‘অরা ক্ষিদার কষ্ট বুঝবো কি’

মিরপুর-১১, কালসি সড়কে চার পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ঠেলাগাড়ি ঠেলতে দেখা যায় আয়নাল মিয়াকে। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন হরতাল থাকে। আমরা কাজ পাই না। তাই দুই বেলা উপোস থেকে একবেলা পেটে খাবার দিতে হয়। সংসারে একজনার রোজগারে আর দিন চলে না। হের লাইগা চাইর পোলারে লইয়া কামে নামছি।’ হরতালের কারণে অভাবি মানুষগুলোর সংসারে অভাব যেন আরো জেঁকে বসেছে। আয়নাল মিয়ার ছয় সদস্যের সংসারে একবেলার খাবার যেন ঠিকমত জুটছে না। তাই যেদিন হরতাল থাকে না, সেদিন তিনি তার চার পুত্র সন্তানকে নিয়ে কাজে নামেন পথে। ঠেলা গাড়িওয়ালা আয়নাল মিয়ার মতো অসংখ্য দিনমজুরের এখন একই অবস্থা। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন হরতাল থাকায় তাদের সংসার যেন আর স্বাভাবিক নিয়মে চলছে না। রাজধানীর বিভিন্ন শ্রমবাজারে দেখা মেলে অসহায় নারী, বৃদ্ধদের কাজের অপেক্ষায় বসে থাকার চিত্র। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজের আশায় বসে দিন পার করছেন তারা। মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারে রাস্তার পাশেই একটি শ্রমিকদের বাজার। তারা কোদাল আর টুকরি নিয়ে বসে থাকেন কাজের আশায়। অভাবি মানুষগুলোর পরণে ময়লা ছেঁড়া পাঞ্জাবি, রোদেপোড়া জীর্ণ শরীর, কোঠরে ঢোকা ঘোলাটে চোখে অসহায় দৃষ্টি। কখন আসবে একজন মহাজন, তাদের কাজে নিয়ে যাবে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বৃদ্ধ বশিরউদ্দিন বলেন, ‘দ্যাশের অবস্থা খারাপ। যারা হরতাল দেয় তারা চায় দেশের ক্ষমতা, আর হামরা চাই দুইবেলা প্যাটভরা খাবার। খাবারের কষ্ট রাজনীতি করা মানুষের নাই, অরা ক্ষিদার কষ্ট বুঝবো কি।’ দিন মজুরি কত জানতে চাইলে বশিরউদ্দিন বলেন, ‘এখন আর দামে মিলা না মিলার বিষয় নাই। কাজ পাওয়াটাই বড় বিষয়। পেটের তাগিদে যে কোন মজুরিতে তারা কাজ করতে আগ্রহী।’ রাস্তার পথশিশুগুলোকেও দেখা যায় অসহায়ভাবে বসে থাকতে। হরতালে মার্কেট, দোকান-পাট বন্ধ থাকায় পথশিশুদের গাড়ি মোছার কাজটি একেবারেই বন্ধ। তাই মিরপুর সড়কে অলস বসে থাকতে দেখা যায় শিশুদের। তাদের ফুল আর চকলেট ক্রেতারাও নেই পথে। ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের পাশে কাগজ কুড়াতে দেখা যায় সাত-আট বছরের রাকিবকে। সকাল গড়িয়ে সূর্য খাড়া মাথার উপর এলেও, তখনো রাকিবের পেটে কোন খাবার পড়েনি। সে জানায়, ‘হরতালে কাজ থাকে না। রাস্তায় মানুষজন বের না হলে কোনকিছু কুড়িয়েও পাওয়া যায় না। কিছু লোহার তার, আর বোতল পেয়েছি, এগুলা ভাঙ্গাড়ির দোকানে দিলে ট্যাকা দিবে, তখন ভাত খামু।’