রেলপথে নাশকতা

অব্যাহত নাশকতার কারণে বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে রেলপথ। ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ৯৬টি নাশকতার ঘটনা ঘটিয়াছে। তন্মধ্যে শুধু পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়েতেই ঘটিয়াছে ৮৩টি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভোররাত্রে ভয়াবহ নাশকতার শিকার হইয়াছে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে চলাচলকারী আন্ত:নগর ট্রেন তূর্ণা-নিশিথা এক্সপ্রেস। নাশকতার কারণে ঢাকা হইতে চট্টগ্রাম অভিমুখী ৮ শতাধিক যাত্রীবাহী এই ট্রেনটি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার শ্রীমন্তপুর নামক স্থানে মারাত্মক দুর্ঘটনাকবলিত হয়। ভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটিলেও ট্রেনের চালকসহ প্রায় অর্ধশত যাত্রী আহত হন। লাইনচ্যুত হয় ইঞ্জিনসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৭টি বগি। রেলওয়ের মহাপরিচালকের মতে, ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক দুই কোটি টাকা। আর এই ঘটনায় নারী-শিশুসহ দুর্ঘটনাকবলিত যাত্রীদের মধ্যে যে আতঙ্কের সৃষ্টি হইয়াছে তাহা অপরিমেয় শুধু নহে, অবর্ণনীয়ও বটে। দুর্ঘটনার কারণ প্রসঙ্গে ইত্তেফাকের কুমিল্লা প্রতিনিধি জানাইয়াছেন যে, মঙ্গলবারের হরতালকে সামনে রাখিয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকার ফিশপ্লেট খুলিয়া শতাধিক ফুট রেল লাইন উপড়াইয়া ফেলা হইয়াছিল। লোমহর্ষক এই ঘটনার রেশ কাটিতে না কাটিতেই পরদিন বগুড়ায়ও অনুরূপ নাশকতার চেষ্টা হইয়াছে। হরতাল-সমর্থকেরা খুলিয়া ফেলিয়াছে রেললাইনের প্যান্ডেল ক্লিফ। ইতিমধ্যে একাধিক ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে। রেলসেতুতে অগ্নিসংযোগ, রেল লাইন উপড়াইয়া ফেলা ও স্টেশন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিতেছে নিয়মিত। উপর্যুপরি নাশকতার কারণে প্রায় বিপন্ন ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া পড়িয়াছে রেলপথ। সেই সাথে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইতেছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। সর্বোপরি, জনমনে দেখা দিয়াছে গভীর উদ্বেগ। আমাদের দেশে হরতাল কোনো নূতন বিষয় নহে। নির্বাচিত-অনির্বাচিত সকল সরকারের আমলেই হরতাল হইয়াছে। হরতালে সড়ক পথে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হইলেও রেলপথে ইতঃপূর্বে এই ধরনের নাশকতার উদাহরণ অতি বিরল। গত প্রায় দুইমাস ধরিয়া রেলপথে একের পর এক নাশকতার ঘটনা ঘটিতেছে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতির কোনো আলামত দেখা যাইতেছে না। বরং ইতিমধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল হইতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে বিমান ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের কথা বলা হইয়াছে খোলাখুলি। ইহার অর্থ ও তাত্পর্য অনুধাবন করা কঠিন নহে। অতএব, সামনের দিনগুলি যে আরও কঠিন হইবে তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। রেলপথ শুধু নহে, অনিশ্চয়তা ছড়াইয়া পড়িয়াছে সর্বত্র। কেহই স্বস্তিতে নাই। ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়া ব্যাহত হইতেছে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। পদে পদে বিঘ্নিত হইতেছে জনজীবন ও নিরাপত্তা। এই ধরনের অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও অচলাবস্থার মধ্যে কোনো দেশ চলিতে পারে না। কিন্তু ইহার প্রতিবিধান করা যাহাদের দায়িত্ব তাহাদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা সক্রিয়তা দেখা যাইতেছে না। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, তাহারা এমন সংকটের জালে জড়াইয়া পড়িয়াছে কিংবা কেহ তাহাদেরকে জড়াইয়া ফেলিয়াছে যে ইচ্ছা করিলেই তাহা হইতে বাহির হইয়া আসা যায় না। বলা বাহুল্য যে, এই বাস্তবতা আমাদের একার নহে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের নিয়তিও প্রায় অভিন্নই বলা চলে। রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য রাষ্ট্রনায়কোচিত বিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতারও কোনো বিকল্প নাই। এই দুইয়ের সফল সম্মিলন যতদিন না ঘটিবে, ততদিন এই সংকট হইতে পরিত্রাণ মিলিবে বলিয়া মনে হয় না।