[ রা জ নী তি ]

বিরোধী দলীয় নেতার কার্যালয়ে গুলি এবং তত্পরবর্তী সহিংসতা

সরকার মানেই ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিবর্গ নয়। যে কোন গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থায় বিরোধীদল বা বিরোধী ব্যক্তিবর্গকে সরকারের অঙ্গ বলেই মনে করা হয়। বিশেষ করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় সরকার যেন দু’ পায়ের একটি। এক পা দিয়ে যেমন হাঁটা যায় না তেমনি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বিরোধীদলের অবস্থান ব্যতীত সরকার যথার্থ অর্থে সার্থক হতে পারে না। আমাদের একটি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। এটি এক পা দিয়ে হাঁটে। এক পা দিয়ে হাঁটলে নিশ্চয়ই ব্যক্তি ক্রাচে, লাঠিতে বা অন্য কিছুতে ভর করে আমাদের সরকারও ক্রাচে ভর করে হাঁটছে। তার মানে সরকার ব্যবস্থাটি রীতিনীতি মোতাবেক কার্যকর থাকছে না। এ ভূমিকার সমার্থ হলো সরকারের অপরিহার্য অঙ্গ বলে কথিত বিরোধীদলীয় নেতার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হওয়ার সংসদ। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিগত ৩১ মার্চ ২০১৩ কে বা কারা গুলিবর্ষণ করে। গুলি বর্ষণকারীরা নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ ঘটনা গোটা জাতিকে শংকিত করে তুলেছে। বিগত দুই এক মাস ধরে চলমান সহিংসতার কারণে গোটা জাতির নিরাপত্তা যখন বিঘ্ন তখন দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃদু একটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তখন এ ধরনের গুলিবর্ষণ স্পষ্টভাবেই সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা যতটা জানি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশের একটি এলিট বাহিনী এদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত। এস এস এফ নামে এরা পরিচিত। প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে সবদিক বিবেচনায় সংগৃহিত চৌকস দল এটি। সেজন্য এদের প্রতি জনগণের আস্থাও বেশি। আরো রয়েছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই), ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্ট (এনএসআই), ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) ইত্যাদি। জনগণের এ আশা করার যুক্তি সঙ্গত কারণ রয়েছে তারা জাতীয় নেতৃবৃন্দের জীবন, সম্মান ও তাদের সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবে। এ ধরনের এলিট ফোর্স তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিধান করলেও মূল দায়িত্ব এবং আদেশ আসে রাজনৈতিক সরকার থেকে। বর্তমান সরকার সবকিছুই রাজনৈতিক বিবেচনায় করে থাকে এরকম বদনাম অনেক পুরনো। বিগত চার বছর ধরে বিরোধী নেত্রীর প্রতি সরকারের সামগ্রিক মনোভাব এবং তাকে প্রদত্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে হতাশ হতে হয়। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তায় নিয়োজিত জনবল সঙ্কুচিত করা হয়। এ অবস্থা থেকে একটি রাজনৈতিক সরকারের গতি-প্রকৃতি, সফলতা-ব্যর্থতা নিরূপিত হতে পারে। বাস্তব জীবন সঙ্কট থেকে যদি সমস্যা উত্সারিত হতো তাহলে সান্তনার কারণ থাকতো। আসলে এতে ক্ষমতাসীন সরকারের লোকদের মইন্ডসেট প্রতিফলিত। এ সরকারের আমলে সম্ভবত বিগত ৪২ বছরের মধ্যে আইন ও শৃঙ্খলা থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে। কোন সরকারের কার্যকালে এত মৃত্যু, এত গুম, এত সন্ত্রাস, এত অপরাধ সংঘটিত হয়নি। দেশে খুন রাহাজানি ডাকাতি ছিনতাই বিরাজ করছে। সর্বত্রই আতঙ্ক, আশঙ্কা এবং গুজব সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে প্রতিটি দিনই উত্তেজনায় অতিবাহিত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে গুলিবর্ষণ তার ভক্তকুল এবং সাধারণ নাগরিককে না ভাবিয়ে পারে না। জনগণ এক সময়ে মাইনাস টু ফর্মুলা শুনেছিল। সেই মাইনাস লাইফ মাইনাস নয়। রাজনীতি থেকে মাইনাস। এখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাহীনতার কথা শুনেছি। খোদ সরকার প্রধান থেকে মন্ত্রী-মিনিষ্টাররাও কয়েকবার প্রধানমন্ত্রীর জীবন আশঙ্কার কথা বলেছে। এভাবে আতঙ্ক এবং আশঙ্কার মধ্যে বসবাস কারও কাম্য হতে পারে না। অপ্রিয় সত্য এই যে, বিরোধী নেত্রী থাকাকালে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২১ শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলার