সময় থাকিতে নিজেদের শোধরানোর চেষ্টা করুন
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৬
বাংলাদেশ এখন একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হইয়াছে। আগ্নেয়গিরি হইতে লাভা ও ধোঁয়া বাহির হইতেছে। বহুমুখী পুঞ্জীভূত ক্ষোভ শেষপর্যন্ত বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে। দেশে অন্যায়-অত্যাচার, দুর্নীতি ও নৈরাজ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে যাহা বলিবার নহে। সাধারণ মানুষের ধৈর্যেরও যেন বাঁধ ভাঙিয়া গিয়াছে। এই বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির মূল কারণ জানিয়া-শুনিয়া বা অবচেতনে সীমালংঘন করা হইয়াছে। অথচ আল্লাহতায়ালা সীমালংঘনকারীকে পছন্দ করেন না।
গত বুধবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় কর্মীসভায় বক্তৃতা করিতে গিয়া ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলিয়াছেন যে, ইহা জামায়াত এমপির এলাকা হইলেও নিরাপত্তা দিতে হইবে আওয়ামী লীগকে। কথাটি এমনভাবে না বলিলেই শ্রেয় হইত। প্রশাসনকে দিয়া দল ও দলকে দিয়া প্রশাসন পরিচালনা করিতে গিয়াই আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। নিয়ম-কানুন ও আইনের মধ্যে না থাকিলে এমনই হয়। কেননা নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য রহিয়াছে প্রশাসন। স্রেফ দলের কথা অনুযায়ী কোথাও কোন প্রশাসন চলিতে পারে না। প্রশাসন চলে কিছু নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধানের ভিত্তিতে। যদি প্রশাসন দলের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে কোন দেশ বসবাসের উপযোগী থাকিতে পারে না। প্রশাসনের জন্য একটি গাইড লাইন থাকে। দল প্রশাসনের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলিয়া নিলে তাহারা প্রশাসনকে দিয়া বিরোধী মতকে ঠেঙ্গাইতে ব্যস্ত থাকিবে ইহাই স্বাভাবিক। যদি দলকে একান্ত সেই দায়িত্ব দিতেই হয়, তাহা হইলে আগে প্রশাসনের বিদ্যমান বিধিমালার পরিবর্তন সাধন করিতে হইবে।
অবশ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪২ বত্সর পরও আমরা এই ধরনের ক্ষতিকর সংস্কৃতি হইতে বাহির হইয়া আসিতে পারিতেছি না। যে যখন ক্ষমতায় যায়, এই রকমই কথা বলে, এই রকমই ভাব করে। কিন্তু তাহার পরিণতি ভাল হয় নাই। আবার প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও কেন যুগের পর যুগ তাহাদের বিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করিয়া ও জানিয়া-শুনিয়া কেবল ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের কথামতো প্রশাসন চালাইয়াছেন, তাহাও এইখানে একটি বড় প্রশ্ন। এইভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের মর্জিমাফিক কাজ করিতে গিয়া তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ সাময়িকভাবে লাভবান ও উপকৃত হইয়াছেন বটে। কিন্তু প্রশাসনের বৃহত্ গোষ্ঠী উপকৃত হন নাই।
বলাবাহুল্য, এই প্রবণতারই নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে। ফলে দেশের আলামত দেখিয়া ভাল মনে হইতেছে না। ইতোমধ্যে হেফাজতে ইসলামের আগামীকাল শনিবারের লংমার্চ কর্মসূচি লইয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। এই কর্মসূচি প্রতিরোধে ও গ্রেফতারকৃত ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলি আজ সন্ধ্যা হইতে হরতালসহ নানা কর্মসূচি ঘোষণা করিয়াছে। ইহার পাল্টা জওয়াবে ইসলামপন্থি ও লংমার্চের সমর্থকরা লাগাতার হরতালের হুমকি দিয়া রাখিয়াছে। সব মিলাইয়া দেশ বড় ধরনের সংঘাত ও অচলাবস্থার দিকে যাইতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। গত ৪২ বত্সরের অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায়, এই রকম পরিস্থিতিতে প্রায়শ তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটে। এই শক্তি ক্ষমতায় আসিয়া যে ধরনের পদক্ষেপ নেয় তাহা অনেকটা প্রতিশোধমূলক বলিয়া মনে হয়। এই তৃতীয় শক্তি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষেরই একটি অংশ, কোন ভাড়াটিয়া নহে। এই ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আসিতে সময় এখনও আছে কি নাই তাহা আমরা জানি না। তাই ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্যে বলিতে চাই যে, প্রশাসনকে তাহার নিয়ম-কানুন, দায়-দায়িত্বে থাকিয়াই কাজ করিতে দিন। অন্যথায়, উদ্ভূত পরিস্থিতি কাহারো জন্য মঙ্গলজনক হইবে না।