ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস-এর ২০ বছর পূর্তি

দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে চায় ইউনিক

বাংলাদেশের প্রযুক্তি বাজারের এক উল্লেখযোগ্য নাম ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস। সম্প্রতি বিশ বছর পেরিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি পা দিয়েছে একুশ বছরে। দুই দশকের এই পথ চলায় ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস গ্রাহকবান্ধব একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সকলের মাঝে সুপরিচিত হয়ে উঠেছে। আর এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রার শুরু থেকেই সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করে যাচ্ছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম। তার সাথে কথা বলে ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস-এর দুই দশকের যাত্রার কথা এই লেখায় জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব। বাংলাদেশের বাজারে সর্বপ্রথম প্রজেক্টর বাজারজাত শুরু করে ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস। তাদের ব্যবসার সূচনাটাও প্রজেক্টরের মাধ্যমেই। নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্নের ওই সময়ে বাংলাদেশে প্রজেক্টরের সাথে অনেকেই পরিচিত ছিল না। সেই সময়ের প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন বিদেশে চাকরি করেছি। আশির দশকের সেই সময়েই আমি দেখেছি পাশ্চাত্যের তেদশগুলো তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রজেক্টর ব্যবহার করছে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধাটিই তারা গ্রহণ করে নিজেদের সমৃদ্ধ করত। আমরা চিন্তা করেছি ওরা যদি প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা গ্রহণ করতে পারে, আমরা কেন পারব না। আমাদের তখনকার ভাবনায় ছিল আমাদের দেশেও প্রজেক্টর সহজলভ্য করে তোলার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তিবান্ধব ক্লাসরুম গড়ে তুলতে সহায়তা করা। এসব চিন্তা থেকেই আমরা প্রজেক্টরের বাজারজাত করা শুরু করি।’ শুরুর দিকের সেই সময়ে প্রজেক্টরকে সকলের সাথে পরিচিত করে তোলাই অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল বলে মনে করেন মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম। মোহাম্মদ আব্দুল হাকিমের কথায়, ‘এমনও সময় গিয়েছে যখন ইউনিক বিজনেস সিস্টেম মাসে ৪/৫টি প্রজেক্টর বিক্রি করেছে। তখন একটি প্রজেক্টরের দাম ছিল ৩-৪ লাখ টাকা। সেই সময়ের তুলনায় এত বড় অংকের অর্থ ব্যয় করার মানসিকতা অনেকের মধ্যেই গড়ে ওঠেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান এটি নিতে চাইলেও দ্বিধাবোধ কাজ করেছে তাদের মধ্যে। তাদের সবাইকে প্রজেক্টরের প্রকৃত সুবিধাটি তুলে ধরে এর ব্যবহারের সুফল তুলে ধরাটা ছিল আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের পরিশ্রম আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সেই চ্যালেঞ্জ আমরা উত্তীর্ণ হতে সমর্থ হয়েছি বলেই বলতে পারি আজ।’ মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম মনে করেন, ইউনিক বিজনেস সিস্টেম কেবল নিজেদের ব্যবসাতেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিভিন্ন খাতের অটোমেশনেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে। ব্যবসাটাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল না। আর তাই অফিস অটোমেশন কিংবা আইটি এনাবলড সার্ভিসের দিকে সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস। সময়ের সাথে সাথে সারা বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ইউনিক বিজনেস সিস্টেমসও চেষ্টা করেছে তার সাথে বাংলাদেশকে একই ধারায় গতিশীল রাখতে। আর এর পেছনে ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস-এর কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন আব্দুল হাকিম। দেশের বর্তমান আইটি সেক্টর এবং সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপকল্প নিয়েও আশাবাদী আব্দুল হাকিম। তবে সরকার একা এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। বরং সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে বাংলাদেশের সব খাতকে ডিজিটাল রূপে রূপান্তরিত করতে। এর জন্যও তারা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি। সম্প্রতি সরকার পরীক্ষামূলকভাবে যে ২০ হাজার ৫শ প্রজেক্টরের মাধ্যমে ডিজিটাল ক্লাসরুম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, সেই উদ্যোগে প্রজেক্টর সরবরাহের কাজ পেয়েছে ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস। আগামী সপ্তাহেই এ বিষয়ে সরকারের সাথে তাদের চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে জানান আব্দুল হাকিম। তবে ডিজিটাল ক্লাসরুম তৈরিতে প্রজেক্টরের মতো হার্ডওয়্যার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ডিজিটাল কনটেন্ট। ইউনিক নিজেদের কেবল হার্ডওয়্যারেই সীমাবদ্ধ রাখবে নাকি কনটেন্ট ডেভেলপমেন্টেও মনোযোগী হবে, এমন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করছি। আমাদের গবেষণা বিভাগের মেধাবী তরুণরা এর জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমরা প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরির চিন্তা করেছি। আমাদের চিন্তা-ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হয়ত আরও ২/১ বছর সময় লাগবে।’ শুধু এই ডিজিটাল কনটেন্টই নয়, দেশেও প্রযুক্তি পণ্য তৈরি নিয়ে চিন্তা রয়েছে আব্দুল হাকিমের। তবে এর বাস্তবতা বর্তমানে নেই বলেই মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছি দেশেই প্রযুক্তি পণ্য তৈরি করার। আমরা চিন্তা করেছি আমাদের দেশেই কারখানা স্থাপনের বিষয়ে। তবে আমাদের দেশে বর্তমানে এই বাস্তবতা নেই। অবকাঠামোগত দুর্বলতা যেমন রয়েছে আমাদের দেশে, তেমনি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাও এখন নিয়ামকের ভূমিকা রাখছে। আবার আমাদের দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যেমন রয়েছে, তেমনি সরকারের করনীতিও আমাদের অনুকূলে নয়। তবে আমরা যদি এখন থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং সরকার এই বিষয়ে মনোযোগী হয়, তাহলে হয়ত অদূর ভবিষ্যতেই আমরা আমাদের দেশে প্রযুক্তি পণ্য নির্মাণের কারখানা স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হব।’ তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘সাফল্যের পূর্বশর্ত হচ্ছে সততা এবং কঠোর পরিশ্রম। এর ব্যত্যয় ঘটলে সাফল্য আসবে না।’ দুই দশকের পথচলায় ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস-এর অর্জন কী, জানতে চাইলে মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম বলেন, ‘ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস বর্তমানে দেশের একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান। এটিই আমাদের বড় একটি অর্জন। সময়ের স্রোতে আমরা যে ভেসে যাইনি এবং আমাদের লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে চলছি সাফল্যের সাথে—এটিই আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আমাদের গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়িক কৌশল ও দক্ষতার জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছি। আইএসও এবং এরকম অনেক সনদও আমরা লাভ করেছি। এসব অর্জন নিঃসন্দেহে আমাদের অনুপ্রাণিত করছে।’ আগামী দিনের লক্ষ্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘আমরা আমাদের ব্যবসায়িক সুনামকে ধরে রাখতে চাই। গ্রাহকরা যাতে আমাদের সেবায় আরও বেশি সন্তুষ্ট হয়, সেটাও আমরা নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের কর্মীদের সন্তুষ্টিও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর কেবল দেশের মধ্যেই নয়, দেশের বাইরেও আমরা ইউনিক বিজনেস সিস্টেমস-এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে ছড়িয়ে দিতে চাই।’