কথা সকলেরই জানা আছে। রাজনীতিতে হত্যা ষড়যন্ত্র জীবনহানি মধ্যযুগীয় বর্বরতা। যে সময়ে বিএনপি সরকার বিরোধী নেত্রীর যখন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। মনে করা হয় এটি ছিল প্রতিবেশী বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রকারীদের একটি ঘৃণ্য প্রয়াস। কিন্তু সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। সময়ের ব্যর্থতাই আজকের সফলতার পথ দেখাবে। মানুষ যেন অতীত থেকে শিক্ষা লাভ করে। হত্যা ষড়যন্ত্র কোন কালেই কোন দেশেই শান্তি নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকে সুসংহত করনি। সুতরাং ষড়যন্ত্র চিরদিনই ঘৃণ্য। আশঙ্কা হচ্ছে যে, ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রই যেন আমাদের পেয়ে বসেছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে তার পরদিন নয়াপল্টনস্থ বিএনপি অফিসের সামনে আহূত প্রতিবাদ সভা ভণ্ডুল হয়ে যায়। ঘটনার বিবরণীতে জানা যায় ঐদিন বেলা ১২টার দিকে বিএনপি প্রতিবাদ সমাবেশ চলছিল। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের পর সভার সভাপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তৃতা শুরু করলে হঠাত্ পরপর চারটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। বিএনপি অভিযোগ করেছে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গুলি এবং সমাবেশে বোমা হামলা একই সূত্রে গাথা। শীর্ষ নেতৃবৃন্দ মনে করেন সরকারের লোকেরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার অসমাপ্ত বক্তৃতায় বলেছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটা গণতন্ত্র ও জনগণের বেঁচে থাকার অধিকারের উপর আক্রমণ। এজন্য শুধু প্রতিবাদ করলে চলবে না প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। স্মরণ করা যেতে পারে যেম ইতিপূর্বে ঐ একই স্থানে বিএনপি আহূত জনসভায় একই স্টাইলে ফখরুলের বক্তৃতার প্রারম্ভে ঐ ধরনের বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। সরকার বলছে সরকার বিরোধী হরতালের অজুহাত খুঁজতেই বিএনপি একাণ্ড করেছে। বিএনপির জিজ্ঞাস্য নিজ দলের সমাবেশ নিজেরাই পণ্ড করবে এটা কি যুক্তি সঙ্গত? মির্জা ফখরুলের সময়ই কেন বোমা হামলা? তার বক্তব্য কি এতই ধারালো যে সরকার তা জনগণকে শুনতে দিতে চায় না? আসলেই বিষয়টি রহস্যঘন। অভিজ্ঞমহল অতীতের রেকর্ড ঘেটে মন্তব্য করছেন এটি সরকারের এজেন্সির কাজ। সাদা পোশাকে জনতার একজন হয়ে ডিজিএফআই, এনএসআই অথবা অন্যকোন এজেন্সির লোক এটা করে থাকতে পারে। সরকার সোজা সংলাপ সমঝোতার পথ পরিহার করে বাকাপথে হাঁটছেন। পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন আওয়ামী লীগের জয়ই সন্ত্রাসের মধ্যদিয়ে। তারা সারা জীবন সন্ত্রাস করেছে। সাম্প্রতি ১৮০ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে এ অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ। বিশ্লেষকদের মন্তব্য রাষ্ট্রিক ব্যর্থতার অনুসঙ্গ হিসেবে তারা বিরোধী দলের নিরাপত্তা দিতেও ব্যর্থ। এ সহিংসতার ধারাবাহিকতায় ২ এপ্রিল পালিত হয় সারা দেশে সর্বাত্মক হরতাল। গুলি, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, রেলওয়ে বিপর্যস্থ করে সরকার বিরোধীরা। এখন বিরোধী দলের নিরাপত্তা বিধান তো দূরের কথা এবার ক্ষমতাসীন সরকার এসব সহিংসতার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পায়তারা আটছেন। চলমান সরকার পতনের একটানা আন্দোলন যখন ক্রমশ প্রবল হয়ে আসছে তখন তারা রাজনৈতিকভাবে আন্দোলনকে মোকাবেলা করতে না পেরে এখন ষড়যন্ত্রের পথে এগুচ্ছে। এ মাসের ২ তারিখে সচিবালয়ে ৪ মন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় সারাদেশে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার জন্য বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামী করবে সরকার। এ কৌশলে আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়া যাতে কোন ভূমিকাই না রাখতে পারেন, সেজন্যই এ ব্যবস্থা। সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ইতিবাচক ভূমিকা দিয়ে ইতিবাচক ফল লাভ করা যায়। নেতিবাচক দিয়ে নয়। প্রবাদবাক্য তো এরকমই, “পাপে পাপ আনে পুণ্যে আনে সুখ।” সুতরাং আমরা বলতে পারি হিংসা কেবল প্রতিহিংসাই আনে বাড়ায় আরো দুঃখ। লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়