, তাদের প্রস্তাবিত সহায়তার ব্যাপারে সম্প্রদায় ও নিজ নিজ পরিবার থেকে নিয়মিত জ্বালা-যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয়। ফলশ্রুতিতে, অতি দরিদ্র মেয়েদের মাঝে যতটুকু আশার আলো থাকে, তা ক্রমান্বয়ে শেষ হয়ে যায় এবং তারা আত্ম-পরিচয়হীন ও শিক্ষা বিবর্জিত একটি জীবন মেনে নিতে বাধ্য হয়। তারা পরিবার ও সম্প্রদায় থেকে যে নিয়মিত অত্যাচারের সম্মুখীন হয়, তা তাদের আত্মার উপস্থিত ও স্বয়ংক্রিয় চেতনাবোধকে টুকরো-টুকরো করে ফেলে। যারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেষ্টা করে তারা সচরাচর নির্মম পরিণতির সম্মুখীন হয়। এমতাবস্থায় যেখানে মেয়েদের প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনাসমূহ স্বীকার করা হয় না, যেখানে মেয়েদের জন্য বিনিয়োগ সমভাবে মেনে নেয়া ও সমর্থন করা হয় না, সেখানে আমরা কি পারি সহস্রাব্দ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে নির্মিত পথকে দৃষ্টিগোচর করতে? আমি মনে করি, একটি সর্বসম্মত পরিবেশ তৈরি করাই মূল চ্যালেঞ্জ যেখানে নারী-পুরুষের বৈষম্য কোন সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না এবং যেখানে গ্রাম্য সম্প্রদায় তাদের স্ত্রী, বোন ও কন্যাদের শিক্ষিত করতে উত্সাহিত হবে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন তাদের সহযোগিতা ও সমর্থন, একই সাথে যারা সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল বাংলাদেশের জন্য কঠোর চেষ্টা করে তাদের মনোভাবের পরিবর্তন। হয়তো একটি সময় আসবে যখন মেয়েটির মুখাবয়ব আশা ও সৌভাগ্যের আলোয় আলোকিত হবে এবং যন্ত্রণাদায়ক পরাভবতা যা তার চোখে সাঁতরে বেড়িয়েছিল তা চূড়ান্তভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবে। লেখক :একটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থায় কর্মরত ইমেইল: riffat@shiree.org