ফুলেল শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় বিদায় বন্ধু বিদায়

জীবনভর দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে শহীদ মিনারের ছবি তুলেছেন ভাষাসংগ্রামী ও বরেণ্য আলোকচিত্রী আমানুল হক। বৃহস্পতিবার বিদায় বেলায় সেই শহীদ মিনারেই তাকে জানানো হলো শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুহূদ, স্বজন, বন্ধু, শিল্পী, কবি, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ সর্বসাধারণের ফুলেল শ্রদ্ধা ও হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। বেলা তিনটায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্বের আয়োজন করা হয়। বেলা চারটা পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী চলে শ্রদ্ধা নিবেদন। পাশাপাশি খোলা হয় শোকবই। আমানুল হককে নিবেদিত গুণগ্রাহীদের বেদনার্ত মনের নানা কথায় ভরে ওঠে সেই শোকবই। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাদ আছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার নামাজে জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সন্ধ্যায় সেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি। বেলা আড়াইটার পরই সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে আমানুল হকের শবদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বেলা তিনটার পর শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শুরু হলেও আগে থেকেই শ্রদ্ধা জানাতে সুহূদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ভিড় জমান শহীদ মিনারে। বিদায়ী বসন্ত দুপুরের ঝাঁঝালো খরতাপ উপেক্ষা করে এই ভাষাসংগ্রামী ও আলোকচিত্রীকে অন্তিম ভালোবাসা জানান নানা স্তরের মানুষ। শহীদ মিনারের উল্টো পাশের গগন শিরীষ বৃক্ষের ছায়াতলে শোকগাথা জানানো কালো কাপড় আবৃত ব্যানারের নিচে রাখা হয় মরদেহ। এসময় জোট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে চোখে জল ও হূদয়ে আপনজন হারানোর তীব্র বেদনা নিয়ে কফিনের কাছে উপস্থিত ছিলেন মরহুমের দুই সহোদর আহসানুল হক ও নাজমুল হক, সহোদরা আয়েশা খানম এবং তার ভাই ও বোনের ছেলে-মেয়েরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে শুরু হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব। এর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুলে ফুলে ঢেকে যায় কফিন। বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) পক্ষে শ্রদ্ধা জানান নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ট্রাস্টি মফিদুল হক। জোটের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান নাসির উদ্দিন ইউসুফ, হাসান আরিফ, মো. আহ্কাম উল্লাহ্্ প্রমুখ। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে ছায়ানট, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, পাঠশালা, সাহিত্য প্রকাশ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, ত্রিলোক, রাইজিং বিডি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিসহ নানা প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানান কবি বেলাল চৌধুরী, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, অভিনয়শিল্পী শংকর সাঁওজাল ও আফরোজা বানু, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মানজারে হাসিন মুরাদ, বাকশিল্পী আশরাফুল আলমসহ অনেকে। শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব সঞ্চালনা করেন জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। আলোকচিত্রের প্রতি আমানুল হকের ভালোবাসার কথা উঠে আসে মফিদুল হকের বক্তব্যে। তিনি বলেন, জীবনভর সৃজনশীল আলোকচিত্রের প্রতি ছুটেছেন আমানুল হক। ক্যামেরার চোখে সমাজ ও দেশের মানুষকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তার ধারণকৃত ছবি তো আজ ইতিহাসের সাক্ষী। সেসব ছবি দিয়ে আমার দেশ শিরোনামে চিত্রমালা তৈরি করেছেন। তিনি না থাকলেও এসব ছবিই তার হয়ে কথা বলবে। শামসুজ্জামান খান বলেন, তার প্রয়াণে একজন অসাধারণ সৃজনশীল আলোকচিত্রীকে হারালো দেশ। এই সৃজনশীলতার গুণেই তিনি সত্যজিত্ রায়ের মতো অস্কারজয়ী পরিচালকের স্নেহধন্য হয়েছিলেন। তার পথের পাঁচালি ছবিতে স্থির চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন। আর মানুষ হিসেবে আমানুল হক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ রফিকের ঐতিহাসিক ছবি তোলার পরই আমানুল হক সবার কাছে পরিচিত হন। তিনি সব সময়ই ছবির পেছনে ছুটতেন। এভাবেই তিনি ছবির পেছনে ছুটেছেন আজীবন। বেলাল চৌধুরী বলেন, আমানুল হক দেশের অন্তরাত্মার সঙ্গে সব সময় সম্পৃক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে তার তর্জনী উঁচু করা সেই ঐতিহাসিক ছবিটিও তুলেছিলেন আমানুল হক। বুধবার সন্ধ্যায় বার্ধক্যজনিত কারণে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন আমানুল হক।